ঘটনার প্রেক্ষাপট
সময়টা দ্বাদশ শতকের শেষভাগ। দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রোভঁস অঞ্চলের বুক চিরে বয়ে চলেছে চঞ্চল রোন নদী। নদীর তীরে, আর্লস এবং আভিগননের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত ছোট্ট শান্ত শহর নেরলুক। চারপাশে সবুজের সমারোহ, আঙুরের ক্ষেত আর শান্ত জনজীবন। কিন্তু এই আপাত শান্তির আড়ালে কোথায় যেন লুকিয়ে ছিল এক জমাট বাঁধা আতঙ্ক। শহরের আকাশে-বাতাসে ভাসছিল এক অজানা ভয়। ফিসফিস করে মানুষ আলোচনা করত এক ভয়ঙ্কর প্রাণীর, যা নদীর গভীর জলে কিংবা তীরের ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকে। তারা এর নাম দিয়েছিল ‘তারাস্ক’ (Tarasque)।
লোকমুখে প্রচলিত বর্ণনাগুলো ছিল গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। বলা হতো, প্রাণীটা নাকি একটা বিশাল ষাঁড়ের থেকেও বড় এবং ঘোড়ার চেয়েও লম্বা। সিংহের মতো মাথা, ভালুকের মতো থাবাওয়ালা ছয়টি পা, কচ্ছপের মতো শক্ত খোলসে ঢাকা শরীর আর সাপের মতো এক লেজ, যার ডগায় রয়েছে কাঁকড়াবিছের মতো মারাত্মক হুল। এর নিঃশ্বাসে ছিল বিষ, আর দাঁত ছিল তরোয়ালের মতো ধারালো। এই ভয়ঙ্কর জীবটি নাকি গ্যালিথিয়া থেকে সমুদ্রপথে এসে রোন নদীতে আশ্রয় নিয়েছিল। শোনা যায়, এটি ছিল বাইবেলে বর্ণিত লেভিয়াথান (Leviathan) এবং পৌরাণিক ওনাকাসের (Onachus) সংকর।
দিনের পর দিন নেরলুকের মানুষেরা এই বিভীষিকার সঙ্গে বসবাস করছিল। সূর্যাস্তের পর কেউ নদীর কাছে যাওয়ার সাহস করত না। জঙ্গলের পথে একাকী যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রায়শই শোনা যেত গবাদি পশু হারানোর খবর। কখনও বা নদীর জলে নৌকো ডুবিয়ে দিত সেই ভয়ঙ্কর প্রাণী। এমনকি, দুর্ভাগ্যবশত একা পেয়ে গেলে মানুষকেও আক্রমণ করতে ছাড়ত না সে। শহরের সাহসী নাইটরা বহুবার চেষ্টা করেছেন এই দানবকে বধ করার জন্য। তরোয়াল, বর্শা, এমনকি ক্যাটাপুল্ট দিয়েও আক্রমণ করা হয়েছে। কিন্তু তারাস্কের পাথরের মতো শক্ত খোলের সামনে সমস্ত অস্ত্রই ব্যর্থ হয়েছিল। প্রতিবারই সে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যেত জলের গভীরে, আর রেখে যেত একরাশ ধ্বংস আর আতঙ্ক। নেরলুকের মানুষেরা প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের মনে হয়েছিল, এই অভিশাপ থেকে মুক্তির আর কোনও পথ নেই।
রহস্যের জাল
এমনই এক হতাশাজনক পরিস্থিতিতে, প্রায় ৪৮ খ্রিস্টাব্দে, ঈশ্বরের কৃপায় এক আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে। জানা যায়, খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের উপর অত্যাচারের কারণে জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত একদল মানুষ একটি পাল বা দাঁড়বিহীন নৌকায় ভূমধ্যসাগরে ভেসে পড়েন। সেই নৌকায় ছিলেন যিশুর অনুগামী সেন্ট মার্থা, তাঁর ভাই ল্যাজারাস এবং বোন মেরি। অলৌকিকভাবে নৌকাটি ফ্রান্সের উপকূলে এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে সেন্ট মার্থা ঈশ্বরের বাণী প্রচার করতে করতে প্রোভঁস অঞ্চলে এসে পৌঁছান।
নেরলুকের আতঙ্কিত মানুষেরা যখন সেন্ট মার্থার অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনলেন, তখন তাঁরা তাঁর কাছে ছুটে গেলেন। তাঁরা করজোড়ে অনুরোধ করলেন এই ভয়ঙ্কর তারাস্কের হাত থেকে শহরকে বাঁচানোর জন্য। মার্থা, যাঁর ভরসা ছিল শুধু তাঁর বিশ্বাস আর ঈশ্বরের প্রতি আস্থা, তিনি নির্ভয়ে এগিয়ে গেলেন। তিনি কোনও অস্ত্র নিলেন না, সঙ্গে নিলেন শুধু المقدس জল (Holy Water) আর একটি ক্রুশ।
শহরের মানুষরা বিস্ময় ও ভয় নিয়ে দূর থেকে দেখতে লাগল। সেন্ট মার্থা একাকী প্রবেশ করলেন সেই জঙ্গলে, যেখানে তারাস্কের বাস। কিছু দূর যেতেই তিনি দেখলেন সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য। তারাস্ক তখন সবেমাত্র একজন মানুষকে আক্রমণ করে খাচ্ছিল। সেই বীভৎস রূপ দেখেও মার্থা একচুলও ভয় পেলেন না। তিনি শান্তভাবে এগিয়ে গিয়ে তারাস্কের উপর المقدس জল ছিটিয়ে দিলেন এবং তার সামনে ক্রুশটি তুলে ধরলেন।
আর তখনই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা! যে দানবকে শক্তিশালী নাইটদের অস্ত্র পরাস্ত করতে পারেনি, সে এক নিরীহ ভেড়ার মতো শান্ত হয়ে গেল। তার চোখের আগুন নিভে গেল, হিংস্রতা বদলে গেল এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণে। সেন্ট মার্থা তাঁর কোমরের বেল্ট বা কোমরবন্ধনীটি খুলে তারাস্কের গলায় পরিয়ে দিলেন। একসময়কার আতঙ্ক, সেই ভয়ঙ্কর তারাস্ক পোষা পশুর মতো সেন্ট মার্থার পিছন পিছন হেঁটে চলল শহরের দিকে।
শহরের মানুষরা এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গেল। তাদের চোখেমুখে ছিল বিস্ময় আর অবিশ্বাস। কিন্তু যে ভয় এতদিন তাদের তাড়া করে বেড়িয়েছে, সেই ভয় এক মুহূর্তে পরিণত হলো ক্রোধে। তারা এতদিন ধরে যে যন্ত্রণা ভোগ করেছে, তার প্রতিশোধ নিতে চাইল। সেন্ট মার্থা প্রাণীটিকে শান্ত করেছিলেন, কিন্তু শহরের আতঙ্কিত মানুষেরা তাকে ক্ষমা করতে পারেনি। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে, বর্শা আর পাথরের আঘাতে, বিনা প্রতিরোধে তারাস্কের মৃত্যু হলো।
সত্যের উন্মোচন
এই ঘটনার পর সেন্ট মার্থার প্রতি শ্রদ্ধায় এবং তারাস্কের স্মৃতিতে নেরলুক শহরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘তারাস্কন’ (Tarascon)। সেই থেকে তারাস্ক এই শহরের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যা একসময় ছিল আতঙ্কের কারণ, তাই আজ তাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর জুন মাসের শেষে তারাস্কনের মানুষ এই কিংবদন্তিকে স্মরণ করে এক বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করে, যেখানে তারাস্কের একটি বিশাল প্রতিকৃতি শহর পরিক্রমা করে। এই ঐতিহ্য এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে ২০০৫ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) এটিকে ‘মানবতার মৌখিক ও অধরা ঐতিহ্যের অংশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারাস্ক কি সত্যিই ছিল? নাকি এটি নিছকই এক পৌরাণিক গাঁথা? ঐতিহাসিক এবং গবেষকদের মধ্যে এই নিয়ে নানা মত प्रचलित। অনেকেই মনে করেন, তারাস্ক আসলে রোন নদীর বিধ্বংসী বন্যার প্রতীক। প্রাচীনকালে নদীর ভয়াল রূপ এবং তার ধ্বংসলীলাকে হয়তো এই পৌরাণিক প্রাণীর চেহারায় কল্পনা করা হয়েছিল। সেন্ট মার্থার আগমন এবং তারাস্ককে দমন করার ঘটনাটি হয়তো খ্রিস্টধর্মের মাধ্যমে প্রকৃতির সেই ভয়ঙ্কর শক্তিকে নিয়ন্ত্রণের এক রূপক কাহিনী।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো কোনও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর জীবাশ্ম বা কোনও বিশাল কুমিরের গল্পের উপর ভিত্তি করে এই কিংবদন্তির জন্ম। দ্বাদশ শতকে সেন্ট মার্থার ধ্বংসাবশেষ তারাস্কনে আবিষ্কৃত হওয়ার পর, তাঁর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য হয়তো এই লোককথাটিকে তাঁর জীবনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি ১৯৯১ সালে আবিষ্কৃত এক ধরনের ডাইনোসরের নামকরণ করা হয়েছে ‘তারাস্কোসরাস’ (Tarascosaurus), যা এই কিংবদন্তির প্রতি বিজ্ঞানীদের এক ধরনের সম্মান প্রদর্শন।
কারণ যা-ই হোক না কেন, তারাস্কের রহস্য আজও মানুষকে মুগ্ধ করে। এটি কি সত্যিই এক রক্ত-মাংসের প্রাণী ছিল যা একদিন ফ্রান্সের বুকে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল? নাকি এটি কেবলই মানুষের ভয়, বিশ্বাস আর প্রকৃতির অদম্য শক্তির এক সম্মিলিত কল্পনা? উত্তরটা হয়তো ইতিহাসের গভীরে কোথাও হারিয়ে গেছে, কিন্তু তারাস্কনের আকাশে-বাতাসে আজও ভেসে বেড়ায় সেই পৌরাণিক বিভীষিকা আর এক নারীর অসামান্য সাহসিকতার শিহরণ জাগানো কাহিনী।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)