বন্ধুত্ব বা পার্টনারশিপের কথা ভাবলে আমাদের মাথায় কাদের কথা আসে? শার্লক হোমস আর ওয়াটসন? নাকি হ্যারি পটার আর রন উইজলি? সিনেমা বা গল্পের জগতে এমন অনেক জুটি আছে যারা একে অপরের ছাড়া অসম্পূর্ণ। কিন্তু যদি বলি, প্রাণী জগতেও এমন কিছু জুটি আছে যাদের কথা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন? না, এটা কোনো ভালোবাসার গল্প নয়, বরং এমন এক বন্ধুত্বের কাহিনী যা টিকে থাকার লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়েছে।
আজ আমরা এমন এক অদ্ভুত জুটির কথা বলবো, যাদের একজন দৌড়ে ওস্তাদ আর অন্যজন মাটি খোঁড়ার জাদুকর। তাদের এই পার্টনারশিপ এতটাই কার্যকর যে বড় বড় ম্যানেজমেন্ট গুরুরাও এদের থেকে দলবদ্ধ কাজের শিক্ষা নিতে পারেন। চলুন, পরিচয় করিয়ে দেই প্রাণীজগতের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জুটির সাথে!
এক যে ছিল চালাক কইয়োট আর এক গোয়েন্দা ব্যাজার
ভাবুন তো, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, যাদের খাবার আর স্বভাব আলাদা, তারা একসাথে দল বেঁধে শিকার করছে। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু এই অবিশ্বাস্য ঘটনাই বাস্তবে ঘটে। আমেরিকার তৃণভূমি এবং মরুভূমিতে কইয়োট (Coyote) আর আমেরিকান ব্যাজার (Badger) একসাথে শিকার করে। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই অদ্ভুত জুটিকে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং তাদের এই দলবদ্ধ শিকারের কৌশল দেখে অবাক হয়েছেন। এমনকি এই বিষয়টি আমেরিকার আদিবাসী গল্পগাথাতেও স্থান পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই বন্ধুত্ব বহু পুরোনো।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে আমেরিকান কইয়োট এবং আমেরিকান ব্যাজার অনেক সময় একসাথে শিকার করে। কইয়োট তার গতি দিয়ে শিকারকে তাড়া করে, আর ব্যাজার তার খনন করার ক্ষমতা দিয়ে গর্তে লুকিয়ে থাকা শিকারকে বের করে আনে।
ব্যাপারটা অনেকটা সিনেমার মতো। ধরুন, তাদের শিকার হলো কাঠবিড়ালি বা প্রেইরি ডগ। এই ছোট প্রাণীগুলো বিপদের আঁচ পেলে দৌড়ে নিজের গর্তে ঢুকে পড়ে। এখন একা কইয়োটের পক্ষে মাটির নিচে যাওয়া সম্ভব নয়, আবার তুলনামূলকভাবে ধীরগতির ব্যাজারের পক্ষে দৌড়ে শিকার ধরা কঠিন। এখানেই আসে টিমওয়ার্কের জাদু!
কৌশলটা কেমন?
কইয়োট হলো দলের 'চেজার' (Chaser)। সে তার গতি ব্যবহার করে কাঠবিড়ালিকে তাড়া করে। ভয়ে কাঠবিড়ালি যখন নিজের গর্তে আশ্রয় নেয়, তখন ব্যাজারের এন্ট্রি হয়। ব্যাজার হলো দলের 'ডিগার' (Digger)। তার শক্তিশালী থাবা আর ধারালো নখ দিয়ে সে যেকোনো গর্ত খুঁড়ে ফেলতে ওস্তাদ। ব্যাজার যখন গর্ত খুঁড়তে শুরু করে, তখন বেচারা কাঠবিড়ালির অবস্থা হয় 'শ্যাম রাখি না কুল রাখি'। সে যদি গর্তের ভেতরে থাকে, তবে ব্যাজারের হাতে ধরা পড়বে। আর যদি অন্য কোনো মুখ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে, তাহলে বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দ্রুতগতির কইয়োট।
গবেষণায় দেখা গেছে, যখন তারা একসাথে শিকার করে, তখন তাদের সফলতার হার অনেক বেড়ে যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ব্যাজারের সাথে শিকার করার সময় কইয়োটদের কাঠবিড়ালি ধরার সম্ভাবনা প্রায় ৩৪% বেড়ে যায়। এতে দুজনেরই শক্তি বাঁচে এবং খাবার পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে। এটা কোনো আবেগি বন্ধুত্ব নয়, বরং একে অপরের দক্ষতার প্রতি সম্মান এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের এক নিখুঁত উদাহরণ।
শুধু কি শিকার? নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু?
যদিও তাদের এই সম্পর্ক মূলত শিকারকেন্দ্রিক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আরও গভীর বোঝাপড়া দেখা গেছে। ক্যামেরায় এমন দৃশ্যও ধরা পড়েছে যেখানে কইয়োট খেলাচ্ছলে ব্যাজারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বা তারা একসাথে বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, একটি কইয়োট একটি কালভার্টের সামনে খেলা করার ভঙ্গিতে লাফিয়ে ব্যাজারকে ডাকছে এবং তারপর তারা একসাথে ভেতরে চলে যাচ্ছে।
হতে পারে তাদের মধ্যে হয়তো আমাদের মতো করে 'বন্ধুত্ব' নেই, কিন্তু তাদের এই বোঝাপড়া আর পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যেকোনো বন্ধুত্বের চেয়ে কম নয়। তারা আমাদের শেখায় যে, কখনও কখনও সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত জুটিই সেরা দল তৈরি করতে পারে। ভালোবাসার মতোই, বন্ধুত্বও যেকোনো রূপে আসতে পারে, এমনকি এক চালাক শিকারি আর এক দক্ষ খননকারীর মধ্যেও।