ঘটনার প্রেক্ষাপট

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ। আটলান্টিকের ওপারে এক নতুন পৃথিবীর হাতছানিতে সাড়া দিয়ে ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো তখন মরিয়া। স্প্যানিশদের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথের সবুজ সংকেত পেয়ে অভিযাত্রী স্যার ওয়াল্টার র‍্যালে এক দুঃসাহসিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেন। তার লক্ষ্য—আমেরিকার বুকে প্রথম ইংরেজ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা। বেশ কয়েকটি অভিযানের পর ১৫৮৭ সালে জন হোয়াইটের নেতৃত্বে ১১৭ জন নারী, পুরুষ ও শিশুর একটি দল আমেরিকার পূর্ব উপকূলে আজকের নর্থ ক্যারোলিনার র‌্যানোক দ্বীপে পৌঁছায়। এদের মধ্যে ছিলেন হোয়াইটের গর্ভবতী কন্যা এলিয়ানোর ডেয়ার এবং তার স্বামী। এই দ্বীপে জন্ম নেয় ভার্জিনিয়া ডেয়ার, আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রথম ইংরেজ শিশু। চারদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, খাদ্যাভাব এবং স্থানীয় আদিবাসীদের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে উপনিবেশটি টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গভর্নর জন হোয়াইট ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে আরও রসদ ও সাহায্য নিয়ে দ্রুত ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই বিদায়ই হতে চলেছে শেষ দেখা। তার ফেলে যাওয়া ১১৭ জন মানুষের জন্য নিয়তি এক ভয়ংকর চিত্রনাট্য রচনা করে রেখেছিল।

রহস্যের জাল

ইংল্যান্ডে ফিরে হোয়াইট এক অপ্রত্যাশিত বাধার সম্মুখীন হন। স্পেনের সঙ্গে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ শুরু হওয়ায় রানী এলিজাবেথ দেশের সব জাহাজ স্প্যানিশ আর্মাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য জব্দ করার নির্দেশ দেন। ফলে হোয়াইটের আমেরিকায় ফেরা আটকে যায়। একটি সামান্য কয়েক মাসের অভিযান পরিণত হয় তিন বছরের দীর্ঘ অপেক্ষায়। অবশেষে ১৫৯০ সালের আগস্ট মাসে, তার নাতনি ভার্জিনিয়ার তৃতীয় জন্মদিনে, হোয়াইট যখন র‌্যানোক দ্বীপে ফিরে আসেন, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক জমাট বাঁধা নীরবতা। পুরো উপনিবেশটি পরিত্যক্ত। ১১৭ জন মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। ঘরবাড়িগুলো নিখুঁতভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই সবকিছু গুটিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে। কোনো লড়াই বা আক্রমণের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু দুটো অদ্ভুত সূত্র দ্বীপের নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছিল। বসতির সীমানায় একটি কাঠের খুঁটিতে খোদাই করা ছিল একটি শব্দ—'CROATOAN'। কিছুটা দূরে একটি গাছে খোদাই করা ছিল আরও তিনটি অক্ষর—'CRO'। হোয়াইটের সাথে উপনিবেশবাসীদের কথা ছিল, যদি তারা বিপদে পড়ে বা জোর করে তাদের সরানো হয়, তবে তারা একটি মাল্টিজ ক্রস চিহ্ন এঁকে রাখবে। কিন্তু তেমন কোনো চিহ্ন সেখানে ছিল না। ‘ক্রোয়াটোয়ান’ ছিল পাশের একটি দ্বীপের নাম এবং সেখানে বসবাসকারী বন্ধুত্বপূর্ণ আদিবাসী গোষ্ঠীর নাম। হোয়াইট ধরেই নিয়েছিলেন, তার লোকেরা হয়তো সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ভয়ংকর এক সামুদ্রিক ঝড় এবং সঙ্গীদের অনিচ্ছার কারণে তিনি আর ক্রোয়াটোয়ান দ্বীপে তল্লাশি চালাতে পারেননি। ভগ্ন হৃদয়ে তাকে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে হয়। এরপর আর কখনোই তিনি তার পরিবার বা র‌্যানোকের সেই ১১৭ জন মানুষের কোনো খোঁজ পাননি। তারা যেন सचमुच বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল।

সত্যের উন্মোচন

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে র‌্যানোকের হারিয়ে যাওয়া উপনিবেশকে নিয়ে নানা তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্বটি হলো, উপনিবেশবাসীরা ক্রোয়াটোয়ান আদিবাসীদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এই তত্ত্বকে সমর্থন করে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও মিলেছে। ক্রোয়াটোয়ান বা আজকের হ্যাটেরাস দ্বীপে ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় জিনিসপত্র, যেমন—বন্দুকের অংশ, লেখার স্লেট এবং ধাতু গলানোর সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইংরেজরা হয়তো সেখানেই বসতি স্থাপন করেছিল। জনশ্রুতি আছে, পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে ধূসর বা নীল চোখের মানুষ দেখা যেত, যারা তাদের পূর্বপুরুষদের বই পড়ার ক্ষমতার কথা বলত।

অন্যান্য তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে স্প্যানিশদের আক্রমণ, যদিও এর কোনো শক্ত প্রমাণ মেলেনি। কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো উপনিবেশবাসীরা ইংল্যান্ডে ফেরার চেষ্টা করে সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিল। মারাত্মক খরা এবং তার ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও রোগব্যাধিও তাদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে বলে অনেক গবেষক মনে করেন। একটি চমকপ্রদ তত্ত্ব অনুযায়ী, উপনিবেশবাসীরা হয়তো দুটি দলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল—একটি দল ক্রোয়াটোয়ান দ্বীপে যায় এবং অন্য দলটি আরও উত্তরে চেসাপিক উপসাগরের দিকে যাত্রা করে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত স্থানীয় আদিবাসীদের আক্রমণে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আজও কোনো একটি তত্ত্বও এই রহস্যের সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারেনি। র‌্যানোকের সেই ১১৭ জন মানুষের পরিণতি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটি হয়ে রয়ে গেছে। তাদের গল্প যেন এক নীরব হাহাকার, যা আজও আটলান্টিকের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)