প্রেম আর ফলের সম্পর্ক কিন্তু বহুদিনের। সেই আদম-হাওয়ার নিষিদ্ধ আপেল থেকে শুরু করে কত কবি-সাহিত্যিক যে তাদের প্রেমিকাকে ডালিম, চেরি বা স্ট্রবেরির সাথে তুলনা করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ফল মানেই যেন মিষ্টি, সুন্দর আর পবিত্রতার প্রতীক। কিন্তু এমন একটা ফল যদি থাকে, যার নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক চরম লজ্জাজনক অথচ মজাদার ইতিহাস? যদি বলি, আপনার স্বাস্থ্যকর ব্রেকফাস্টের প্রিয় ‘অ্যাভোকাডো টোস্ট’-এর পেছনের গল্পটা এতটা মিষ্টি নয়, বরং একটু বেশিই দুষ্টু?

আজ আপনাদের শোনাবো তেমনই এক ফলের গল্প, যা একসময় তার নামের কারণেই বাড়ির কুমারী মেয়েদের থেকে শতহস্ত দূরে রাখা হতো। চলুন ডুব দেওয়া যাক অ্যাভোকাডোর সেই মজাদার আর খানিকটা রোমান্টিক ইতিহাসে।

অ্যাভোকাডো: যে ফলের নাম শুনলেই লজ্জা পেত অ্যাজটেকরা!

ভাবুন তো, আপনি দোকানে গিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বললেন, ‘এক কেজি অ্যাভোকাডো দিন’। কিন্তু আজ থেকে শত শত বছর আগে মেক্সিকোর অ্যাজটেক সভ্যতায় ফিরে গেলে এই ফলের নাম জনসমক্ষে উচ্চারণ করার আগেও হয়তো আপনাকে দশবার ভাবতে হতো। কারণটা আর কিছুই নয়, এর আসল নাম! আজকের দিনে আমরা যাকে ‘অ্যাভোকাডো’ নামে চিনি, অ্যাজটেকরা তাকে ভালোবেসে একটি বিশেষ নামে ডাকত।

প্রাচীন অ্যাজটেক নাহুয়াটল (Nahuatl) ভাষায় অ্যাভোকাডোর আসল নাম ছিল ‘আহুয়াকাটল’ (āhuacatl), যার আক্ষরিক অর্থ হলো... ‘অণ্ডকোষ’ বা Testicle! [1]

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! ফলের এমন অদ্ভুত আর লজ্জাজনক নামকরণের কারণটাও কিন্তু বেশ মজার। অ্যাজটেকরা দেখেছিল, এই ফলটি গাছের ডালে জোড়ায় জোড়ায় ঝুলে থাকে। [6, 5] এর আকার এবং ঝুলে থাকার ভঙ্গি তাদের পুরুষদের உடற்கூறியல் (anatomy)-এর কথা মনে করিয়ে দিত। আর সেখান থেকেই এই নামকরণ। [2, 10] শুধু নামেই নয়, গুণের দিক থেকেও অ্যাজটেকরা ফলটিকে পৌরুষ এবং প্রজনন ক্ষমতার প্রতীক বলে মনে করত। [4] তারা বিশ্বাস করত, এই ফল খেলে ফার্টিলিটি বা উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। [2] এই খ্যাতির কারণেই অ্যাজটেক সমাজে অ্যাভোকাডোকে দেখা হতো এক শক্তিশালী অ্যাফ্রোডিজিয়াক বা কামোদ্দীপক ফল হিসেবে। [4, 2] লোককথা অনুযায়ী, অ্যাভোকাডো চাষের মৌসুমে কুমারী মেয়েদের নাকি বাড়ির বাইরে যেতে দেওয়া হতো না, এই ভেবে যে ফলটির প্রভাবে পুরুষদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে! [5]

‘অণ্ডকোষ’ থেকে যেভাবে হলো আজকের ‘অ্যাভোকাডো’

ভাবছেন তো, এমন একটা অদ্ভুত নামের ফল বিশ্বজুড়ে এত জনপ্রিয় হলো কীভাবে? এর পেছনের গল্পটাও বেশ আকর্ষণীয়। ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা যখন মেক্সিকোতে এসে এই ফলের সন্ধান পায়, তারাও এর আসল নাম ‘আহুয়াকাটল’ শুনে বেশ বিপাকে পড়েছিল। [10, 8] তাদের পক্ষে এই কঠিন শব্দটি উচ্চারণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই তারা নিজেদের সুবিধার জন্য নামটিকে একটু বদলে ‘আগুয়াকাতে’ (aguacate) বলে ডাকা শুরু করে। [3, 8]

এরপর বহু বছর কেটে যায়। ফলটি ধীরে ধীরে ইউরোপ ও অন্যান্য দেশে পৌঁছাতে শুরু করে। ১৬৯৬ সালে আইরিশ প্রকৃতিবিদ স্যার হান্স স্লোন তার জ্যামাইকার উদ্ভিদের ক্যাটালগে প্রথমবার ফলটিকে ইংরেজিতে ‘অ্যাভোকাডো’ নামে নথিভুক্ত করেন। [10] তবে এর পরেও এর বিপদ কাটেনি। অনেকেই একে ‘অ্যালিগেটর পেয়ার’ (Alligator Pear) বলেও ডাকত, কারণ এর সবুজ, অমসৃণ খোসাটা দেখতে অনেকটা কুমিরের চামড়ার মতো। [2] অবশেষে, ১৯১৫ সাল নাগাদ ক্যালিফোর্নিয়ার কৃষকরা এর বাজারজাত করার জন্য ‘অ্যাভোকাডো’ নামটিকেই পাকাপাকিভাবে বেছে নেয়। [1] এই ব্র্যান্ডিং এতটাই সফল হয়েছিল যে, ফলটির পেছনের সেই ‘লজ্জাজনক’ ইতিহাসটা ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়।

প্রেমের ফল থেকে সুপারফুড: একাল ও সেকাল

যে ফল একসময় তার নামের জন্য এবং কামোদ্দীপক হিসেবে পরিচিত ছিল, আজ বিজ্ঞান তার ভেতরের আসল গুণ খুঁজে পেয়েছে। আধুনিক গবেষণা বলছে, অ্যাভোকাডোতে রয়েছে প্রায় ২০ ধরনের ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। [16, 18] এতে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, পটাশিয়াম এবং ভিটামিন-ই নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই ভীষণ উপকারী। [6, 4] অ্যাজটেকরা হয়তো বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুযোগ পায়নি, কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ যে খুব একটা ভুল ছিল না, তা আজ প্রমাণিত।

সুতরাং, পরেরবার যখন আপনি আপনার প্রিয় গুয়াকামোলে (Guacamole) খাবেন বা অ্যাভোকাডো টোস্টে কামড় দেবেন, তখন শুধু এর স্বাস্থ্যগুণের কথাই ভাববেন না। একবার সেই প্রাচীন অ্যাজটেকদের কথা ভাববেন, যাদের চোখে এটা শুধুই একটা ফল ছিল না, ছিল ভালোবাসা, উর্বরতা আর অফুরন্ত জীবনীশক্তির এক দুষ্টু-মিষ্টি প্রতীক। কে জানত, একটা ফলের নামের পেছনেও এমন রোমাঞ্চকর, মজাদার আর খানিকটা ‘অ্যাডাল্ট’ গল্প লুকিয়ে থাকতে পারে!