ভালুক যখন ভালোবাসার সৈনিক!

যুদ্ধ মানেই ধ্বংস, রক্ত আর হারানোর গল্প। কিন্তু এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও এমন কিছু ভালোবাসার গল্প জন্মায়, যা রূপকথাকেও হার মানায়। আজ তেমনই এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের গল্প বলব, যেখানে ভালোবাসার টানে এক ভালুক হয়ে উঠেছিল আস্ত এক সেনাবাহিনীর গর্বিত সৈনিক। হাসছেন? ভাবছেন, এ আবার হয় নাকি? আরে মশাই, ভালোবাসায় কী না হয়! চলুন, ডুব দেওয়া যাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের এক মিষ্টি történet-এ।

এক যে ছিল ভয়টেক, ভালোবাসার যোদ্ধা

গল্পের শুরুটা হয়েছিল ১৯৪২ সালে, ইরানের এক পাহাড়ি রাস্তায়। পোল্যান্ডের একদল সেনা নির্বাসন থেকে ফিরে মিত্রশক্তির সঙ্গে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই পথের মাঝে এক ইরানি কিশোরের কাছে দেখতে পান ছোট্ট এক বাদামী ভালুকের ছানা। শিকারীর গুলিতে মা মরে যাওয়ায় অনাথ হয়ে গিয়েছিল সে। সৈন্যদের মন গলে গেল। ক্যানে ভরা মাংস, চকোলেট আর একটা সুইস আর্মি নাইফের বিনিময়ে তাঁরা কিনে নিলেন ছোট্ট ছানাটিকে। সৈন্যদের দেওয়া আদুরে নাম হল ‘ভয়টেক’ (Wojtek), যার পোলিশ অর্থ ‘হাসিখুশি যোদ্ধা’।

সেই থেকেই ভয়টেকের নতুন পরিবার হল পোলিশ সেনাবাহিনী। প্রথমদিকে ছোট্ট ভয়টেক খেতে পারত না, তাই পুরনো ভদকার বোতলে ভরে তাকে কনডেন্সড মিল্ক খাওয়ানো হতো। ধীরে ধীরে সে বড় হতে লাগল আর সৈন্যদের আদরে একেবারে বাঁদর হয়ে উঠল! তার পছন্দের পানীয় ছিল বিয়ার, আর মাঝে মাঝে সৈন্যদের কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে নিয়ে চিবিয়ে খাওয়াও ছিল তার শখ। তবে ভয়টেকের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল তার বন্ধুদের সঙ্গে কুস্তি লড়া। ৯০ কেজি ওজনের এক ভালুকের সঙ্গে কুস্তি লড়ার মজাই ছিল আলাদা!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোলিশ সেনাবাহিনীতে সত্যিই একজন সৈনিক ছিল, যে ছিল আস্ত এক সিরিয়ান বাদামী ভালুক। তাকে রীতিমতো প্রাইভেট পদে নথিভুক্ত করা হয়েছিল এবং তার নিজস্ব সিরিয়াল নম্বর ও পে-বুকও ছিল!

সময় এগিয়ে চলল। পোলিশ সেনাদের এবার ইতালি যাওয়ার পালা। কিন্তু ব্রিটিশ জাহাজের নিয়ম খুব কড়া – কোনো বন্যপ্রাণীকে জাহাজে তোলা যাবে না। বন্ধুদের ছেড়ে ভয়টেককে রেখে যেতে হবে, এটা ভাবতেই সৈন্যদের মন ভেঙে গেল। তখন তাদের মাথায় এক অদ্ভুত বুদ্ধি এল। তারা ভয়টেককে আনুষ্ঠানিকভাবে পোলিশ সেনাবাহিনীতে নথিভুক্ত করে ফেলল! তাকে প্রাইভেট পদ, একটি সার্ভিস নম্বর দেওয়া হলো, আর এইভাবেই ভয়টেক হয়ে গেল পৃথিবীর একমাত্র ভালুক সৈনিক।

মন্টি ক্যাসিনোর যুদ্ধে ভয়টেকের বীরত্ব

ভয়টেকের আসল বীরত্ব দেখা গিয়েছিল ১৯৪৪ সালের কুখ্যাত মন্টি ক্যাসিনোর যুদ্ধে। মিত্রশক্তি তখন ইতালির এক পাহাড়ি মঠ দখল করার জন্য লড়ছে। সেই যুদ্ধে পোলিশ বাহিনীর ২২তম আর্টিলারি সাপ্লাই কোম্পানির দায়িত্ব ছিল পাহাড়ে যুদ্ধের রসদ, বিশেষ করে কামানের গোলা পৌঁছে দেওয়া। কাজটা ছিল ভীষণ বিপজ্জনক ও পরিশ্রমের।

একদিন ভয়টেক দেখল, তার বন্ধুরা ভীষণ কষ্ট করে কামানের গোলার ভারী বাক্স বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে এগিয়ে গেল এবং সটান দাঁড়িয়ে নিজের দুই лапа বাড়িয়ে দিল, যেন বলতে চাইল, ‘আমাকেও দাও!’ সৈন্যরা অবাক হলেও, একটা বাক্স তার দিকে এগিয়ে দিল। যা ভেবেছিল তাই! ভয়টেক অবলীলায় সেই ৪৫ কেজি ওজনের বাক্স তুলে নিল, যা সাধারণত চারজন সৈন্য মিলে বহন করত। এরপর থেকেตลอด যুদ্ধ সে একাই গোলা-বারুদের বাক্স বয়ে নিয়ে সৈন্যদের সাহায্য করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও তার হাত থেকে একটি বাক্সও কখনও পড়েনি।

তার এই বীরত্বের সম্মানে, ২২তম কোম্পানি তাদের офіഷ്യাল প্রতীক বদলে ফেলে। নতুন প্রতীকে যুক্ত হয় কামানের গোলা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভালুকের ছবি। ভয়টেককে তার সাহসিকতার জন্য কর্পোরাল পদে উন্নীত করা হয়।

যুদ্ধের শেষে এক মিষ্টি বিষাদের গল্প

যুদ্ধ শেষ হলে ভয়টেকের কোম্পানিকে স্কটল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানকার এক গ্রামে সে তারকা হয়ে ওঠে। কিন্তু সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়ার পর তার বন্ধুদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন এসে দাঁড়ায় – ভয়টেকের কী হবে? তাকে পোল্যান্ডে ফেরত পাঠানো সম্ভব ছিল না, কারণ তখন দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে চলে গিয়েছিল। তাই ভারী মনে, তাকে এডিনবরা চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেওয়া হয়।

চিড়িয়াখানায় ভয়টেকের জীবন কাটছিল, কিন্তু সে তার পুরনো বন্ধুদের ভোলেনি। তার প্রাক্তন সহযোদ্ধারা প্রায়ই তাকে দেখতে আসতেন। তারা খাঁচার ওপর দিয়ে পোলিশ ভাষায় ডাক দিলেই ভয়টেক সাড়া দিত। এমনকি মাঝেমধ্যে তারা নিয়ম ভেঙে খাঁচার ভেতরে ঢুকে তার সঙ্গে আগের মতোই কুস্তি লড়ত, তাকে সিগারেট দিত। ১৯৬৩ সালের ডিসেম্বরে ২১ বছর বয়সে ভয়টেক মারা যায়। তার মৃত্যুতে বিবিসি ঘোষণা করেছিল, “একজন বিখ্যাত পোলিশ সৈনিকের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।”

ভয়টেকের গল্প শুধু এক সৈনিকের গল্প নয়। এ হলো যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে ফুটে ওঠা এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প, যা প্রমাণ করে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা বা প্রজাতি হয় না। একদল একাকী সৈন্য আর এক অনাথ ভালুক ছানার মধ্যে গড়ে ওঠা এই অদ্ভুত সম্পর্ক আজও আমাদের শিখিয়ে যায়, ভালোবাসা থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।