ঘটনার প্রেক্ষাপট
সালটা ১৯৪০-এর দশক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত তখনও শুকোয়নি। পৃথিবী জুড়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ঠিক এমনই এক সময়ে, ১৯৪৭ বা ১৯৪৮ সালের কোনো এক দিন, মালাক্কা প্রণালীর ব্যস্ত জলপথে ভেসে বেড়ানো কয়েকটি জাহাজ এক রহস্যময় মোর্স কোড বার্তা পায়। বার্তাটি আসছিল এস.এস. ঔরং মেডান (S.S. Ourang Medan) নামের একটি ডাচ মালবাহী জাহাজ থেকে। যিনি বার্তাটি পাঠাচ্ছিলেন, তার হাতের কম্পন যেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ভাঙা ভাঙা সঙ্কেতের অর্থ উদ্ধার করে চমকে ওঠেন অন্য জাহাজের রেডিও অপারেটররা। বার্তাটি ছিল হিমশীতল এবং অবিশ্বাস্য: "জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ সব অফিসার মারা গেছেন। চার্টরুম এবং ব্রিজে তাদের দেহ পড়ে আছে। সম্ভবত পুরো জাহাজের সবাই মৃত..."। এরপর কিছু দুর্বোধ্য কোড এবং সবশেষে দুটি শব্দ, যা ইতিহাসের অন্যতম সেরা রহস্যের জন্ম দেয়— "আমিও মৃত"। এরপরই নেমে আসে কবরের নিস্তব্ধতা।
রহস্যের জাল
এই অদ্ভুত বার্তা পাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কাছে ছিল 'সিলভার স্টার' (Silver Star) নামের একটি আমেরিকান বাণিজ্যিক জাহাজ। ঔরং মেডানের শেষ অবস্থান লক্ষ্য করে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায় সিলভার স্টার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা ঔরং মেডানকে দেখতে পায়। কিন্তু জাহাজটি ছিল অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। চিমনি দিয়ে কোনো ধোঁয়া বেরোচ্ছিল না, ইঞ্জিনের কোনো শব্দ নেই, ডেকে কোনো মানুষের সাড়া নেই। বারবার হর্ন বাজিয়ে এবং ডেকে আনার পরেও কোনো উত্তর না পেয়ে সিলভার স্টারের ক্যাপ্টেন একটি উদ্ধারকারী দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ঔরং মেডানের ডেকে পা রাখা মাত্রই উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা এক নারকীয় দৃশ্যের সাক্ষী হন। জাহাজ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে নাবিকদের লাশ। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল তাদের মৃত্যুর ধরণ। কারও শরীরেই কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, নেই কোনো রক্তপাতের ছাপ। অথচ প্রত্যেকের মুখ ভয়ে বিকৃত, চোখগুলো আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, আর মুখগুলো খোলা, যেন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তারা অকল্পনীয় কিছু দেখে চিৎকার করতে চেয়েছিল। তাদের দাঁতগুলো বেরিয়ে ছিল এবং মুখগুলো সূর্যের দিকে ফেরানো ছিল। এমনকি জাহাজের পোষা কুকুরটির দেহও পাওয়া যায়; তার মুখে ছিল হিংস্র গর্জন করার ভঙ্গি। রেডিও অপারেটরের নিথর দেহটি পড়েছিল তার যন্ত্রের ওপর, আঙ্গুলগুলো তখনও মোর্স কোডের কীতে রাখা। উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা জানান, সেদিন বাইরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি থাকলেও জাহাজের ভেতরে এক অস্বাভাবিক হিমশীতল স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।
সত্যের উন্মোচন
এই ভৌতিক পরিস্থিতি দেখে সিলভার স্টারের ক্যাপ্টেন সিদ্ধান্ত নেন, জাহাজটিকে টেনে কাছের কোনো বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। ঔরং মেডানকে দড়ি দিয়ে সিলভার স্টারের সাথে বাঁধার কাজ শুরু হয়। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে আরেক বিপর্যয়। হঠাৎ করেই ঔরং মেডানের চার নম্বর কার্গো হোল্ড থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করে। উদ্ধারকারী দল কোনোমতে নিজেদের জাহাজে ফিরে আসার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ঔরং মেডান। বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, জাহাজটি মুহূর্তের জন্য জলের ওপর উঠে এসে তারপর দ্রুত সমুদ্রের অতল গভীরে তলিয়ে যায়। ঔরং মেডান তার সব রহস্য নিয়েই চিরতরে হারিয়ে গেল।
আজ পর্যন্ত এই ঘটনার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা মেলেনি। সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হলো, জাহাজটি অবৈধভাবে পটাশিয়াম সায়ানাইড এবং নাইট্রোগ্লিসারিনের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক বহন করছিল। কোনোভাবে সমুদ্রের জল জাহাজের ভেতরে ঢুকে সেই রাসায়নিকের সাথে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে, যা নাবিকদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং পরে নাইট্রোগ্লিসারিনের কারণে বিস্ফোরণ ঘটে। অন্য তত্ত্ব অনুযায়ী, কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস বা কোনো স্নায়ু উত্তেজক গ্যাস এই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে কোনো তত্ত্বই নাবিকদের মুখের সেই ভয়ঙ্কর আতঙ্কের ছাপের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, বহু খোঁজাখুঁজির পরেও 'ঔরং মেডান' নামের কোনো জাহাজের নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিক কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তাহলে কি জাহাজটির কোনো অস্তিত্বই ছিল না? নাকি এটি কোনো গোপন সরকারি অভিযানের অংশ ছিল যা চিরতরে মুছে ফেলা হয়েছে? উত্তরটা হয়তো সমুদ্রের তলাতেই ঔরং মেডানের ভাঙা অংশের সাথে চিরকালের জন্য কবর হয়ে আছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)