বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশের জগৎটা অনবরত বদলে চলেছে। কিছু পরিবর্তন বাহ্যিক, যেমন বরফ গলে জল হওয়া; আবার কিছু পরিবর্তন সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট পদার্থ তৈরি করে, যেমন লোহায় মরচে পড়া বা দুধ থেকে দই তৈরি হওয়া। বিজ্ঞানের ভাষায়, এই দ্বিতীয় ধরনের পরিবর্তনকেই বলা হয় রাসায়নিক পরিবর্তন, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের প্রথম অধ্যায়, 'রাসায়নিক বিক্রিয়া এবং সমীকরণ', আমাদের এই fascinating রূপান্তরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এই অধ্যায়টি শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা যে খাবার খাই, তা কীভাবে আমাদের শরীরে শক্তি জোগায় (শ্বসন)? মোমবাতি কেন জ্বলে? খাবার বেশিদিন রেখে দিলে কেন খারাপ হয়ে যায়? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মধ্যে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে এই বিক্রিয়াগুলিকে একটি সাংকেতিক ভাষায় (রাসায়নিক সমীকরণ) প্রকাশ করা যায়, কীভাবে সেগুলিকে সমতাযুক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। চলুন, পদার্থের এই আণবিক স্তরের জাদুকরী জগতের গভীরে প্রবেশ করা যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
রাসায়নিক পরিবর্তন ও বিক্রিয়া: কীভাবে চিনবেন?
যখন এক বা একাধিক পদার্থ পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্মবিশিষ্ট এক বা একাধিক পদার্থ তৈরি করে, তখন সেই ঘটনাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া বলা হয়। কিন্তু আমরা কীভাবে বুঝব যে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হয়েছে? সাধারণত, নিম্নলিখিত চারটি পর্যবেক্ষণের যেকোনো একটি বা একাধিক ঘটলে আমরা রাসায়নিক বিক্রিয়ার উপস্থিতি অনুমান করতে পারি:
- অবস্থার পরিবর্তন (Change in State): অনেক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিক্রিয়ক পদার্থের ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল বা গ্যাস) পরিবর্তিত হয়ে উৎপাদিত পদার্থের নতুন অবস্থা তৈরি হয়। যেমন, অ্যামোনিয়া (গ্যাস) এবং হাইড্রোজেন ক্লোরাইড (গ্যাস) বিক্রিয়া করে অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (কঠিন) তৈরি করে।
- রঙের পরিবর্তন (Change in Colour): কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে পদার্থের রঙ বদলে যায়। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো, যখন কপার সালফেট (নীল রঙের) দ্রবণে একটি লোহার পেরেক ডোবানো হয়, তখন দ্রবণটির রঙ ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে যায় (আয়রন সালফেট তৈরির কারণে) এবং পেরেকের উপর বাদামী আস্তরণ পড়ে (কপার ধাতু)।
- গ্যাস নির্গমন (Evolution of a Gas): অনেক বিক্রিয়াতেই গ্যাস উৎপন্ন হয়। যেমন, জিঙ্ক ধাতুর টুকরোর উপর সালফিউরিক অ্যাসিড ঢাললে বুদবুদ আকারে হাইড্রোজেন গ্যাস নির্গত হতে দেখা যায়। পাত্রটি স্পর্শ করলে গরম অনুভূত হয়, যা পরবর্তী পর্যবেক্ষণটির দিকে নির্দেশ করে।
- উষ্ণতার পরিবর্তন (Change in Temperature): রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় তাপ উৎপন্ন হতে পারে বা শোষিত হতে পারে। যে বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয়, তাকে তাপমোচী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction) বলে। যেমন, কলিচুন (Calcium Oxide) এবং জলের বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, যে বিক্রিয়ায় তাপ শোষিত হয়, তাকে তাপগ্রাহী বিক্রিয়া (Endothermic Reaction) বলে। যেমন, বেরিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইডের বিক্রিয়ায় মিশ্রণটি খুব ঠান্ডা হয়ে যায়।
রাসায়নিক সমীকরণ: বিক্রিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ
একটি সম্পূর্ণ রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কথায় বর্ণনা করা বেশ দীর্ঘ এবং অসুবিধাজনক। তাই বিজ্ঞানীরা বিক্রিয়াকে সংক্ষিপ্ত এবং তথ্যপূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য রাসায়নিক সমীকরণ ব্যবহার করেন।
একটি রাসায়নিক সমীকরণে, যে পদার্থগুলি বিক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাদের বিক্রিয়ক (Reactants) বলা হয় এবং এগুলিকে বাম দিকে লেখা হয়। বিক্রিয়ার ফলে যে নতুন পদার্থগুলি উৎপন্ন হয়, তাদের বিক্রিয়াযত পদার্থ (Products) বলা হয় এবং এগুলিকে ডান দিকে লেখা হয়। বিক্রিয়ক এবং বিক্রিয়াযত পদার্থের মধ্যে একটি তীর চিহ্ন (→) দেওয়া হয়, যা বিক্রিয়ার অভিমুখ নির্দেশ করে।
উদাহরণস্বরূপ, ম্যাগনেসিয়াম ফিতাকে বায়ুতে পোড়ালে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড তৈরি হয়।
শব্দ-সমীকরণ (Word Equation): ম্যাগনেসিয়াম + অক্সিজেন → ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড
এই শব্দ-সমীকরণকে আরও সংক্ষিপ্ত করতে আমরা মৌল এবং যৌগের চিহ্ন ও সংকেত ব্যবহার করি।
প্রাথমিক বা কঙ্কাল সমীকরণ (Skeletal Chemical Equation): Mg + O₂ → MgO
এই সমীকরণটি বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী পদার্থগুলিকে চেনাচ্ছে, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ নয়। এখানেই সমতাবিধানের ধারণাটি আসে।
সমতাযুক্ত রাসায়নিক সমীকরণ এবং ভরের নিত্যতা সূত্র
লরেন্ট ল্যাভয়সিয়ের আবিষ্কৃত ভরের নিত্যতা সূত্র (Law of Conservation of Mass) অনুযায়ী, কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভরের সৃষ্টি বা বিনাশ হয় না। এর অর্থ হলো, রাসায়নিক বিক্রিয়ার আগে বিক্রিয়ক পদার্থগুলির মোট ভর এবং বিক্রিয়ার পরে উৎপন্ন পদার্থগুলির মোট ভর সর্বদা সমান থাকে।
এটি তখনই সম্ভব যখন বিক্রিয়ার উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান থাকে। তাই, একটি কঙ্কাল রাসায়নিক সমীকরণকে অবশ্যই সমতাযুক্ত করতে হয়। Mg + O₂ → MgO সমীকরণটিতে, বাম দিকে (বিক্রিয়ক) অক্সিজেনের ২টি পরমাণু আছে, কিন্তু ডান দিকে (উৎপন্ন পদার্থ) মাত্র ১টি। এটি ভরের নিত্যতা সূত্র লঙ্ঘন করে। তাই আমাদের সমীকরণটি সমতাযুক্ত করতে হবে।
কীভাবে একটি সমীকরণকে সমতাযুক্ত করবেন (Hit and Trial Method)?
আসুন, একটি তুলনামূলকভাবে জটিল উদাহরণ দিয়ে ধাপে ধাপে শেখা যাক: লোহা (Iron) এবং স্টিমের (জলীয় বাষ্প) বিক্রিয়ায় আয়রন (II, III) অক্সাইড এবং হাইড্রোজেন গ্যাস তৈরি হয়।
ধাপ ১: কঙ্কাল সমীকরণ লেখা
Fe + H₂O → Fe₃O₄ + H₂
ধাপ ২: পরমাণুর সংখ্যা গণনা
একটি তালিকা তৈরি করে বিক্রিয়ার উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা লিখুন।
- বাম দিকে (LHS): Fe = 1, H = 2, O = 1
- ডান দিকে (RHS): Fe = 3, H = 2, O = 4
দেখা যাচ্ছে, Fe এবং O পরমাণুর সংখ্যা সমান নয়।
ধাপ ৩: সবচেয়ে বড় যৌগটি দিয়ে শুরু করা
সাধারণত, যে যৌগে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরমাণু রয়েছে, সেটি দিয়ে সমতাযুক্ত করা শুরু করলে সুবিধা হয়। এখানে Fe₃O₄ সবচেয়ে বড়। এতে অক্সিজেন পরমাণু ৪টি। ডানদিকে O = 4, তাই বামদিকেও ৪টি অক্সিজেন পরমাণু প্রয়োজন। এর জন্য আমরা H₂O-এর আগে সহগ (coefficient) হিসেবে 4 বসাব। মনে রাখবেন, আমরা যৌগের সংকেত (formula) পরিবর্তন করতে পারি না (যেমন H₂O-কে H₂O₄ লিখতে পারি না)।
Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + H₂
ধাপ ৪: পরমাণুর সংখ্যা পুনরায় গণনা
নতুন সমীকরণে পরমাণুর সংখ্যা আবার গণনা করুন।
- LHS: Fe = 1, H = 4 × 2 = 8, O = 4 × 1 = 4
- RHS: Fe = 3, H = 2, O = 4
এখন অক্সিজেন পরমাণু সমান হয়েছে, কিন্তু হাইড্রোজেন এবং আয়রন এখনও অসমান।
ধাপ ৫: পরবর্তী মৌলকে সমতাযুক্ত করা
এবার হাইড্রোজেনকে সমতাযুক্ত করি। বাম দিকে ৪ × ২ = ৮টি হাইড্রোজেন পরমাণু আছে। ডানদিকে মাত্র ২টি আছে। তাই ডানদিকে H₂-এর আগে সহগ হিসেবে 4 বসাতে হবে।
Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
পুনরায় গণনা করলে দেখা যায়, LHS-এ H = 8 এবং RHS-এ H = 4 × 2 = 8। হাইড্রোজেন এখন সমতাযুক্ত।
ধাপ ৬: শেষ মৌলকে সমতাযুক্ত করা
অবশেষে আয়রন (Fe) বাকি আছে। ডান দিকে ৩টি Fe পরমাণু আছে, কিন্তু বাম দিকে মাত্র ১টি। তাই বাম দিকে Fe-এর আগে সহগ হিসেবে 3 বসাতে হবে।
3Fe + 4H₂O → Fe₃O₄ + 4H₂
ধাপ ৭: চূড়ান্ত যাচাই
শেষবারের মতো উভয় দিকে সমস্ত মৌলের পরমাণুর সংখ্যা গণনা করুন।
- LHS: Fe = 3, H = 8, O = 4
- RHS: Fe = 3, H = 8, O = 4
যেহেতু উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান, তাই সমীকরণটি এখন সমতাযুক্ত।
3Fe(s) + 4H₂O(g) → Fe₃O₄(s) + 4H₂(g)
এখানে (s) কঠিন, (g) গ্যাসীয় অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
রাসায়নিক বিক্রিয়ার প্রকারভেদ
রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলিকে তাদের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।
১. সংযোগ বিক্রিয়া (Combination Reaction)
যে বিক্রিয়ায় দুই বা ততোধিক বিক্রিয়ক পদার্থ যুক্ত হয়ে একটিমাত্র বিক্রিয়াযত পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে সংযোগ বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: A + B → AB
- উদাহরণ ১: ক্যালসিয়াম অক্সাইড (কলিচুন) এবং জলের বিক্রিয়া।
CaO(s) + H₂O(l) → Ca(OH)₂(aq) + তাপ (ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা শমিত চুন)
এই বিক্রিয়ায় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, তাই এটি একটি তাপমোচী বিক্রিয়া। বাড়ির চুনকাম করার সময় এই বিক্রিয়াটি ব্যবহৃত হয়। - উদাহরণ ২: কয়লার দহন।
C(s) + O₂(g) → CO₂(g) + তাপ
২. বিয়োজন বিক্রিয়া (Decomposition Reaction)
এটি সংযোগ বিক্রিয়ার ঠিক বিপরীত। যে বিক্রিয়ায় একটি যৌগ ভেঙে গিয়ে দুই বা ততোধিক সরল পদার্থ উৎপন্ন করে, তাকে বিয়োজন বিক্রিয়া বলে। এই বিক্রিয়া ঘটানোর জন্য বাইরে থেকে শক্তি (তাপ, আলো বা বিদ্যুৎ) প্রয়োগ করতে হয়। শক্তির উৎসের উপর ভিত্তি করে এটি তিন প্রকারের।
সাধারণ রূপ: AB → A + B
- তাপীয় বিয়োজন (Thermal Decomposition): তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে যে বিয়োজন ঘটানো হয়।
উদাহরণ: ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে (চুনাপাথর) উত্তপ্ত করলে এটি ভেঙে ক্যালসিয়াম অক্সাইড (পোড়াচুন) এবং কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে।
CaCO₃(s) + তাপ → CaO(s) + CO₂(g)
এটি সিমেন্ট শিল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিক্রিয়া। - তড়িৎ বিয়োজন (Electrolytic Decomposition): গলিত বা দ্রবীভূত যৌগের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ চালনা করে যে বিয়োজন ঘটানো হয়।
উদাহরণ: জলের তড়িৎ বিশ্লেষণ। সামান্য অ্যাসিড মিশ্রিত জলের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ পাঠালে জল ভেঙে হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন গ্যাসে পরিণত হয়।
2H₂O(l) + তড়িৎশক্তি → 2H₂(g) + O₂(g) - আলোকীয় বিয়োজন (Photolytic Decomposition): সূর্যালোক বা অন্য কোনো আলোর উপস্থিতিতে যে বিয়োজন ঘটে।
উদাহরণ: সিলভার ক্লোরাইডকে (সাদা রঙের) সূর্যের আলোতে রাখলে তা ভেঙে ধূসর রঙের সিলভার ধাতু এবং ক্লোরিন গ্যাসে পরিণত হয়।
2AgCl(s) + সূর্যালোক → 2Ag(s) + Cl₂(g)
এই ধরনের বিক্রিয়া সাদা-কালো ফটোগ্রাফিতে ব্যবহৃত হতো।
৩. প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction)
যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি বেশি সক্রিয় মৌল কোনো যৌগ থেকে কম সক্রিয় মৌলকে প্রতিস্থাপিত করে নতুন যৌগ তৈরি করে, তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: A + BC → AC + B (এখানে A মৌল B মৌলের চেয়ে বেশি সক্রিয়)
- উদাহরণ ১: আয়রন এবং কপার সালফেট দ্রবণের বিক্রিয়া।
Fe(s) + CuSO₄(aq) → FeSO₄(aq) + Cu(s)
এখানে আয়রন (Fe) কপারের (Cu) চেয়ে বেশি সক্রিয় হওয়ায়, এটি কপার সালফেট দ্রবণ থেকে কপারকে সরিয়ে দিয়ে আয়রন সালফেট তৈরি করে। দ্রবণের নীল রঙ সবুজ হয়ে যায়। - উদাহরণ ২: জিঙ্ক এবং কপার সালফেট দ্রবণের বিক্রিয়া।
Zn(s) + CuSO₄(aq) → ZnSO₄(aq) + Cu(s)
জিঙ্কও কপারের চেয়ে বেশি সক্রিয়, তাই এটিও কপারকে প্রতিস্থাপিত করে।
৪. দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Double Displacement Reaction)
যে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুটি বিক্রিয়ক যৌগ তাদের আয়ন (ions) বিনিময় করে দুটি নতুন যৌগ উৎপন্ন করে, তাকে দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
সাধারণ রূপ: AB + CD → AD + CB
- উদাহরণ: সোডিয়াম সালফেট এবং বেরিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণের বিক্রিয়া।
Na₂SO₄(aq) + BaCl₂(aq) → BaSO₄(s)↓ + 2NaCl(aq)
এই বিক্রিয়ায়, সোডিয়াম (Na⁺) এবং বেরিয়াম (Ba²⁺) আয়নদুটি তাদের স্থান বিনিময় করে। ফলে বেরিয়াম সালফেট (BaSO₄) নামে একটি সাদা রঙের অদ্রাব্য পদার্থ তৈরি হয়, যা পাত্রের তলায় থিতিয়ে পড়ে। এই অদ্রাব্য পদার্থকে অধঃক্ষেপ (Precipitate) বলা হয়। যে বিক্রিয়ায় অধঃক্ষেপ উৎপন্ন হয়, তাকে অধঃক্ষেপণ বিক্রিয়া (Precipitation Reaction) বলে।
জারণ এবং বিজারণ (Oxidation and Reduction)
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যা আমাদের চারপাশের অনেক বিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে।
- জারণ (Oxidation): কোনো বিক্রিয়ায় যদি কোনো পদার্থ অক্সিজেন লাভ করে বা হাইড্রোজেন হারায়, তবে সেই পদার্থের জারণ ঘটেছে বলা হয়।
- বিজারণ (Reduction): কোনো বিক্রিয়ায় যদি কোনো পদার্থ অক্সিজেন হারায় বা হাইড্রোজেন লাভ করে, তবে সেই পদার্থের বিজারণ ঘটেছে বলা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জারণ এবং বিজারণ সবসময় একসঙ্গেই ঘটে। যে বিক্রিয়ায় একই সাথে জারণ ও বিজারণ হয়, তাকে রেডক্স বিক্রিয়া (Redox Reaction) বলে।
উদাহরণ: কপার অক্সাইডকে হাইড্রোজেনের সাথে উত্তপ্ত করলে কপার এবং জল উৎপন্ন হয়।
CuO + H₂ + তাপ → Cu + H₂O
- এখানে, কপার অক্সাইড (CuO) অক্সিজেন হারিয়ে কপারে (Cu) পরিণত হয়েছে। সুতরাং, CuO-এর বিজারণ ঘটেছে।
- অন্যদিকে, হাইড্রোজেন (H₂) অক্সিজেন লাভ করে জলে (H₂O) পরিণত হয়েছে। সুতরাং, H₂-এর জারণ ঘটেছে।
যে পদার্থটি অন্যকে জারিত করে নিজে বিজারিত হয়, তাকে জারক পদার্থ (Oxidising Agent) বলে। এখানে CuO জারক পদার্থ।
যে পদার্থটি অন্যকে বিজারিত করে নিজে জারিত হয়, তাকে বিজারক পদার্থ (Reducing Agent) বলে। এখানে H₂ বিজারক পদার্থ।
দৈনন্দিন জীবনে জারণ বিক্রিয়ার প্রভাব
জারণ বিক্রিয়া আমাদের জীবনে উপকারী (যেমন শ্বসন) এবং অপকারী দুই ধরনের প্রভাবই ফেলে। দুটি প্রধান অপকারী প্রভাব হলো:
১. ক্ষয় (Corrosion)
যখন কোনো ধাতু তার চারপাশের পদার্থ, যেমন—জল, বায়ু, অ্যাসিড ইত্যাদির সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন তাকে ধাতুর ক্ষয় বা করোশন বলে। লোহার উপর লালচে-বাদামী আস্তরণ পড়া, যা মরচে নামে পরিচিত, হলো এর সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ।
মরচে পড়ার বিক্রিয়া: 4Fe + 3O₂ + xH₂O → 2Fe₂O₃.xH₂O (আর্দ্র ফেরিক অক্সাইড)
একইভাবে, রুপোর জিনিস কালো হয়ে যায় সিলভার সালফাইড (Ag₂S) তৈরির কারণে এবং তামা বা কাঁসার উপর সবুজ আস্তরণ পড়ে বেসিক কপার কার্বনেট (CuCO₃.Cu(OH)₂) তৈরির কারণে। রঙ করে, তেল বা গ্রিজ লাগিয়ে, বা অন্য ধাতুর প্রলেপ দিয়ে (গ্যালভানাইজেশন) ধাতুর ক্ষয় রোধ করা যায়।
২. তৈল বা চর্বিজাতীয় খাদ্যের জারণ (Rancidity)
তৈল বা চর্বিযুক্ত খাবার যখন বায়ুর অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসে, তখন তা জারিত হয়ে যায়। এর ফলে খাবারের স্বাদ এবং গন্ধ অপ্রীতিকর হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়াকে Rancidity বলে।
এটি প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হয়:
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যোগ করা: যে পদার্থগুলি জারণ প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়, তাদের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বলে। চিপস বা অন্যান্য ভাজা খাবারে এগুলি মেশানো হয়।
- বায়ুরোধী পাত্রে রাখা: খাবারকে বায়ুর সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখলে জারণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়।
- নাইট্রোজেন গ্যাস দ্বারা পূর্ণ করা: চিপসের প্যাকেটে অক্সিজেন সরিয়ে দিয়ে নাইট্রোজেনের মতো একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস भरा হয়। নাইট্রোজেন জারণ প্রতিরোধ করে, ফলে চিপস মুচমুচে থাকে।
- রেফ্রিজারেটরে রাখা: নিম্ন তাপমাত্রায় জারণ প্রক্রিয়া অনেক ধীর গতিতে চলে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: বায়ুতে দহন করার আগে ম্যাগনেসিয়াম ফিতাকে পরিষ্কার করে নেওয়া হয় কেন?
উত্তর: ম্যাগনেসিয়াম একটি অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু। এটি বায়ুর অক্সিজেনের সাথে স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড (MgO)-এর একটি পাতলা, স্থিতিশীল আস্তরণ তৈরি করে। এই আস্তরণটি ম্যাগনেসিয়ামকে সরাসরি বায়ুর সংস্পর্শে আসতে বাধা দেয় এবং এর দহন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তাই দহনের আগে শিরিষ কাগজ (sandpaper) দিয়ে ঘষে এই অক্সাইডের আস্তরণটি সরিয়ে ফেলা হয়, যাতে বিশুদ্ধ ম্যাগনেসিয়াম ধাতু সহজেই জ্বলতে পারে।
প্রশ্ন ২: শ্বসনকে তাপমোচী বিক্রিয়া (exothermic reaction) বলা হয় কেন?
উত্তর: বেঁচে থাকার জন্য আমাদের শক্তির প্রয়োজন হয়, যা আমরা খাবার থেকে পাই। হজমের সময়, খাদ্য ভেঙে সরল পদার্থে, যেমন গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই গ্লুকোজ আমাদের শরীরের কোষগুলিতে পৌঁছায় এবং কোষের মধ্যে থাকা অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে। এই বিক্রিয়াকে কোষীয় শ্বসন বলে। এই বিক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড, জল এবং প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয়। যেহেতু এই প্রক্রিয়ায় তাপশক্তি উৎপন্ন হয়, তাই শ্বসনকে একটি তাপমোচী বিক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়।
C₆H₁₂O₆(aq) + 6O₂(aq) → 6CO₂(aq) + 6H₂O(l) + শক্তি
প্রশ্ন ৩: প্রতিস্থাপন এবং দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রতিস্থাপন এবং দ্বি-প্রতিস্থাপন উভয় বিক্রিয়াতেই পদার্থের স্থান পরিবর্তন হয়, কিন্তু তাদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো:
- প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ায়, একটি অধিক সক্রিয় মৌল একটি যৌগ থেকে একটি কম সক্রিয় মৌলকে প্রতিস্থাপিত করে। এখানে একটি মৌল এবং একটি যৌগ অংশ নেয়। (যেমন: Fe + CuSO₄ → FeSO₄ + Cu)।
- দ্বি-প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ায়, দুটি যৌগ তাদের মধ্যে আয়ন (ক্যাটায়ন এবং অ্যানায়ন) বিনিময় করে দুটি নতুন যৌগ তৈরি করে। এখানে বিক্রিয়ক হিসাবে দুটি যৌগ থাকে। (যেমন: AgNO₃ + NaCl → AgCl + NaNO₃)।
প্রশ্ন ৪: বিয়োজন বিক্রিয়াকে সংযোগ বিক্রিয়ার বিপরীত বলা হয় কেন? সমীকরণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: বিয়োজন বিক্রিয়াকে সংযোগ বিক্রিয়ার বিপরীত বলা হয় কারণ তাদের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী।
সংযোগ বিক্রিয়ায়, দুই বা ততোধিক সরল পদার্থ (মৌল বা যৌগ) যুক্ত হয়ে একটিমাত্র জটিল যৌগ তৈরি করে।
উদাহরণ: 2H₂(g) + O₂(g) → 2H₂O(l) (দুটি পদার্থ মিলে একটি হয়েছে)।
বিয়োজন বিক্রিয়ায়, একটি জটিল যৌগ ভেঙে গিয়ে দুই বা ততোধিক সরল পদার্থে পরিণত হয়।
উদাহরণ: 2H₂O(l) + তড়িৎশক্তি → 2H₂(g) + O₂(g) (একটি পদার্থ ভেঙে দুটি হয়েছে)।
উপরের উদাহরণ দুটি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, একটি প্রক্রিয়া যেখানে পদার্থগুলি একত্রিত হচ্ছে, অন্যটিতে ঠিক তার বিপরীত ঘটনা ঘটছে, অর্থাৎ পদার্থগুলি ভেঙে যাচ্ছে। তাই এরা পরস্পরের বিপরীত।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি ভালোভাবে বুঝতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি মনে রাখা জরুরি:
- রাসায়নিক বিক্রিয়া: এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে নতুন ধর্মবিশিষ্ট নতুন পদার্থ তৈরি হয়। অবস্থার পরিবর্তন, রঙের পরিবর্তন, গ্যাস নির্গমন বা উষ্ণতার পরিবর্তন দ্বারা এটি চেনা যায়।
- রাসায়নিক সমীকরণ: এটি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে চিহ্ন ও সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি সংক্ষিপ্ত উপায়।
- সমতাযুক্ত সমীকরণ: ভরের নিত্যতা সূত্র মেনে চলার জন্য বিক্রিয়ার উভয় দিকে প্রতিটি মৌলের পরমাণুর সংখ্যা সমান করা অপরিহার্য।
- বিক্রিয়ার প্রকারভেদ:
- সংযোগ: A + B → AB
- বিয়োজন: AB → A + B (তাপ, আলো বা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়)
- প্রতিস্থাপন: A + BC → AC + B (সক্রিয়তার উপর নির্ভরশীল)
- দ্বি-প্রতিস্থাপন: AB + CD → AD + CB (আয়ন বিনিময় ঘটে) - রেডক্স বিক্রিয়া: যে বিক্রিয়ায় জারণ (অক্সিজেন লাভ) এবং বিজারণ (অক্সিজেন হারানো) একই সাথে ঘটে।
- দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব: ধাতুর ক্ষয় (Corrosion) এবং খাদ্যের জারণ (Rancidity) হলো আমাদের চারপাশে ঘটা দুটি গুরুত্বপূর্ণ জারণ প্রক্রিয়ার উদাহরণ।
এই অধ্যায়ের ধারণাগুলি রসায়নের ভিত্তি তৈরি করে। এগুলি ভালোভাবে বুঝলে পরবর্তী অধ্যায়গুলি বোঝা অনেক সহজ হয়ে যাবে।