ঘটনার প্রেক্ষাপট

বিশ শতকের শুরুর দিক। প্রযুক্তি আর প্রকৌশলের স্বর্ণযুগ। মানুষ তখন সমুদ্রের বুকে gigantesque সব জাহাজ ভাসিয়ে প্রকৃতির শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ঠিক এমনই এক সময়ে, ১৯০৮ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে তৈরি হয়েছিল এক নতুন বিস্ময়—এসএস ওয়ারাতা (SS Waratah)। ব্লু অ্যাঙ্কর লাইনের এই জাহাজটি ছিল আভিজাত্য, নিরাপত্তা আর প্রযুক্তির এক নিখুঁত মিশ্রণ। ৫০০ ফুট লম্বা এই জাহাজটিতে ছিল ১০০টি প্রথম শ্রেণীর কেবিন, বেতার টেলিগ্রাফের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিলাসবহুল সব ব্যবস্থা। একে অস্ট্রেলিয়ার পথে চলাচলকারী সবচেয়ে নিরাপদ এবং আরামদায়ক জাহাজ হিসেবে গণ্য করা হতো। অনেকেই একে ভালোবেসে ডাকত ‘অস্ট্রেলিয়ার টাইটানিক’ বলে, যদিও তখনো আসল টাইটানিকের ট্র্যাজেডি ঘটেনি।

জাহাজটির ক্যাপ্টেন ছিলেন জোশুয়া ইলবেরি, একজন অভিজ্ঞ এবং সম্মানিত নাবিক। ১৯০৯ সালের জুলাই মাসে, ওয়ারাতা তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় ছিল। অস্ট্রেলিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে পৌঁছায়। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। আবহাওয়া মনোরম, যাত্রীরা উৎফুল্ল। ডারবানে কিছু যাত্রী নেমে যায় এবং নতুন কিছু যাত্রী ওঠে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ক্লদ সয়্যার নামের এক ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ডারবানে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তিনি এক অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, ওয়ারাতা এক বিশাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ডুবে যাচ্ছে। তার এই স্বপ্নকে অনেকেই তখন ভ্রূকুটি করেছিল, কিন্তু ইতিহাস মনে রেখেছে তার সেই অশুভ সতর্কবার্তাকে। ২৬শে জুলাই, ১৯০৯, ২১১ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে এসএস ওয়ারাতা ডারবান বন্দর থেকে কেপটাউনের দিকে রওনা হয়। এটিই ছিল তার শেষ যাত্রা। যে যাত্রার শেষ কোনোদিন হয়নি।

রহস্যের জাল

ওয়ারাতার যাত্রাপথ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত ‘ওয়াইল্ড কোস্ট’ বরাবর, যা ভয়ংকর ঝড় আর উত্তাল সমুদ্রের জন্য পরিচিত। যাত্রার পরের দিন, ২৭শে জুলাই সকালে, ক্ল্যান ম্যাকইনটায়ার (Clan MacIntyre) নামের আরেকটি জাহাজ ওয়ারাতাকে দেখতে পায়। দুটি জাহাজের মধ্যে কিছুক্ষণ সংকেত বিনিময়ও হয়। ক্ল্যান ম্যাকইনটায়ারের ক্যাপ্টেন লক্ষ্য করেন, ওয়ারাতা বেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তার পেছন থেকে ঘন কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে। সকাল সাড়ে নটার দিকে ওয়ারাতা দিগন্তে মিলিয়ে যায়। এটাই ছিল সভ্য জগতের চোখে এসএস ওয়ারাতার শেষ দর্শন।

এরপর থেকেই শুরু হয় রহস্যের এক গভীর জাল। ওয়ারাতার কেপটাউনে পৌঁছানোর কথা ছিল ২৯শে জুলাই। কিন্তু জাহাজটি আসেনি। প্রথমদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল, হয়তো কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাহাজটির দেরি হচ্ছে। কিন্তু ঘণ্টা পেরিয়ে দিন গড়িয়ে গেল, ওয়ারাতার কোনো খবর নেই। তার শক্তিশালী বেতার থেকেও কোনো বিপদ সংকেত আসেনি। চারদিকে এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

ব্লু অ্যাঙ্কর লাইন এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনী ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূল বরাবর হাজার হাজার মাইল জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়। আকাশ থেকে বেলুন উড়িয়ে, সমুদ্রের বুকে জাহাজ নামিয়ে তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়। কিন্তু ফলাফল ছিল হতাশাজনক। একটি লাইফবোট, এক টুকরো কাঠের অংশ, কিংবা কোনো যাত্রীর দেহাবশেষ—কিছুই পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছিল, যেন প্রায় ১০,০০০ টনের একটি আস্ত জাহাজ তার ২১১ জন আরোহীসহ বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন তত্ত্ব আর অদ্ভুত সব দাবি সামনে আসতে থাকে। কেউ কেউ দাবি করে, তারা নাকি সমুদ্রের বুকে ভাসমান যাত্রীদের দেখেছে। একজন পাইলট দাবি করেন, তিনি সমুদ্রের নিচে একটি জাহাজের আবছা অবয়ব দেখেছেন। কিন্তু কোনো দাবিরই সত্যতা মেলেনি। প্রতিটি অভিযানই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ওয়ারাতা এবং তার যাত্রীদের ভাগ্য এক দুর্ভেদ্য রহস্যের চাদরে ঢেকে যায়, যা আজও উন্মোচিত হয়নি।

সত্যের উন্মোচন

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও এসএস ওয়ারাতার অন্তর্ধান নিয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি। তবে বেশ কিছু জোরালো তত্ত্ব প্রচলিত আছে।

১. ভয়ংকর ঢেউ (Freak Wave): দক্ষিণ আফ্রিকার এই উপকূল ভয়ংকর উঁচু এবং আকস্মিক ঢেউয়ের জন্য পরিচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হয়তো ৩০ মিটার বা তারও বেশি উঁচু কোনো দৈত্যাকার ঢেউয়ের সামনে পড়েছিল ওয়ারাতা। এমন একটি ঢেউয়ের আঘাতে জাহাজটি হয়তো মুহূর্তের মধ্যে উল্টে গিয়ে যাত্রী বা ক্রুদের কোনো সুযোগ না দিয়েই অতলে তলিয়ে যায়। এটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।

২. কার্গো শিফট (Cargo Shift): ওয়ারাতার কার্গোতে প্রায় ১,০০০ টন সীসা এবং ৩০০ টন আকরিক ছিল। সমুদ্রের প্রচণ্ড ঝাপটায় এই ভারী কার্গো যদি একপাশে সরে গিয়ে থাকে, তবে জাহাজটি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতে পারে এবং দ্রুত ডুবে যেতে পারে।

৩. বয়লার বিস্ফোরণ: আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী, জাহাজের বয়লারে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলে জাহাজের কাঠামো ছিঁড়ে যায় এবং সেটি সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। ক্ল্যান ম্যাকইনটায়ারের ক্যাপ্টেনের দেখা সেই ঘন কালো ধোঁয়া এই তত্ত্বকে কিছুটা সমর্থন করে।

৪. সমুদ্রের ঘূর্ণাবর্ত: কিছু কম নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব অনুযায়ী, জাহাজটি হয়তো কোনো বিশাল সমুদ্র ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল, যা তাকে আস্ত গিলে ফেলেছে।

বছরের পর বছর ধরে অনেক অভিযাত্রী ওয়ারাতার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯৯ সালে এমন একটি দাবি করা হয়েছিল যে ওয়ারাতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, কিন্তু পরে দেখা যায় সেটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ।

আজও এসএস ওয়ারাতা ভারত মহাসাগরের গভীর অন্ধকারে এক ভূতুড়ে জাহাজ হয়েই রয়ে গেছে। তার সাথে হারিয়ে গেছে ২১১টি তাজা প্রাণ আর তাদের না বলা গল্প। প্রযুক্তি আর অহংকারের যুগে প্রকৃতির এক নির্মম পরিহাসের সাক্ষী হয়ে ওয়ারাতার রহস্য আজও মানুষকে ভাবায়—সমুদ্রের কাছে মানুষ কতটা অসহায়। তার কোনো চিহ্ন নেই, কোনো প্রমাণ নেই, আছে শুধু একরাশ প্রশ্ন আর এক শীতল, অমীমাংসিত রহস্য।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)