প্রেমের শুরুটা না হয় একটু অন্যভাবে হোক!

ভাবুন তো, এক প্রেমকাহিনী, যার শুরুটা কোনো সুগন্ধী ফুলের বাগান বা রোম্যান্টিক ডিনারে হয়নি, বরং হয়েছে এক অসহ্য দুর্গন্ধে! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। আজ আপনাদের এমন এক শহরের গল্প শোনাবো, যে শহর তার নিজের দুর্গন্ধে নিজেই প্রায় ধ্বংস হতে বসেছিল। কিন্তু সেই চরম সংকট থেকেই জন্ম নেয় এক অবিশ্বাস্য সমাধানের, যা অনেকটা প্রেমিকের মতো এসে শহরকে বাঁচিয়েছিল। চলুন, ডুব দেওয়া যাক লন্ডনের সেই বিখ্যাত ‘গ্রেট স্টিঙ্ক’ বা ‘ভয়ংকর দুর্গন্ধে’র ইতিহাসে।

যখন টেমস নদীই হয়ে উঠেছিল লন্ডনের ভিলেন!

সালটা ১৮৫৮, লন্ডনের গ্রীষ্মকাল। ভিক্টোরিয়ান লন্ডন তখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর ধনী শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু এই উন্নতির পিছনেই লুকিয়ে ছিল এক ভয়ঙ্কর সত্যি। শহরের জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সমস্ত মানুষের বর্জ্য, কারখানার রাসায়নিক, এমনকি মৃত প্রাণী পর্যন্ত সরাসরি গিয়ে পড়ছিল টেমস নদীতে। যে টেমস একসময় লন্ডনের গর্ব ছিল, সেই নদীই হয়ে উঠেছিল এক উন্মুক্ত নর্দমা।

সেই বছর গরমটাও ছিল মারাত্মক। টেমস নদীর জলস্তর কমে গিয়ে তীরে জমে থাকা বর্জ্য শুকিয়ে এমন এক ভয়ানক দুর্গন্ধ তৈরি হলো যে মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এতটাই ভয়াবহ ছিল সেই পরিস্থিতি যে পার্লামেন্টের সদস্যরা পর্যন্ত দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। এই ঘটনাকেই ইতিহাস ‘The Great Stink’ বা ‘ভয়ংকর দুর্গন্ধ’ নামে চেনে।

এই দুর্গন্ধ শুধু অস্বস্তিকরই ছিল না, ছিল প্রাণঘাতীও। শহরের মানুষ কলেরার মতো ভয়ঙ্কর রোগে মারা যাচ্ছিল, কারণ তারা তখনও জানত না যে নদীর দূষিত জলই এর কারণ। তারা ভাবত, এই দুর্গন্ধ বা ‘মায়াজমা’ই রোগের কারণ। শহরটা যেন তার নিজের আবর্জনার কাছে হেরে যাচ্ছিল। কুইন ভিক্টোরিয়া এবং প্রিন্স অ্যালবার্ট একবার নৌবিহার করতে বেরিয়েও দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসতে বাধ্য হন।

দুর্গন্ধ থেকে জন্ম নেওয়া এক ‘হিরো’র গল্প!

যখন লন্ডনের অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকলেই এই দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ, তখন পার্লামেন্ট বুঝতে পারে যে আর বসে থাকার সময় নেই। মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে একটি বিল পাশ করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল লন্ডনকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া। আর তখনই মঞ্চে আগমন হয় আমাদের গল্পের নায়কের, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার স্যার জোসেফ ব্যাজালগেট (Joseph Bazalgette)-এর।

তিনি এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। প্রায় ১৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ ইন্টারসেপ্টিং স্যুয়ার বা ভূগর্ভস্থ পয়ঃনিষ্কাশন টানেল তৈরির এক বিশাল নকশা তৈরি করেন তিনি, যা শহরের সমস্ত বর্জ্যকে টেমস নদীর কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে। কাজটা সহজ ছিল না। প্রায় ৩১৮ মিলিয়ন ইট আর প্রচুর কংক্রিট ব্যবহার করে এই বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, যা আজও লন্ডনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

স্যার জোসেফ ব্যাজালগেটের এই সৃষ্টি শুধু দুর্গন্ধই দূর করেনি, লন্ডনকে বারবার ফিরে আসা কলেরা মহামারীর হাত থেকেও বাঁচিয়েছিল। বলা হয়, ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্য যেকোনো কর্মকর্তার চেয়ে তিনি একাই বেশি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। তাই এই গল্পটা কোনো সাধারণ প্রেমের গল্প নয়, এ হলো এক শহরের প্রতি এক ইঞ্জিনিয়ারের ভালোবাসার গল্প। যে ভালোবাসা দুর্গন্ধের বিরুদ্ধে লড়াই করে লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচিয়েছিল আর লন্ডনকে দিয়েছিল এক নতুন, স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যৎ।