প্রেমের টেবিলে এক ‘শয়তানের যন্ত্র’

ভাবুন তো, কোনো এক নরম আলোয় সাজানো রেস্তোরাঁ, আপনার সামনে বসা প্রিয় মানুষটি, আর টেবিলের ওপর রাখা ঝকঝকে রুপোলি চামচ আর কাঁটাচামচ। বাতাসে ভাসছে হালকা রোমান্টিক সুর, আর আপনারা দুজনে অপেক্ষা করছেন গরম ধোঁয়া ওঠা পাস্তার জন্য। কী সুন্দর, নিখুঁত একটা ছবি, তাই না? কিন্তু যদি বলি, আপনার প্লেটের পাশে রাখা ওই নিরীহ দেখতে কাঁটাচামচটির একটি scandalous, বিতর্কিত এবং প্রায় ‘শয়তানী’ অতীত আছে? যে জিনিসটা ছাড়া আজ ফাইন ডাইনিং ভাবাই যায় না, সেটাই এককালে ছিল ধর্মীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু! চলুন, আজ সেই কাঁটাচামচের কাঁটাছেঁড়া করা যাক।

আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে, ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ—রাজা-রাজড়া থেকে সাধারণ নাগরিক—সবাই হাত দিয়েই খাবার খেতেন। আঙুলই ছিল তাদের প্রাকৃতিক কাঁটাচামচ। ছুরি ব্যবহার হতো মাংস কাটার জন্য আর স্যুপের জন্য ছিল চামচ, কিন্তু প্লেট থেকে খাবার তুলে মুখে দেওয়ার জন্য আঙুলের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কিছুই ছিল না। হাত দিয়ে খাওয়ার মধ্যে একটা আন্তরিকতা ছিল, একটা মাটির কাছাকাছি থাকার অনুভূতি ছিল।

এককালে কাঁটাচামচ ব্যবহারকে ঈশ্বরবিরোধী এবং ভয়ঙ্কর স্ক্যান্ডালাস বলে মনে করা হতো, কারণ ঈশ্বর আমাদের প্রাকৃতিক কাঁটাচামচ—অর্থাৎ আমাদের আঙুল দিয়েছেন!

এই ধারণার মূলে ছিল ধর্ম আর ঐতিহ্য। চার্চের কর্তাব্যক্তিরা মনে করতেন, ঈশ্বর প্রদত্ত হাত দিয়ে খাবার স্পর্শ করাই পবিত্র। সেখানে ধাতুর তৈরি একটি কৃত্রিম যন্ত্র ব্যবহার করাটা ছিল ঈশ্বরের সৃষ্টির অপমান। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, ঈশ্বর আপনাকে চলার জন্য পা দিয়েছেন, কিন্তু আপনি লাঠিতে ভর করে চলছেন।

এক রাজকুমারীর আনা ‘শয়তানের কাঁটা’

কাঁটাচামচের এই ‘বদনাম’-এর পেছনে সবচেয়ে বড় গল্পটি জড়িয়ে আছে এক বাইজেন্টাইন রাজকুমারীর সঙ্গে। একাদশ শতকে, মারিয়া আর্জিরোপুলিনা নামের এক গ্রিক রাজকুমারী ভেনিসের তৎকালীন শাসকের ছেলেকে বিয়ে করতে আসেন। তিনি সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন তার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সোনার তৈরি দুই কাঁটাওয়ালা একটি ছোট্ট কাঁটাচামচ। বিয়ের ভোজে যখন সবাই হাত দিয়ে খাচ্ছিল, তখন রাজকুমারী মারিয়া সেই সোনার কাঁটা দিয়ে ফল তুলে মুখে দিলেন, যাতে তার হাত আঠালো না হয়ে যায়।

ভেনিসের অভিজাত সমাজ তো অবাক! এ আবার কেমন আচরণ? একজন ধর্মযাজক, সেন্ট পিটার ডেমিয়ান, এই ঘটনায় এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তিনি ঘোষণা করেন, এটা ঈশ্বরের প্রতি চরম অপমান। তার মতে, ঈশ্বর যেহেতু আমাদের খাবার খাওয়ার জন্য আঙুল দিয়েছেন, তাই এই কৃত্রিম বস্তুর ব্যবহার এক ধরনের ঔদ্ধত্য ও পাপ। দুর্ভাগ্যবশত, এর কিছুদিন পরেই রাজকুমারী প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আর যায় কোথায়! সেন্ট পিটার ডেমিয়ান প্রচার করতে শুরু করেন যে, ঈশ্বরের অপমান করার জন্যই এই ভয়ংকর শাস্তি তাকে পেতে হয়েছে। ব্যস, কাঁটাচামচ হয়ে গেল শয়তানের যন্ত্র আর এক অশুভ প্রতীক।

ইউরোপ জুড়ে বিতর্ক ও ধীরগতির পথচলা

এই ঘটনার পর প্রায় ৪০০ বছর ধরে ইউরোপে কাঁটাচামচের ব্যবহার প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। এটিকে মেয়েলি, দুর্বল এবং অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা হিসেবে দেখা হতো। ফরাসিরা তো কাঁটাচামচ ব্যবহারকারীদের নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি করত। ১৬ শতকে ইতালির অভিজাতদের মধ্যে, বিশেষ করে পাস্তা খাওয়ার সুবিধার জন্য, এর ব্যবহার আবার বাড়তে শুরু করে। এরপর ইতালির রাজকুমারী ক্যাথরিন ডি’মেডিসি যখন ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় হেনরিকে বিয়ে করেন, তখন তিনি এই প্রথাটি ফ্রান্সে নিয়ে যান। কিন্তু তখনও সাধারণ মানুষ इसे সহজে গ্রহণ করেনি। ইংল্যান্ডের রানি প্রথম এলিজাবেথ কাঁটাচামচকে ‘অমার্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

ভাবতে অবাক লাগে, যে কাঁটাচামচকে একসময় শয়তানের পিচফর্কের সাথে তুলনা করা হতো, আজ সেটাই আমাদের খাবার টেবিলের এক অপরিহার্য অংশ। যেটাকে এককালে মেয়েলি বলে ব্যঙ্গ করা হতো, সেটাই এখন রুচিশীলতার প্রতীক। এর পেছনের কারণটা কিন্তু বেশ মজার। সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি, সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বদলেছে। হাত দিয়ে খাওয়ার বদলে কাঁটাচামচ দিয়ে খাওয়াটা আরও স্বাস্থ্যকর এবং পরিশীলিত বলে মনে হতে শুরু করে।

সুতরাং, পরেরবার যখন কোনো রোমান্টিক ডিনারে আপনার হাতে কাঁটাচামচ উঠবে, তখন একবার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবেন। মনে করবেন, এই নিরীহ বস্তুটি একসময় কতটা ঝড় তুলেছিল! সে এক বিদ্রোহী প্রেমিকের মতো সমাজের সমস্ত নিয়ম আর বদনামের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। আপনার আর আপনার প্রিয়জনের মাঝখানে থাকা এই কাঁটাচামচ শুধু একটি ধাতুর টুকরো নয়, এটি ইতিহাস, বিতর্ক আর ভালোবাসার এক নীরব সাক্ষী।