ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৯৪৮ সালের ১লা ডিসেম্বর, ভোরবেলা। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরের দক্ষিণে সোমারটন বিচে কয়েকজন লোক ঘোড়া নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিল। সমুদ্রের ঢেউ যেখানে বালির উপর আছড়ে পড়ছে, তার ঠিক পাশেই পাথরের বাঁধের গায়ে হেলান দেওয়া এক ব্যক্তিকে দেখতে পায় তারা। পরনে স্যুট আর টাই, পায়ে চকচকে পালিশ করা জুতো। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো ক্লান্ত পথিক হয়তো নিছকই বিশ্রাম নিচ্ছেন। লোকটির বুকের উপর একটা আধখাওয়া সিগারেট এমনভাবে রাখা ছিল, যেন শেষ মুহূর্তে সেটি তার ঠোঁট থেকে খসে পড়েছে। কিন্তু সকাল গড়িয়ে দুপুর হওয়ার উপক্রম হলেও যখন লোকটির কোনো নড়াচড়া দেখা গেল না, তখন সন্দেহ জাগে। কাছে গিয়ে পরীক্ষা করতেই হাড় হিম করা সত্যিটা সামনে এল - লোকটি মৃত।
পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করল। প্রথম দেখায় অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না। লোকটির বয়স চল্লিশের কোঠায়, শরীর সুঠাম, ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত বলে মনে হচ্ছিল। তার পকেটে পাওয়া গেল একটা বাসের ব্যবহৃত টিকিট, হেনলি বিচে যাওয়ার একটি অব্যবহৃত ট্রেনের টিকিট, একটা চিরুনি, অর্ধেক খাওয়া এক প্যাকেট চুইংগাম, সিগারেট আর দেশলাই। কিন্তু যা পাওয়া গেল না, তা হলো তার পরিচয়পত্র, কোনো মানিব্যাগ বা টাকা। আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তার পরনের সমস্ত পোশাকের লেবেল যত্ন করে কেটে ফেলা হয়েছিল। যেন কেউ তার পরিচয় গোপন রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কোনো স্পষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। চিকিৎসকদের ধারণা, হয়তো কোনো undetectable বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে, যা সে সময়ে চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক রহস্যময় অধ্যায়ের এভাবেই শুরু হয়েছিল, যা আজ ‘সোমারটন ম্যান’ বা ‘তামাম শুদ’ কেস নামে পরিচিত।
রহস্যের জাল
তদন্ত যত এগোতে থাকল, রহস্যের জাল ততই জটিল হতে শুরু করল। কয়েক মাস পর, তদন্তকারীরা মৃতদেহের ট্রাউজারের একটি গোপন বা লুকানো পকেট আবিষ্কার করেন। সেই পকেটের ভেতরে পাওয়া গেল এক টুকরো কাগজ, যা সযত্নে ভাঁজ করে রাখা ছিল। কাগজে ছাপার অক্ষরে লেখা ছিল মাত্র দুটি শব্দ: “Tamám Shud”।
শব্দ দুটি ফার্সি, যার অর্থ “সমাপ্ত” বা “শেষ”। বিশেষজ্ঞরা দ্রুতই খুঁজে বের করলেন যে, এই লাইনটি দ্বাদশ শতকের বিখ্যাত পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের ‘রুবাইয়াত’ কাব্যগ্রন্থের শেষ পাতা থেকে ছেঁড়া হয়েছে। খবরের কাগজে এই তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিছুদিন পর, এক ব্যক্তি পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে জানান যে, ঘটনার সময় তার গাড়ির পেছনের সিটে তিনি ‘রুবাইয়াত’-এর একটি কপি খুঁজে পেয়েছিলেন, যার শেষ পাতা থেকে “তামাম শুদ” লেখা অংশটি ছেঁড়া ছিল।
বইটি পরীক্ষা করতে গিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। বইয়ের পেছনের পাতায় পেন্সিলে লেখা কিছু দুর্বোধ্য সংকেত পাওয়া যায়, যা দেখতে অনেকটা গুপ্ত সংকেতের মতো। সাংকেতিক অক্ষরগুলো ছিল এরকম: MRGOABABD MLIAOI MTBIMPANETP MLIABOAIAQC ITTMTSAMSTGAB। আজও বিশ্বের সেরা ক্রিপ্টোগ্রাফাররা এই সংকেতের অর্থ উদ্ধার করতে পারেননি।
শুধু তাই নয়, সেই বইতে একটি ফোন নম্বরও লেখা ছিল। নম্বরটি ছিল জেসিকা থমসন নামের এক নার্সের, যিনি সোমারটন বিচ থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে বাস করতেন। পুলিশ জেসিকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে, তিনি মৃত ব্যক্তিকে চিনতে অস্বীকার করেন। কিন্তু যখন তাকে লোকটির মুখের প্লাস্টার কাস্ট দেখানো হয়, তখন তিনি এতটাই বিচলিত হয়ে পড়েন যে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তার। তিনি পুলিশকে অনুরোধ করেন যেন তার নাম এই মামলার রেকর্ডে না রাখা হয়। পুলিশ তার সেই অদ্ভুত অনুরোধ মেনেও নিয়েছিল।
জেসিকা পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি যুদ্ধের সময় আলফ্রেড বক্সাল নামে এক সেনা কর্মকর্তাকে ‘রুবাইয়াত’-এর একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন। পুলিশের সন্দেহ হয়, মৃত ব্যক্তিটিই হয়তো বক্সাল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সিডনিতে বক্সালকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং তার কাছে থাকা বইটির শেষ পাতাও অক্ষত ছিল।
সত্যের উন্মোচন
বছর গড়ানোর সাথে সাথে সোমারটন ম্যানকে নিয়ে নানা তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। ঠান্ডা যুদ্ধের আবহে অনেকেই তাকে সোভিয়েত গুপ্তচর বলে সন্দেহ করতে শুরু করেন। তাদের মতে, হয়তো প্রতিপক্ষের হাতে তিনি খুন হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছিল প্রেমঘটিত কোনো বিয়োগান্তক ঘটনা, যেখানে জেসিকা থমসন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
কয়েক দশক পর জেসিকার মেয়ে এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, তার মা তাকে বলেছিলেন যে তিনি সোমারটন ম্যানকে চিনতেন এবং তার আসল পরিচয় পুলিশের চেয়েও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানতেন। জেসিকার ছেলে রবিন থমসনের কানের গঠন এবং দাঁতের কিছু বিরল বৈশিষ্ট্য মৃত ব্যক্তির সাথে মিলে গিয়েছিল, যা থেকে অনেকের সন্দেহ হয় যে, রবিন হয়তো সোমারটন ম্যানেরই সন্তান।
সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। তবে সম্প্রতি, ২০২২ সালে, অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেরেক অ্যাবট এবং আমেরিকান জিনোলজিস্ট কলিন ফিটজপ্যাট্রিক দাবি করেন যে তারা ডিএনএ প্রযুক্তির সাহায্যে সোমারটন ম্যানের পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন। তাদের মতে, লোকটি ছিলেন কার্ল ‘চার্লস’ ওয়েব, মেলবোর্নের একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যন্ত্র নির্মাতা, যিনি ১৯৪৫ সালের পর নিখোঁজ হয়ে যান। এই আবিষ্কার মামলার একটি বড় অগ্রগতি হলেও, মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও মেলেনি।
চার্লস ওয়েব কেন নিজের পরিচয় গোপন করে অ্যাডিলেডে এসেছিলেন? তার পোশাকে কোনো লেবেল ছিল না কেন? সেই দুর্বোধ্য সংকেতের অর্থ কী? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল? বিষ প্রয়োগে হত্যা, আত্মহত্যা, নাকি নিছকই দুর্ঘটনা? ‘তামাম শুদ’ বা ‘সমাপ্তি’ লেখা কাগজটি কি তার জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত ছিল? সোমারটন বিচের বালিতে লুকিয়ে থাকা সেই রাতের সত্যিটা হয়তো কোনোদিনই পুরোপুরি জানা যাবে না। সমাপ্তি লেখা থাকলেও, এই রহস্যের যেন কোনো শেষ নেই।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)