ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৯৪৫ সালের ক্রিসমাসের রাত। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফায়েটভিল শহরের বাইরে সডার পরিবারে চলছিল উৎসবের আমেজ। জর্জ সডার, তার স্ত্রী জেনি ও তাদের দশ সন্তানের মধ্যে নয়জনই বাড়িতে উপস্থিত। বড় ছেলে জোসেফ তখন সেনাবাহিনীতে কর্মরত। গভীর রাতে বাড়ির টেলিফোনটা বেজে ওঠে। জেনি ফোন ধরতেই এক অপরিচিত মহিলা এমন একজনের খোঁজ করে, যাকে তিনি চিনতেন না। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে হাসির শব্দ। বিষয়টিকে ভুল নম্বর ভেবে জেনি ফোন রেখে দেন। কিন্তু ঘুমোতে যাওয়ার আগে তার চোখে কিছু অদ্ভুত জিনিস ধরা পড়ে। তিনি দেখেন, নিচের তলার আলোগুলো জ্বালানো, জানালার পর্দা সরানো এবং সদর দরজাটাও খোলা। তিনি সবকিছু ঠিকঠাক করে যখন শুতে যান, তখন ছাদের উপর একটি ভারী বস্তু পড়ার ও গড়িয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান।
কিছুক্ষণ পরেই, রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ, জেনি ধোঁয়ার গন্ধে জেগে ওঠেন এবং দেখেন বাড়িটি আগুনে ছেয়ে গেছে। জর্জ, জেনি এবং তাদের চার সন্তান কোনোরকমে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও, বাকি পাঁচ সন্তান—মরিস (১৪), মার্থা (১২), লুইস (৯), জেনি (৮) এবং বেটি (৫)—বাড়ির উপরের তলায় আটকে পড়ে। শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর রাতের বিভীষিকা, যা জন্ম দেবে আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম অমীমাংসিত রহস্যের।
রহস্যের জাল
জর্জ তার সন্তানদের বাঁচানোর জন্য পাগলের মতো চেষ্টা শুরু করেন। তিনি সিঁড়ি বেয়ে উপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ততক্ষণে সিঁড়িতে আগুন ধরে গেছে। তিনি বাড়ির বাইরে রাখা মইটি আনতে যান, কিন্তু সেটি তার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে উধাও। এরপর তিনি তার দুটো ট্রাক বাড়ির পাশে এনে তার উপর উঠে জানালা পর্যন্ত পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো ট্রাকই চালু হয় না, যদিও আগের দিনও সেগুলো ঠিকঠাক চলছিল। ফোন লাইনও কেটে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে দমকল বাহিনীকে খবর দেওয়া সম্ভব হয়নি। এক প্রতিবেশী দৌড়ে গিয়ে খবর দিলে, দমকল বাহিনী যখন পৌঁছায়, তখন সকাল ৮টা বেজে গেছে। ততক্ষণে সডারদের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আগুনের ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের কোনো দেহাংশই খুঁজে পাওয়া যায়নি। দমকল প্রধানের মতে, আগুন এতটাই তীব্র ছিল যে তাদের শরীর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। কিন্তু জেনি এই তত্ত্ব মানতে পারেননি। তিনি একটি শ্মশানের কর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন যে, ২০০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপে দুই ঘণ্টা পোড়ানোর পরেও মানুষের হাড় অবশিষ্ট থাকে। তাদের বাড়ি মাত্র ৪৫ মিনিটে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকেই সডার দম্পতির মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, তাদের সন্তানরা আগুনে মারা যায়নি, বরং তাদের অপহরণ করা হয়েছে এবং আগুন লাগানো হয়েছিল সেই অপরাধ ঢাকার জন্য।
তাদের এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় যখন বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনা সামনে আসতে থাকে। একজন বাস ড্রাইভার জানান, তিনি আগুনের রাতে সডারদের বাড়ির দিকে "আগুনের গোলা" ছুঁড়তে দেখেছিলেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, আগুন লাগার সময় তিনি শিশুদের একটি চলন্ত গাড়ি থেকে বাইরে তাকাতে দেখেছিলেন। এমনকি ফায়েটভিল থেকে প্রায় ৫০ মাইল দূরের এক হোটেলের একজন কর্মী জানান, তিনি নিখোঁজ পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনকে ঘটনার এক সপ্তাহ পরে দেখেছিলেন।
তদন্তে জানা যায়, ঘটনার কয়েক মাস আগে একজন অপরিচিত ব্যক্তি জর্জকে কাজ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে এবং বাড়ির ফিউজ বক্স দেখিয়ে বলে, "এটা একদিন আগুনের কারণ হবে।" আর এক ইন্স্যুরেন্স বিক্রেতা জর্জকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, মুসোলিনির বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য তার বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে এবং তার সন্তানরা ধ্বংস হয়ে যাবে। আশ্চর্যের বিষয়, এই ইন্স্যুরেন্স বিক্রেতাই পরে সেই জুরির সদস্য ছিল, যারা আগুনকে দুর্ঘটনা বলে রায় দেয়।
সত্যের উন্মোচন
সডার দম্পতি তাদের বাকি জীবনটা নিখোঁজ সন্তানদের সন্ধানে কাটিয়ে দেন। তারা নিজেদের সব সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগ করেন এবং স্টেট রুট ১৬-এর পাশে একটি বিশাল বিলবোর্ড স্থাপন করেন, যেখানে শিশুদের ছবি ও তথ্যের জন্য মোটা অংকের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এই বিলবোর্ডটি প্রায় ৪০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, যা এই রহস্যের এক নীরব সাক্ষী হয়ে ওঠে।
১৯৬৮ সালে, ঘটনার প্রায় ২৩ বছর পর, জেনি একটি বেনামি চিঠি পান। চিঠির ভেতরে ছিল ২৫-২৬ বছর বয়সী এক যুবকের ছবি, যার সাথে তাদের ছেলে লুইসের চেহারার অদ্ভুত মিল ছিল। ছবির পেছনে লেখা ছিল: "লুইস সডার। আমি ভাই ফ্র্যাঙ্কিকে ভালোবাসি।" সডাররা এই সূত্র ধরে আবার গোয়েন্দা নিয়োগ করেন, কিন্তু সেই গোয়েন্দাও রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়।
জর্জ ১৯৬৯ সালে এবং জেনি ১৯৮৯ সালে তাদের সন্তানদের শেষ দেখা না পেয়েই মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জেনি শোকের চিহ্ন হিসেবে কালো পোশাক পরতেন। তাদের জীবিত সন্তানেরা এবং নাতি-নাতনিরা আজও এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের ধারণা, ইতালীয় মাফিয়া জর্জের মুসোলিনি-বিরোধী মন্তব্যের প্রতিশোধ নিতে এই অপহরণ কাণ্ড ঘটিয়েছিল। তবে কোনো অকাট্য প্রমাণ না থাকায়, সডার সন্তানদের অন্তর্ধানের রহস্য আজও আমেরিকার অন্যতম শীতলতম অমীমাংসিত ঘটনা হয়ে রয়ে গেছে। সেই ক্রিসমাসের রাতে কি সত্যিই পাঁচটি শিশু আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল, নাকি তারা এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাকি জীবনটা অন্য কোথাও কাটিয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)