ঘটনার প্রেক্ষাপট

আজকের কোলাহলপূর্ণ বর্ধমান শহর থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে, ১৬৯৬ সাল। দিল্লির মসনদে তখন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব। বাংলায় তখন বর্ধমানের সিংহাসনে রাজা কৃষ্ণরাম রায়। শহর জুড়ে তখন এক চাপা আতঙ্ক, ফিসফিস করে ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে কেউ। বিষ্ণুপুরের রাজা গোপাল সিংহ, বরদার জমিদার শোভা সিংহ এবং চন্দ্রকোনার জমিদার রঘুনাথ সিংহ একত্রিত হয়ে রাজা কৃষ্ণরামের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তাদের সাথে যোগ দেয় ওড়িশার আফগান সর্দার রহিম খাঁ। উদ্দেশ্য একটাই—বর্ধমান দখল।

চারিদিকে যখন আপাত শান্তি, তখনই এক অতর্কিত আক্রমণে কেঁপে ওঠে বর্ধমান। রাজা কৃষ্ণরাম রায় বীরের মতো যুদ্ধ করেও পরাজিত ও নিহত হন। বিদ্রোহীদের উল্লাসে ফেটে পড়ে রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ, কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য তখনও বাকি। রাজার মৃত্যুর পর, শোভা সিংহের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে রাজবাড়ির অন্দরমহলে, যেখানে অসহায় নারীরা বন্দি।

রহস্যের জাল

রাজা কৃষ্ণরামের পুত্র জগৎরাম রায় কোনোক্রমে বিদ্রোহীদের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচেন। কিন্তু রাজবাড়ির নারীরা শোভা সিংহের হাতে বন্দি হন। শোভা সিংহের পাশবিক অত্যাচারের ভয়ে কাঁপতে থাকা নারীরা যখন মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পেলেন না, তখন তারা এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিলেন। সম্মানরক্ষার জন্য তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এক শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথি। রাত তখন গভীর, চারিদিকে বিদ্রোহীদের পৈশাচিক উল্লাস। রাজবাড়ির অন্দরমহলে তখন চলছে এক নীরব প্রস্তুতি। কুন্দদেবী, ফোতাদেবী, লক্ষ্মীদেবীসহ প্রায় ১৬ জন নারী তাদের সম্মান রক্ষার জন্য বিষপান করে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। এই নারীদের আত্মত্যাগকে ‘জহুরী’ নামে ডাকা হয়। এই নারকীয় রাতের সাক্ষী হয়ে রইল বর্ধমান রাজবাড়ির দেয়াল।

তবে এখানেই শেষ নয়। রাজা কৃষ্ণরামের কন্যা, সত্যবতী, কোনোভাবে সেই রাতে জহরব্রত পালন করতে পারেননি। তিনি শোভা সিংহের হাতে বন্দি হন। কিন্তু তার চোখে ছিল প্রতিশোধের আগুন। যখন শোভা সিংহ তার সম্মানহানির চেষ্টা করে, তখন সত্যবতী তার বস্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ছুরি দিয়ে তাকে হত্যা করেন এবং তারপর নিজের জীবনও বিসর্জন দেন। এই ঘটনা শোভা সিংহের বাহিনীর মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং তাদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

সত্যের উন্মোচন

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, এই ঘটনার পর রাজা কৃষ্ণরামের পুত্র জগৎরাম রায় মুঘলদের সাহায্য নিয়ে বর্ধমান পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু সেই রাতের বীভৎস স্মৃতি আজও বর্ধমানের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। রাজবাড়ির সেই অংশটি আজও যেন এক নীরব কান্নার সাক্ষী।

এই ঘটনাটি জহর ব্রতের এক অন্য রূপ, যেখানে নারীরা আগুনে ঝাঁপ না দিয়ে বিষপান করে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে সম্মান রক্ষার জন্য নারীরা কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারেন। বর্ধমান রাজবাড়ির এই মর্মান্তিক কাহিনী আজও এক অমীমাংসিত রহস্যের মতো, যা আমাদের মনে শিহরণ জাগায়।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)