পৃথিবীর সব দেশেরই কিছু জাতীয় প্রতীক থাকে, তাই না? যেমন ধরুন ভারতের বাঘ, আমেরিকার ইগল কিংবা ইংল্যান্ডের সিংহ। এই প্রাণীগুলো শুনলেই কেমন যেন একটা শক্তি, সাহস আর রাজকীয়তার কথা মনে আসে। কিন্তু যদি বলি, এমন একটা দেশ আছে যারা তাদের জাতীয় পশু হিসেবে বেছে নিয়েছে এমন এক প্রাণীকে, যাকে বাস্তবে কেউ কখনো দেখেনি? যাকে নিয়ে শুধু গল্প লেখা হয়, স্বপ্ন দেখা হয়, আর ভালোবাসার রূপকথায় যার বসবাস? ভাবছেন, এ আবার কেমন পাগলামি!
একদমই পাগলামি নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সুন্দর আর রোমান্টিক ইতিহাস। যে দেশের কথা বলছি, তার নাম স্কটল্যান্ড। পাহাড়, দুর্গ আর কিংবদন্তীতে ঘেরা এই দেশটা তাদের জাতীয় পশু হিসেবে কোনো হিংস্র সিংহ বা শক্তিমান ভালুককে বাছেনি। তারা ভালোবেসেছে এক মায়াবী, কাল্পনিক প্রাণীকে।
স্কটল্যান্ড: যেখানে রূপকথা সত্যি হয়
ভাবুন তো, একটা গোটা দেশ, যার সরকারি পরিচয়পত্রের জায়গায় একটা কাল্পনিক প্রাণীর নাম লেখা! শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক, এটাই সত্যি। দ্বাদশ শতক থেকেই স্কটল্যান্ড এই প্রাণীটির সঙ্গে নিজেদের আত্মাকে জুড়ে দিয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রাজা তৃতীয় জেমসের আমলে তো ইউনিকর্নের ছবি দেওয়া সোনার মুদ্রাও চালু হয়েছিল। কিন্তু কেন? হাজার হাজার বাস্তব প্রাণী থাকতেও স্কটিশরা কেন এক স্বপ্নের প্রাণীকে তাদের জাতীয় প্রতীক বানালো?
স্কটল্যান্ডের জাতীয় পশু আর কেউ নয়, এক মায়াবী, আশ্চর্য সুন্দর ইউনিকর্ন!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ডুব দিতে হবে ভালোবাসার, আভিজাত্যের আর স্বাধীনতার এক দারুণ গল্পে। কেল্টিক পুরাণ অনুযায়ী, ইউনিকর্ন হলো পবিত্রতা, নির্দোষতা এবং ক্ষমতার প্রতীক। তার মানে, এই প্রাণীটি একদিকে যেমন নিষ্পাপ, তেমনই প্রচণ্ড শক্তিশালী। তার শিং দিয়ে নাকি বিষাক্ত জলকেও শুদ্ধ করে ফেলা যায়। এই গুণগুলোই স্কটিশদের মন জয় করে নিয়েছিল। তারা মনে করত, ইউনিকর্নের মতোই তারাও গর্বিত, স্বাধীনচেতা এবং অপরাজেয়।
তবে গল্পের সবচেয়ে মজার মোড়টা কিন্তু অন্য জায়গায়। ইউনিকর্নের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে কাকে ভাবা হয় জানেন? সিংহকে! আর ইংল্যান্ডের জাতীয় পশু হলো সিংহ। ইতিহাস সাক্ষী, এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কটা চিরকালই ছিল এক রেষারেষির। একদিকে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী সিংহ, আর অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের পবিত্র ইউনিকর্ন। যেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রেমিক, যারা একে অপরের ওপর টেক্কা দিতে চায়! স্কটিশরা সম্ভবত ইউনিকর্নকে বেছে নিয়েছিল এটা বোঝানোর জন্য যে, তারা ইংল্যান্ডের সিংহের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং পবিত্রতা আর শক্তিতে হয়তো এক ধাপ এগিয়েই।
আপনি যদি স্কটল্যান্ডের রাজকীয় প্রতীক বা পুরনো স্থাপত্যগুলো দেখেন, তাহলে একটা জিনিস খেয়াল করবেন। ইউনিকর্নকে প্রায়ই একটা সোনার শেকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখানো হয়। দেখে মনে হতে পারে, এটা হয়তো পরাধীনতার চিহ্ন। কিন্তু গল্পটা ঠিক তার উল্টো।
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ইউনিকর্ন এতটাই শক্তিশালী এবং বন্য যে তাকে পোষ মানানো প্রায় অসম্ভব। একমাত্র একজন খাঁটি মনের কুমারী মেয়ে অথবা একজন সত্যিকারের রাজা ছাড়া তাকে বশ করা যায় না। তাই, স্কটিশ королі ইউনিকর্নকে শেকল দিয়ে বেঁধে এটা প্রমাণ করতে চাইতেন যে, তাঁদের ক্ষমতা এতটাই বেশি যে তাঁরা এক বন্য ইউনিকর্নকেও শাসন করতে পারেন। এটা ছিল তাঁদের শক্তির এক রোমান্টিক প্রকাশ, কোনো দুর্বলতা নয়।
যখন ১৬০৩ সালে স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ড একসঙ্গে গ্রেট ব্রিটেন তৈরি করলো, তখন রাজকীয় প্রতীকেও এক মজার পরিবর্তন আনা হলো। আগে স্কটল্যান্ডের প্রতীকে দুটো ইউনিকর্ন থাকত। কিন্তু সংযুক্তির পর একটা ইউনিকর্নকে সরিয়ে সেখানে ইংল্যান্ডের সিংহকে বসিয়ে দেওয়া হয়। যেন দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অবশেষে এক ছাদের তলায় সংসার পাতলো! আজও ব্রিটিশ রাজকীয় প্রতীকে একদিকে ইংল্যান্ডের সিংহ আর অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের শেকল বাঁধা ইউনিকর্নকে দেখা যায়।
আজও যদি আপনি স্কটল্যান্ডে ঘুরতে যান, দেখবেন ইউনিকর্নের ভালোবাসা কিভাবে ছড়িয়ে আছে গোটা দেশটায়। এডিনবরা ক্যাসেলের গেট থেকে শুরু করে স্টার্লিং ক্যাসেলের মতো ঐতিহাসিক দুর্গে, কিংবা বিভিন্ন শহরের মার্কেট ক্রসে—সবখানেই এই মায়াবী প্রাণীটির দেখা মিলবে। এটা শুধু একটা প্রতীক নয়, এটা স্কটিশদের পরিচয়, তাদের স্বাধীনতা, আভিজাত্য আর সেই রূপকথার প্রতি ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রমাণ, যা আজও তাদের শিরায় শিরায় বয়। তাই পরেরবার যখন ইউনিকর্নের ছবি দেখবেন, তখন শুধু একটা কাল্পনিক ঘোড়া নয়, ভাববেন এক স্বাধীনচেতা, গর্বিত জাতির কথা, যারা ভালোবেসে এক স্বপ্নকে তাদের জাতীয় পরিচয় বানিয়ে নিয়েছে।