আচ্ছা, বলুন তো, আপনার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টিমধুর ফোন কলটার কথা? সেই যে প্রথমবার যখন কাঁপা কাঁপা গলায় মানুষটাকে বলেছিলেন, ‘হ্যালো...’? অথবা যখন গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার পরও ফোনটা রাখতে ইচ্ছে করত না, আর প্রতিটা কথার শুরুই হতো ওই একটা শব্দ দিয়ে—‘হ্যালো’! ভাবুন তো, এই একটা শব্দ কতশত প্রেমের গল্পের সাক্ষী, কত না বলা কথার সূত্রধর। কিন্তু যদি বলি, এই ‘হ্যালো’র জায়গায় অন্য কিছুও থাকতে পারত? এমন একটা শব্দ, যা শুনলে আপনার প্রেমের গল্পের শুরুটা রোমান্টিক কমেডির বদলে একটা অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা বলে মনে হতো?

বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন, আজ ডুব দেওয়া যাক ইতিহাসের এক মজার অধ্যায়ে, যেখানে সামান্য একটা সম্ভাষণ নিয়ে বেঁধেছিল বিরাট লড়াই! লড়াইটা ছিল দুই বিখ্যাত বিজ্ঞানীর আর তাঁদের পছন্দের দুটি শব্দের মধ্যে। একদিকে ছিল আমাদের পরিচিত ‘হ্যালো’, আর অন্যদিকে এমন এক অদ্ভুত শব্দ, যা শুনলে মনে হবে কোনো জলদস্যু বুঝি ভুল করে আপনার নম্বর ডায়াল করে ফেলেছে!

হ্যালো বনাম আহোইয়-হোইয়: টেলিফোনের প্রথম শব্দের সেই ঐতিহাসিক লড়াই!

আজ আমরা ফোন তুলে অনায়াসে ‘হ্যালো’ বলি, কিন্তু টেলিফোন যখন প্রথম আবিষ্কৃত হলো, তখন মানুষ জানতই না যে কথা শুরু করবে কী দিয়ে। কী বলাটা সবচেয়ে সুবিধাজনক, বা কোনটা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে শোনা যাবে—এই নিয়ে চলছিল বিস্তর গবেষণা। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই মহারথী—টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল এবং তাঁর প্রতিযোগী, আরেক বিখ্যাত উদ্ভাবক টমাস এডিসন। আর এখানেই গল্পের আসল মজাটা লুকিয়ে আছে।

টেলিফোনের জনক, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, কখনোই চাননি যে ফোনের ওপারের প্রথম শব্দটি ‘হ্যালো’ হোক! তিনি চেয়েছিলেন, আমরা ফোন তুলেই সগর্বে বলি: ‘আহোইয়-হোইয়’ (Ahoy-hoy)!

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! ‘আহোইয়’! এই শব্দটি মূলত নাবিকরা সমুদ্রে জাহাজ ডাকার জন্য ব্যবহার করত। ডাচ শব্দ 'hoi' থেকে আসা এই সম্ভাষণটি বেলের কানে বেশ জোরালো এবং আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন, নতুন এই যন্ত্রে একে অপরের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য এর চেয়ে ভালো শব্দ আর হতেই পারে না। একবার ভাবুন তো দৃশ্যটা! আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা ফোন করে জলদস্যুদের মতো হাঁক পেড়ে বলছে, ‘আহোইয়-হোইয়, সোনা!’... ব্যাপারটা বেশ মজাদার, তাই না? গ্রাহাম বেল কিন্তু আজীবন নিজের এই পছন্দের ওপর স্থির ছিলেন এবং নিজে ফোন করলে সবসময় ‘আহোইয়’ বলেই কথা শুরু করতেন।

কিন্তু গল্পে তো একজন খলনায়ক, থুড়ি, প্রতিযোগীও চাই! এক্ষেত্রে সেই চরিত্রটি হলো টমাস এডিসনের। এডিসন ছিলেন ভীষণ বাস্তববাদী একজন মানুষ। তাঁর মনে হলো, এই ‘আহোইয়-হোইয়’ একটু বেশিই নাটকীয় এবং সেকেলে। তাঁর দরকার ছিল এমন একটি শব্দ, যা সহজ, চটজলদি এবং কোলাহলের মধ্যেও পরিষ্কার শোনা যায়। আর তখনই তাঁর মাথায় আসে ‘হ্যালো’ শব্দটি। ‘হ্যালো’ শব্দটি তখন অপরিচিত ছিল না, কিন্তু এটিকে টেলিফোনিক সম্ভাষণ হিসেবে জনপ্রিয় করার পুরো কৃতিত্বটাই এডিসনের।

এডিসন শুধু প্রস্তাব দিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি ১৮৭৭ সালের ১৫ই আগস্ট পিটসবার্গের সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড প্রিন্টিং টেলিগ্রাফ কোম্পানির প্রেসিডেন্টকে একটি চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি বলেন যে ‘হ্যালো’ শব্দটি ১০ থেকে ২০ ফুট দূর থেকেও পরিষ্কার শোনা যাবে, তাই আলাদা করে কল বেলের প্রয়োজন পড়বে না। তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, প্রথম টেলিফোন এক্সচেঞ্জের সমস্ত অপারেটরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ফোন তুলেই যেন তারা মিষ্টি সুরে বলে, ‘হ্যালো’! ব্যস, এই এক চালেই কিস্তিমাত! সাধারণ মানুষের কাছে ‘হ্যালো’ শব্দটি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় এবং টেলিফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এটাই অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।

এইভাবে, গ্রাহাম বেলের রোমান্টিক, জলদস্যু ঘরানার ‘আহোইয়-হোইয়’ হেরে গেল এডিসনের সহজ-সরল ‘হ্যালো’র কাছে। আজ হয়তো আমরা ‘আহোইয়’ বলে কথা শুরু করি না, কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে যে, একটা ছোট্ট সিদ্ধান্ত কীভাবে আমাদের প্রতিদিনের যোগাযোগকে এতটা প্রভাবিত করেছে! কে জানে, যদি সেদিন এডিসনের বদলে বেলের কথাই সবাই শুনত, তাহলে হয়তো আমাদের প্রেমের প্রথম बोली হতো আরও একটু বেশি দুঃসাহসিক, আরও একটু বেশি মজাদার! পরেরবার ফোনটা তোলার সময় একবার মুচকি হেসে ভাববেন, আপনিও হতে পারতেন এক মিষ্টি প্রেমের জলদস্যু!