ঘটনার প্রেক্ষাপট
সাল ১৬৬৯। ফ্রান্সের আকাশে তখন ‘সূর্য রাজা’ চতুর্দশ লুইয়ের শাসনের পূর্ণ প্রতাপ। [7] সেই সময়েই, ফ্রান্সের উত্তরে ডানকার্কের কাছে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাকে পিনেরোলো দুর্গের গভীরে নিক্ষেপ করার আদেশ দেওয়া হয়। [5] তার নাম বলা হয়েছিল ‘ইউস্তাশ দোজে’। [5] কিন্তু এই নামটি কি তার আসল পরিচয়, নাকি ইতিহাসের পাতা থেকে তার আসল নাম মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্রের শুরু? এই বন্দীর জন্য যে নির্দেশাবলী ছিল, তা ছিল ভয়ঙ্কর এবং অস্বাভাবিক। দুর্গের গভর্নর বেনিন দোভার্ন দে সেন্ট-মার্সকে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, এই বন্দীর জন্য এমন এক কুঠুরি বানাতে হবে যার একাধিক দরজা থাকবে, যাতে বাইরের কেউ তার কথা শুনতে না পায়। [5, 12] গভর্নর নিজে দিনে একবার মাত্র তার প্রয়োজনীয় খাবার পৌঁছে দেবেন। [5] আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নির্দেশটি ছিল, যদি সে তার নিজের পরিচয় বা প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনো কথা বলার চেষ্টা করে, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করতে হবে। [4] এই সেই বন্দী, যাকে ইতিহাস মনে রেখেছে ‘লৌহ মুখোশের মানুষ’ বা ‘The Man in the Iron Mask’ নামে।
রহস্যের জাল
এই রহস্যময় বন্দীর জীবন ছিল এক চলমান কারাগার। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তাকে ফ্রান্সের চারটি ভয়ঙ্কর কারাগারে ঘোরানো হয়েছিল—পিনেরোলো, এক্সিলস, সেন্ট-মার্গারেট দ্বীপ এবং অবশেষে কুখ্যাত বাস্তিল দুর্গ। [6, 13] এই পুরো সময়টা তার প্রহরী ছিলেন একজনই—সেন্ট-মার্স। [2] যখনই সেন্ট-মার্সের পদোন্নতি হতো বা তাকে অন্য দুর্গে পাঠানো হতো, এই মুখহীন বন্দীও তার সাথে ছায়ার মতো অনুসরণ করত। [8] কিন্তু কেন? একজন সাধারণ বন্দীর জন্য এত সতর্কতা কেন? লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া গুজব আর ভাসা ভাসা তথ্যের উপর ভিত্তি করে কিংবদন্তি আরও গাঢ় হতে থাকে। বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার প্রথম এই বন্দীকে নিয়ে বিস্তারিত লেখেন। [4] তিনিই প্রথম প্রচার করেন যে, বন্দীটি একটি লোহার মুখোশ পরতেন, যার নিচের অংশে স্প্রিং লাগানো ছিল যাতে তিনি খেতে পারতেন। [4] যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, মুখোশটি লোহার নয়, বরং কালো মخمলের ছিল এবং সেটি শুধু কারাগার পরিবর্তনের সময় বা জনসমক্ষে আসার আশঙ্কা থাকলেই পরানো হতো। [5, 6] কিন্তু ভলতেয়ারের রগরগে বর্ণনা মানুষের মনে গেঁথে যায়।
এই বন্দীর প্রতি সেন্ট-মার্সের আচরণ ছিল विरोधाभासी। একদিকে যেমন তাকে কঠোর বিচ্ছিন্নতায় রাখা হয়েছিল, তেমনই তার প্রতি এক ধরনের সম্মানও দেখানো হতো। শোনা যায়, তার কক্ষে ভালো আসবাবপত্র ছিল এবং তাকে decent খাবার দেওয়া হতো। [11] একবার নাকি বন্দীটি তার রুপোর থালার ওপর কিছু লিখে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছিলেন। এক নিরক্ষর জেলে সেটি কুড়িয়ে পেয়ে গভর্নরের কাছে নিয়ে আসে। গভর্নর তাকে জিজ্ঞেস করেন, "তুমি কি এটা পড়েছ?" জেলে নিরক্ষর হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়। এই ঘটনাটি বন্দীর গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ১৭০৩ সালের ১৯শে নভেম্বর বাস্তিল দুর্গে এই রহস্যময় বন্দীর মৃত্যু হয়। [5] তাকে পরের দিন ‘মার্চিওলি’ নামে কবর দেওয়া হয় এবং তার সমস্ত পোশাক, আসবাবপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়। [1] তার ঘরের দেওয়ালগুলি আঁচড়ে চুনকাম করে দেওয়া হয়, যাতে তার পরিচয়ের সামান্যতম চিহ্নও না থাকে। [1, 14] একজন মানুষের পরিচয়কে মুছে ফেলার এমন মরিয়া চেষ্টা কেন করেছিল ফরাসি রাজতন্ত্র?
সত্যের উন্মোচন
এই বন্দীর আসল পরিচয় নিয়ে বহু তত্ত্ব প্রচলিত আছে, যা এই রহস্যকে আরও জটিল করে তুলেছে।
১. রাজার যমজ ভাই: সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নাটকীয় তত্ত্বটি ভলতেয়ারের হাত ধরে আলেকজান্ডার দ্যুমার লেখনীতে অমর হয়ে আছে। [1, 12] এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বন্দীটি ছিলেন চতুর্দশ লুইয়ের যমজ ভাই। ফরাসি সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে যাতে কোনো সংঘাত না হয়, তাই তার জন্ম থেকেই তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে বড় করা হয় এবং পরে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার মুখ লুকানোর কারণ ছিল একটাই—তার চেহারা ছিল হুবহু রাজার মতো। [4]
২. রাজার অবৈধ বড় ভাই: আরেকটি তত্ত্ব বলে, বন্দীটি লুইয়ের কোনো অবৈধ সন্তান বা তার থেকেও বড়, রানী অ্যান অফ অস্ট্রিয়ার কোনো অবৈধ সন্তান ছিলেন, যা রাজার সিংহাসনের জন্য হুমকি হতে পারত।
৩. ইতালীয় কূটনীতিক কাউন্ট মাতিওলি: একসময় মনে করা হতো, বন্দীটি ছিলেন ইতালির এক কূটনীতিক, যিনি ক্যাসেল দুর্গ হস্তান্তরের বিষয়ে চতুর্দশ লুইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। [7] তার শাস্তিস্বরূপ তাকে অপহরণ করে বন্দী করা হয়। তাকে কবর দেওয়ার সময় ‘মার্চিওলি’ নামটি এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। কিন্তু ঐতিহাসিক ದಾಖಲೆ থেকে জানা যায় যে, মাতিওলি ১৬৯৪ সালেই মারা গিয়েছিলেন, যখন আমাদের রহস্যময় বন্দী তখনও জীবিত। [7]
৪. ইউস্তাশ দোজে দ্য কাভোয়ে: এই ব্যক্তিটি ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি যিনি কিছু কলঙ্কজনক ঘটনায় জড়িত ছিলেন। তার নাম মূল বন্দীর দেওয়া নামের সাথে মিলে যায়, যা অনেক ঐতিহাসিককে এই সিদ্ধান্তে আসতে সাহায্য করেছে। [4] কিন্তু রেকর্ডে দেখা যায়, কাভোয়ে অন্য একটি কারাগারে বন্দী ছিলেন এবং সেখানেই মারা যান। [4]
৫. একজন সাধারণ ভৃত্য: আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, বন্দীটি সত্যিই ইউস্তাশ দোজে নামে একজন সাধারণ ভৃত্য ছিলেন। [1, 7] তিনি হয়তো কার্ডিনাল মাজারিনের কোষাধ্যক্ষের ভৃত্য হিসেবে কাজ করতেন এবং এমন কিছু জেনে ফেলেছিলেন যা ফরাসি রাজতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল—হয়তো মাজারিনের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের খবর। [9] তার পরিচয় রাজকীয় না হলেও, তার জানা তথ্যটি ছিল রাজকীয় হুমকির সমান।
কে ছিলেন তিনি? একজন অভিশপ্ত রাজকুমার, নাকি এমন এক দুর্ভাগা সাধারণ মানুষ যিনি এমন কিছু জেনে ফেলেছিলেন যা তার জানার কথা ছিল না? ৩৪ বছর ধরে একজন মানুষের পরিচয়কে সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার এই রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। তার মুখোশের আড়ালের মুখটা যেমন কেউ দেখেনি, তেমনই ইতিহাসের পর্দা সরিয়ে তার আসল পরিচয়ও হয়তো আর কোনোদিন জানা যাবে না। বাস্তিলের অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া সেই মুখহীন মানুষটি তাই আজও ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং অমীমাংসিত রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)