ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৮০৯ সাল। ইউরোপের আকাশ-বাতাস তখন বারুদের গন্ধে ভারী। নেপোলিয়নের অপ্রতিরোধ্য অগ্রাসনে মহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। এই টালমাটাল সময়ে, অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যের দরবারে ব্রিটিশ envoy বা দূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন বেঞ্জামিন বাথার্স্ট। তার উপর দায়িত্ব ছিল ব্রিটেন এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক জোটকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু অস্টারলিৎজের যুদ্ধে ফরাসিদের কাছে অস্ট্রিয়ার শোচনীয় পরাজয়ের পর পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে ওঠে। বাথার্স্টের জীবন তখন তীব্র ঝুঁকির মুখে। ফরাসি গুপ্তচরদের জাল ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ইউরোপে, আর বাথার্স্ট ছিলেন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

বিপদের আঁচ পেয়ে, বাথার্স্ট ছদ্মবেশে নিজের সহচর হের ক্রাউসকে নিয়ে জার্মানির মধ্য দিয়ে হামবুর্গের দিকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যেখান থেকে জাহাজে করে ইংল্যান্ডে ফেরা সম্ভব ছিল। তারা “ব্যারন ডি কোচ” এবং “ফিশার” ছদ্মনামে ভ্রমণ করছিলেন। যাত্রাপথ ছিল দীর্ঘ এবং বিপজ্জনক। প্রতিটি সরাইখানা, প্রতিটি শহর ছিল ফরাসি চরদের সম্ভাব্য ফাঁদ।

রহস্যের জাল

২৫শে নভেম্বর, ১৮০৯। এক কনকনে শীতের সন্ধ্যায় বাথার্স্ট এবং ক্রাউস বার্লিনের পশ্চিমে পার্লবার্গ নামক এক ছোট্ট শহরে এসে পৌঁছান। তারা সেখানকার ‘হোয়াইট সোয়ান’ নামক এক পান্থশালায় ওঠেন। ঘোড়া বদলানোর জন্য তারা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। সরাইখানায় পৌঁছে বাথার্স্ট রাতের খাবারের নির্দেশ দেন এবং একটি আলাদা ঘরে দীর্ঘ সময় ধরে কিছু লিখতে বসেন। তার আচরণে তীব্র উদ্বেগ ও মানসিক চাপের ছাপ ছিল স্পষ্ট। রাত ৯টা নাগাদ যখন জানানো হলো যে তাদের ঘোড়া প্রস্তুত, বাথার্স্ট ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।

এর পরের ঘটনাপ্রবাহ এতটাই আকস্মিক ও অদ্ভুত যে, তা আজও ঐতিহাসিকদের হতবাক করে। বাথার্স্ট তার সহচর ক্রাউসকে কয়েক মুহূর্তের জন্য পেছনে ফেলে গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। ক্রাউস যখন তার ঠিক পেছনেই পান্থশালার দরজা পার হয়ে আস্তাবলের কাছে পৌঁছান, তিনি দেখেন গাড়িটি প্রস্তুত, কিন্তু বেঞ্জামিন বাথার্স্ট সেখানে নেই। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একজন জলজ্যান্ত মানুষ যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিলেন! ক্রাউস এবং সরাইখানার কর্মীরা চারিদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, কিন্তু বাথার্স্টের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই ব্রিটিশ সরকার তোলপাড় শুরু করে। বাথার্স্টের স্ত্রী ফিলিডা ব্যক্তিগতভাবে জার্মানিতে ছুটে আসেন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সহায়তায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালান। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে সরাসরি দায়ী করা হয়। অভিযোগ ওঠে, তার গুপ্তচররাই বাথার্স্টকে অপহরণ করে খুন করেছে। যদিও নেপোলিয়ন এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং নিজে থেকেও অনুসন্ধানে সাহায্যের প্রস্তাব দেন। কয়েক সপ্তাহ পরে, পান্থশালার এক কর্মচারীর কাছ থেকে বাথার্স্টের কোটটি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু মানুষটি কোথায় গেলেন, তার উত্তর মেলেনি।

সত্যের উন্মোচন

ঘটনার প্রায় ৪৩ বছর পর, ১৮৫২ সালে, সেই ‘হোয়াইট সোয়ান’ পান্থশালা থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরের একটি বাড়ির আস্তাবলের নিচে একটি কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়। কঙ্কালটির খুলিতে একটি মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা দেখে মনে করা হয় এটি একটি হত্যাকাণ্ড। অনেকেই অনুমান করেন, এটিই হয়তো হারানো কূটনীতিক বেঞ্জামিন বাথার্স্টের দেহাবশেষ। সম্ভবত, ফরাসি গুপ্তচর বা স্থানীয় দস্যুরা তাকে হত্যা করে সেখানেই পুঁতে রেখেছিল।

তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, বাথার্স্টের অন্তর্ধানের ঘটনাটি বছরের পর বছর ধরে নানা অতিরঞ্জিত গল্পের জন্ম দিয়েছে। অতিপ্রাকৃত অন্তর্ধানের তত্ত্বও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা হলো, তিনি সম্ভবত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। নেপোলিয়নের যুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে একজন ব্রিটিশ কূটনীতিকের জন্য জার্মানির মাটি নিরাপদ ছিল না। গুপ্তহত্যা, অপহরণ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

বেঞ্জামিন বাথার্স্টের অন্তর্ধান আজও ইতিহাসের এক অমীমাংসিত অধ্যায়। তিনি কি ফরাসি গুপ্তচরদের হাতে খুন হয়েছিলেন? নাকি স্থানীয় দস্যুদের শিকার হয়েছিলেন? নাকি তার অন্তর্ধানের পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র? পার্লবার্গের সেই শীতের রাতের কুয়াশার মতো এই রহস্যও আজও ঘন হয়ে আছে।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)