ঘটনার প্রেক্ষাপট

দিনটা ছিল ১৯৪১ সালের ১০ই মে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা তখন গ্রাস করেছে গোটা ইউরোপ। অ্যাডলফ হিটলারের অপ্রতিরোধ্য নাৎসি বাহিনী একের পর এক দেশ দখল করে চলেছে, আর তাদের সামনে প্রায় একা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উইনস্টন চার্চিলের ব্রিটেন। জার্মানির বিমানবাহিনী প্রতিদিন লন্ডনের আকাশে হানা দিচ্ছে, বোমার আঘাতে কেঁপে উঠছে শহর। চারদিকে শুধু বারুদ, রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধ। নাৎসি জার্মানির ক্ষমতার কেন্দ্রে তখন হিটলারের পরেই যে কয়েকজন ব্যক্তির নাম আসত, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রুডলফ হেস। তিনি ছিলেন হিটলারের ডেপুটি, ‘ফিউরার’-এর একনিষ্ঠ ভক্ত এবং নাৎসি পার্টির একেবারে প্রথম দিনগুলোর সঙ্গী। হিটলারের কুখ্যাত আত্মজীবনী ‘মাইন কাম্ফ’ লেখার সময়ও তিনি ছিলেন তাঁর কারাসঙ্গী ও সহকারী। এক কথায়, হেস ছিলেন তৃতীয় রাইখের একেবারে ভেতরের মানুষ, ক্ষমতার অলিন্দে যার অবাধ বিচরণ।

কিন্তু সেই রাতে যা ঘটল, তা শুধু ব্রিটেন বা জার্মানি নয়, গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। যে মানুষটি হিটলারের ছায়াসঙ্গী, যার নাৎসি মতাদর্শের প্রতি আনুগত্য নিয়ে কারও মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না, সেই রুডলফ হেস এক অবিশ্বাস্য এবং আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব এক পদক্ষেপ নিলেন। তিনি একাই একটি মেসেসারশমিট বিএফ ১১০ যুদ্ধবিমান নিয়ে উড়ে চললেন শত্রু দেশ ব্রিটেনের দিকে। কেন? কী ছিল তার উদ্দেশ্য? হিটলারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গীদের একজন কেন নিজের জীবন বাজি রেখে এই ভয়ঙ্কর যাত্রায় নেমেছিলেন? এই প্রশ্নগুলোই জন্ম দিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম বড় এবং অমীমাংসিত রহস্যের।

রহস্যের জাল

১০ই মে, ১৯৪১ সালের সন্ধ্যা। জার্মানির অগসবার্গ শহরের এক বিমান ঘাঁটি থেকে নিঃশব্দে উড়াল দিল একটি বিমান। কন্ট্রোল টাওয়ারকে ধোঁকা দিয়ে, নিজের পরিচয় গোপন করে পাইলট বিমানটিকে নিয়ে গেলেন উত্তর সাগরের দিকে, তারপর স্কটল্যান্ডের আকাশে। সেই পাইলট আর কেউ নন, স্বয়ং রুডলফ হেস। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার এক বিপজ্জনক যাত্রা শেষে, জ্বালানি ফুরিয়ে এলে তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর দক্ষিণে ঈগলশাম গ্রামের কাছে একটি মাঠে প্যারাশুট দিয়ে ঝাঁপ দেন। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ে চুরমার হয়ে যায়।

প্যারাশুট থেকে নামার সময় গোড়ালিতে চোট পান হেস। তাকে প্রথম দেখতে পান স্থানীয় এক কৃষক, ডেভিড ম্যাকলিন। হাতের কাছে থাকা একটা পিচফর্ক নিয়ে ম্যাকলিন এগিয়ে যান সেই অজানা আগন্তুকের দিকে। হেস, তখনও নিজের আসল পরিচয় গোপন রেখে, নিজেকে ‘ক্যাপ্টেন আলফ্রেড হর্ন’ বলে পরিচয় দেন এবং জানান যে তার কাছে ডিউক অফ হ্যামিল্টনের জন্য একটি জরুরি বার্তা আছে। হেসের বিশ্বাস ছিল, ডিউক অফ হ্যামিল্টন ব্রিটেনের সেই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নেতা, যারা জার্মানির সাথে শান্তি চুক্তি করতে আগ্রহী।

খবরটা যখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাল, তখন তাদের বিস্ময়ের সীমা ছিল না। এও কি সম্ভব? নাৎসি জার্মানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তি একাই বিমান চালিয়ে তাদের দেশে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন? প্রথমে কেউই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ডিউক অফ হ্যামিল্টনকে খবর দেওয়া হলে তিনিও হেসকে চিনতে অস্বীকার করেন, যদিও ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে তাদের দেখা হয়ে থাকতে পারে। খবর পৌঁছাল লন্ডনে, প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কাছে। চার্চিল তৎক্ষণাৎ হেসকে বন্দি করার নির্দেশ দিলেন।

অন্যদিকে বার্লিনে তখন রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হেসের ব্যক্তিগত সহকারী তার রেখে যাওয়া একটি চিঠি হিটলারের কাছে পৌঁছে দেন। চিঠি পড়ে হিটলার ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই ঘটনা নাৎসি সরকারের জন্য কতটা লজ্জাজনক হতে পারে। তড়িঘড়ি করে নাৎসি প্রচারযন্ত্র ঘোষণা করে যে, রুডলফ হেস মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তিনি নিজের খেয়ালখুশিমতো এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং নির্দেশ জারি হয়, জার্মানিতে ফিরলেই তাকে গুলি করা হবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে আসল সত্যিটা কী ছিল? হেস কি সত্যিই একা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে ছিল আরও গভীর কোনো ষড়যন্ত্র?

সত্যের উন্মোচন

হেসের এই অবিশ্বাস্য অভিযানের পেছনের উদ্দেশ্য আজও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, যা একে ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্যে পরিণত করেছে। হেস নিজে জিজ্ঞাসাবাদের সময় দাবি করেছিলেন যে, তিনি একটি শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল জার্মানি ও ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি স্থাপন করা, যাতে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সময় পশ্চিম সীমান্তে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। তিনি ভেবেছিলেন, ডিউক অফ হ্যামিল্টনের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ রাজপরিবার ও সরকারের শান্তিকামী অংশের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু তার ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভুল।

যুদ্ধ শেষে হেসকে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে বিচার করা হয় এবং ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’ ও ‘যুদ্ধের ষড়যন্ত্র’-এর দায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তাকে বার্লিনের স্প্যানডাউ কারাগারে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি জীবনের বাকি ৪৬ বছর কাটান। একটা পর্যায়ে তিনি ছিলেন সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র বন্দী।

কিন্তু রহস্য এখানেই শেষ নয়। তার বন্দীদশা এবং মৃত্যু নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব:

  • হিটলারের সম্মতি: অনেকেই মনে করেন, হেস একা এই সিদ্ধান্ত নেননি। হিটলার হয়তো তার এই অভিযানের কথা জানতেন। এটি ছিল ব্রিটেনের মনোভাব বোঝার জন্য একটি মরিয়া চেষ্টা। হেস সফল হলে হিটলার কৃতিত্ব নিতেন, আর ব্যর্থ হলে তাকে পাগল বলে দেওয়া হতো, যা বাস্তবে করাও হয়েছিল।
  • ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ফাঁদ: আরেকটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা (MI6) হেসকে ফাঁদে ফেলেছিল। তারা ডিউক অফ হ্যামিল্টনের নাম ব্যবহার করে হেসকে শান্তি আলোচনার টোপ দিয়েছিল, যাতে তারা নাৎসি জার্মানির ভেতরের খবর জানতে পারে।
  • রহস্যময় মৃত্যু: ১৯৮৭ সালে, ৯৩ বছর বয়সে স্প্যানডাউ কারাগারের একটি বাগানের ঘরে হেসের মৃতদেহ পাওয়া যায়। বলা হয়, তিনি একটি বৈদ্যুতিক তার গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু তার পরিবার এবং অনেক গবেষক এই তত্ত্ব মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এত বয়স্ক ও দুর্বল একজন মানুষের পক্ষে এভাবে আত্মহত্যা করা প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, হেসকে হত্যা করা হয়েছিল, কারণ তিনি হয়তো এমন কিছু গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন যা ব্রিটেন বা অন্য কোনো মিত্রশক্তির জন্য অস্বস্তিকর হতে পারত।
  • ডামি তত্ত্ব: এমনকি এমনও একটি তত্ত্ব ছিল যে, স্প্যানডাউ কারাগারে যে ব্যক্তি বন্দী ছিলেন, তিনি আসল হেস নন, বরং তার মতো দেখতে অন্য কেউ। তবে সাম্প্রতিককালে ডিএনএ পরীক্ষায় এই তত্ত্বটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

রুডলফ হেসের সেই একক উড়ান ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক নাটকীয় এবং পরাবাস্তব অধ্যায়। তিনি কি একজন আদর্শবাদী শান্তিদূত ছিলেন, যিনি রক্তপাত বন্ধ করতে চেয়েছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন ক্ষমতার লোভে উন্মাদ এক ব্যক্তি? অথবা, তিনি ছিলেন এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার? সত্যিটা হয়তো রুডলফ হেসের সাথেই স্প্যানডাউ কারাগারের মাটিতে চাপা পড়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু একরাশ প্রশ্ন আর ইতিহাসের অন্যতম শিহরণ জাগানো এক অমীমাংসিত রহস্য।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)