ঘটনার প্রেক্ষাপট
সালটা ১৯৩০। নভেম্বরের হাড় কাঁপানো শীতের এক বিকেল। কানাডার নুনাভুট অঞ্চলের রুক্ষ, বরফঢাকা প্রান্তরের বুক চিরে এগিয়ে চলেছেন একজন পশম শিকারি, নাম জো ল্যাবেল। শত শত মাইল বিস্তৃত এই জনমানবহীন প্রান্তরে তার একমাত্র সঙ্গী পায়ের নিচের বরফের কর্কশ শব্দ আর কনকনে বাতাস। ল্যাবেল এই অঞ্চলের অভিজ্ঞ শিকারি। তার গন্তব্য অঞ্জিকুনি হ্রদের তীরে অবস্থিত ইনুইটদের ছোট্ট গ্রামটি। এর আগেও বহুবার তিনি এখানে এসেছেন, উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই তার বিশ্বাস। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে গ্রামের উষ্ণতা আর পরিচিত মুখগুলোর দেখা পাওয়ার আশায় তার পায়ে গতি আসে।
কিন্তু গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছাতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে। বাতাসে ভাসছে না শিশুদের কোলাহল, ভেসে আসছে না মেয়েদের গল্প করার শব্দ, এমনকি কোনো বাড়ি থেকেও উনুনের ধোঁয়া উঠছে না। চারদিকে শুধু বরফ আর পাথরের মতো জমে থাকা এক অশুভ নীরবতা। ল্যাবেলের মনে অজানা এক ভয় দানা বাঁধতে শুরু করে। এমন তো হওয়ার কথা নয়! শীতের এই সময়ে গ্রামের সবাই একসাথে থাকার কথা। তার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে।
রহস্যের জাল
জো ল্যাবেল যখন গ্রামে প্রবেশ করলেন, তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। গ্রামের প্রতিটি তাঁবু আর কুঁড়েঘরের দরজা খোলা। ভেতরে উঁকি দিয়ে তিনি দেখলেন, উনুনের আগুন নিভে ছাই হয়ে গেছে, কিন্তু তার ওপর বসানো পাত্রে খাবার রয়ে গেছে, যা ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে গিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, রান্নার মাঝপথেই সবাই কোথাও চলে গেছে। আরও অদ্ভুত বিষয় হলো, একটি তাঁবুর ভেতরে অসমাপ্ত পোশাকে তখনও সুচ গাঁথা রয়েছে। যেন মুহূর্তের মধ্যে সবাই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ল্যাবেলের ভয় তখন চরমে পৌঁছাল যখন তিনি দেখলেন, প্রতিটি ঘরের দরজার পাশে রাইফেলগুলো ঠিকঠাকভাবে দাঁড় করানো আছে। ইনুইটদের জন্য রাইফেল তাদের জীবনধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো পরিস্থিতিতেই তারা তাদের অস্ত্র এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে যাবে না। তাহলে কী এমন ঘটেছিল যে তারা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটিও সাথে নেওয়ার সুযোগ পায়নি?
গ্রামের এক প্রান্তে গিয়ে তিনি আরও ভয়াবহ এক দৃশ্য দেখতে পান। গ্রামের স্লেজগাড়ি টানা কুকুরগুলোকে তাদের জায়গায় বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়, কিন্তু সবগুলোই না খেতে পেয়ে মারা গেছে। অথচ আশেপাশে খাবার মজুত ছিল। মালিকেরা কেন তাদের পোষ্যদের এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে গেল? কিন্তু সবথেকে ভয়ঙ্কর আবিষ্কারটি তখনও বাকি ছিল। গ্রামের কবরস্থান। ল্যাবেল দেখলেন, গ্রামের কবরগুলো খোঁড়া হয়েছে এবং ভেতর থেকে মৃতদেহগুলো গায়েব! পাথর দিয়ে ঘেরা কবরগুলো এমনভাবে সরানো হয়েছে, যা কোনো পশুর কাজ হতে পারে না।
আতঙ্কিত ল্যাবেল দ্রুত নিকটবর্তী টেলিগ্রাফ অফিসে পৌঁছে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশকে (RCMP) খবর দেন। পুলিশ এসে তদন্ত শুরু করে, কিন্তু রহস্যের জট খোলার বদলে তা আরও ঘনীভূত হয়। গ্রামে কোনো রকম ধস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল না। বরফের উপর শুধু ল্যাবেলের পায়ের ছাপ ছাড়া আর কারো পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি যা গ্রাম থেকে বাইরের দিকে গেছে। অর্থাৎ, গ্রামের প্রায় ২৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশু যেন স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তদন্ত চলাকালীন অন্যান্য শিকারি এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে আরও কিছু অদ্ভুত খবর পাওয়া যায়। গ্রামের অদৃশ্য হওয়ার সময়টার আশেপাশে অনেকেই অঞ্জিকুনি হ্রদের আকাশে অদ্ভুত, রহস্যময় নীল আলোর ঝলকানি দেখার কথা জানায়।
সত্যের উন্মোচন
অঞ্জিকুনি হ্রদের এই রহস্যময় অন্তর্ধানের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের তদন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। বছরের পর বছর ধরে নানা তত্ত্ব উঠে এসেছে। কেউ বলেছেন, হয়তো খাদ্যাভাব বা অন্য কোনো কারণে গ্রামের সবাই অন্য কোথাও চলে গেছে। কিন্তু এই তত্ত্ব কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না - কেন তারা তাদের রাইফেল, খাবার আর উষ্ণ পোশাক ফেলে যাবে? আর কবরস্থানের মৃতদেহগুলোর কী হলো?
অন্য একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব অনুযায়ী, ভিনগ্রহের প্রাণীরা এসে পুরো গ্রামটিকে তুলে নিয়ে গেছে। আকাশে দেখা যাওয়া সেই অদ্ভুত আলো এই তত্ত্বের পালে হাওয়া দেয়। স্থানীয় ইনুইটদের লোককথায় ‘তোরনারক’ নামে এক অশুভ আত্মার কথা বলা হয়েছে, যা মানুষকে বিপদে ফেলে। অনেকেই মনে করেন, সেই অশুভ আত্মার প্রকোপেই এই ঘটনা ঘটেছে।
তবে, আধুনিক সময়ে অনেক গবেষক ও ইতিহাসবিদ পুরো ঘটনাটির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, এই গল্পটি সাংবাদিক এমমেট ই. কেহেলের তৈরি করা একটি অতিরঞ্জিত কাহিনী, যা ১৯৩০ সালের নভেম্বরে প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন লেখক, বিশেষ করে ফ্র্যাঙ্ক এডওয়ার্ডস তার বইয়ে গল্পটিকে আরও রসালো করে পরিবেশন করেন। RCMP-এর সরকারি নথিতে এমন কোনো বড় আকারের অন্তর্ধানের ঘটনার উল্লেখ নেই। তাদের মতে, জো ল্যাবেল নামের সেই শিকারি সবেমাত্র সেই বছর তার লাইসেন্স পেয়েছিলেন এবং ওই এলাকা সম্পর্কে তার বিশেষ কোনো ধারণা ছিল না। হতে পারে তিনি একটি পরিত্যক্ত মরশুমি শিবির দেখে ভুল বুঝেছিলেন।
তাহলে কি অঞ্জিকুনি হ্রদের রহস্য একটি নিছক বানানো গল্প? নাকি এক হিমশীতল সত্যি, যা সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে? সত্য যাই হোক না কেন, কানাডার বরফঢাকা প্রান্তরের এই ঘটনাটি আজও বিশ্বের অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে, যা আমাদের কল্পনাকে উসকে দেয় এবং মনে করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে যার কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)