ঘটনার প্রেক্ষাপট
সাল ১৯০৮। প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, এসএস ওয়ারাতা (SS Waratah), প্রথমবার সমুদ্রের জলে গা ভাসালো। ব্লু অ্যাঙ্কর লাইনের এই নতুন ফ্ল্যাগশিপ জাহাজটি ছিল বিলাসিতা এবং নিরাপত্তার এক দারুণ মেলবন্ধন। ৪৬৫ ফুট লম্বা এই জাহাজটিতে ১০০টি প্রথম শ্রেণীর কেবিন, জমকালো সেলুন এবং যাত্রীদের জন্য ছিল আধুনিক সব সুবিধা। এর নকশা করা হয়েছিল ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য। সবাই ভেবেছিল, এই জাহাজ ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখবে। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, সেই লেখা হবে এক অমীমাংসিত রহস্যের কালিতে।
১৯০৯ সালের ২৭শে এপ্রিল, ওয়ারাতা তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় লন্ডন থেকে অস্ট্রেলিয়ার দিকে রওনা দেয়। জাহাজে ছিল ২১১ জন যাত্রী ও ক্রু। যাত্রাটি বেশ ভালোভাবেই চলছিল এবং জাহাজটি অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে এসে পৌঁছায়। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। আবহাওয়া মনোরম, যাত্রীরা উৎফুল্ল, এবং ক্যাপ্টেন যোশুয়া ইলবেরি তার জাহাজ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশের আড়ালেই অপেক্ষা করছিল এক ভয়ঙ্কর, অকল্পনীয় বিপর্যয়। ২৬শে জুলাই, ১৯০৯, সন্ধ্যাবেলা ওয়ারাতা ডারবান বন্দর ছেড়ে কেপ টাউনের দিকে যাত্রা শুরু করে। আর সেটাই ছিল তার শেষ যাত্রা। এরপর সেই জাহাজ বা তার কোনো যাত্রীকে আর কখনও দেখা যায়নি।
রহস্যের জাল
ওয়ারাতার অন্তর্ধানের কাহিনি কোনো সাধারণ জাহাজডুবির ঘটনা নয়। এটি এমন এক রহস্য, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব ঘটনা আর অমীমাংসিত প্রশ্ন। জাহাজের এক যাত্রী, ক্লড সয়ার নামে একজন ইঞ্জিনিয়ার, ডারবানে পৌঁছেই জাহাজ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। তার কারণ ছিল এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। সয়ার বারবার স্বপ্নে দেখছিলেন, সমুদ্রের মধ্য থেকে রক্তমাখা তলোয়ার হাতে এক অদ্ভুত পোশাকের নাইট উঠে এসে জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। তার এই অদ্ভুত স্বপ্ন এবং জাহাজের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের কথা তিনি অন্যান্য যাত্রী এমনকি জাহাজের কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছিলেন, কিন্তু কেউ তার কথায় কান দেয়নি। শেষ পর্যন্ত, তিনি ডারবানে নেমে যান এবং তার স্ত্রীকে একটি তারবার্তা পাঠান: "ভাবলাম ওয়ারাতা টলমলে, ডারবানে নেমে গেলাম।" এই সিদ্ধান্তই তার জীবন বাঁচিয়েছিল।
২৭শে জুলাই ভোরে ‘ক্ল্যান ম্যাকইনটায়ার’ নামে অন্য একটি জাহাজ ওয়ারাতাকে শেষবারের মতো দেখতে পায়। দুটি জাহাজ নিজেদের মধ্যে সংকেত বিনিময় করে। তখন আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল হতে শুরু করেছিল, কিন্তু ওয়ারাতাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে বেশ দ্রুতগতিতে এবং সাবলীলভাবেই এগিয়ে চলেছে। এরপরই যেন অতলান্তিকের বিশালতার মধ্যে জাহাজটি মিলিয়ে গেল। কেপ টাউনে পৌঁছানোর নির্ধারিত তারিখ, ২৯শে জুলাই, পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন ওয়ারাতার কোনো খবর এলো না, তখন উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল হয়তো জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে এবং সেটি সমুদ্রে ভাসছে। কিন্তু দিন গড়ানোর সাথে সাথে যখন কোনো চিহ্নই মিলল না, তখন ইতিহাসের অন্যতম বড় সামুদ্রিক অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়। ব্রিটিশ নৌবাহিনী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জাহাজ, সবাই মিলে প্রায় ১৪,০০০ নটিক্যাল মাইল জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালায়, কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য। একটি লাইফবোট, এক টুকরো ভাঙা কাঠ বা একজন যাত্রীর দেহ— কিছুই পাওয়া যায়নি। যেন ২১১ জন মানুষসহ পুরো জাহাজটিই বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল।
সত্যের উন্মোচন
এসএস ওয়ারাতার ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায়, ১৯১০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত তদন্ত কমিটি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে সময়ের সাথে সাথে একাধিক তত্ত্ব উঠে এসেছে।
১. ভয়ঙ্কর ঢেউ (Rogue Wave): সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, জাহাজটি একটি বিশাল ও বিধ্বংসী ঢেউয়ের কবলে পড়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার ওই উপকূল অঞ্চল ভয়ঙ্কর ঢেউ বা ‘রোগ ওয়েভ’-এর জন্য কুখ্যাত। একটি ১০০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের পক্ষে ওয়ারাতার মতো একটি জাহাজকে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে দিয়ে সমুদ্রের গভীরে টেনে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়।
২. নকশায় ত্রুটি ও কার্গো স্থানান্তর: ক্লড সয়ারের মতো কিছু যাত্রী এবং ক্রু মনে করতেন জাহাজটি অত্যন্ত টলমলে বা ‘টপ-হেভি’ ছিল। জাহাজে প্রায় ১,০০০ টন সিসার আকরিক ছিল। ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে সেই ভারী কার্গো যদি একদিকে সরে যেত, তবে জাহাজটি ভারসাম্য হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে যেতে পারত।
৩. বিস্ফোরণ: ‘হারলো’ নামে একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন দাবি করেছিলেন, তিনি ওয়ারাতার দিক থেকে দুটি উজ্জ্বল আলোর ঝলকানি ও প্রচুর ধোঁয়া দেখতে পেয়েছিলেন, যা কোনো বড় বিস্ফোরণের ইঙ্গিত দেয়। হয়তো জাহাজের বয়লার বা কয়লার বাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছিল।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় কেটে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, সোনার স্ক্যান, এবং বহু অভিযাত্রীর দশকের পর দশক ধরে চেষ্টার পরেও এসএস ওয়ারাতার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটি আজও সমুদ্রের গভীরতম রহস্যগুলোর একটি হয়ে রয়ে গেছে। ২১১টি আত্মার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল, সেই উত্তর আজও ভারত মহাসাগরের অতল গভীরে চাপা পড়ে আছে। অস্ট্রেলিয়ার টাইটানিক নামে পরিচিত এই জাহাজটি শুধু একটি জলযান নয়, এটি এক শিহরণ জাগানো ভূতুড়ে কাহিনির নাম, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষের মনে বিস্ময় ও ভয় জাগিয়ে তুলবে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)