ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাস। স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে অবস্থিত ফ্ল্যানান দ্বীপপুঞ্জ চিরকালই নাবিকদের কাছে এক বিভীষিকার নাম। জনমানবহীন, পাথুরে আর প্রায়শই কুয়াশায় ঢাকা এই দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে উঁচু চূড়া, এইলিয়ান মোরে সদ্য নির্মিত হয়েছিল এক বাতিঘর। এর আলো বহু জাহাজকে ভয়ঙ্কর বিপদ থেকে রক্ষা করত। এই বাতিঘরের দায়িত্বে ছিলেন তিনজন অভিজ্ঞ রক্ষী: জেমস ডুকাট, থমাস মার্শাল এবং ডোনাল্ড ম্যাকআর্থার। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন নির্ভরযোগ্য এবং নিজেদের কাজে দক্ষ। কিন্তু ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে এই নিঃসঙ্গ দ্বীপে এমন এক রহস্যের জন্ম হয়, যা আজও অমীমাংসিত।

১৫ই ডিসেম্বর, ফিলাডেলফিয়া থেকে আসা স্টিমার 'আর্ক্টর' লক্ষ্য করে যে বাতিঘরটি জ্বলছে না। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এটিকে প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু দিন গড়ানোর সাথে সাথে বাতিঘর থেকে কোনো সাড়া না মেলায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। অবশেষে ২৬শে ডিসেম্বর, ত্রাণবাহী জাহাজ 'হেসপেরাস' সেখানে পৌঁছায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন জেমস হার্ভি বার বার হর্ন বাজিয়ে এবং ফ্লেয়ার ছুঁড়েও যখন কোনো উত্তর পেলেন না, তখন তাঁর মনে এক অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধতে শুরু করে। দ্বীপটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ও নিস্তব্ধ।

রহস্যের জাল

ত্রাণকর্মী জোসেফ মুর একাই একটি ছোট নৌকায় করে দ্বীপে নামেন। বাতিঘরের দিকে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর মনে হচ্ছিল যেন কোনো অশুভ শক্তি চারপাশটা গ্রাস করে রেখেছে। তিনি দেখতে পান, বাতিঘরের প্রধান ফটক এবং দরজা দুটোই বন্ধ, কিন্তু তালা দেওয়া নেই। ভেতরে ঢোকার পর এক অদ্ভুত দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ে। খাবার টেবিলে পড়ে ছিল наполовину খাওয়া খাবার, একটি চেয়ার উল্টে পড়ে আছে, যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে উঠে গেছে। রান্নাঘরের ঘড়িটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সবকিছু পরিপাটি করে গোছানো থাকলেও তিনজন রক্ষীর কোনো চিহ্নই ছিল না।

আরও তল্লাশিতে দেখা যায়, বাতিঘরের ল্যাম্পগুলো পরিষ্কার করে তেল দিয়ে ভর্তি করা আছে, অর্থাৎ তারা নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা করেননি। কিন্তু একটি অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—তিনজনের মধ্যে দুজনের ওয়াটারপ্রুফ কোট উধাও, অথচ ডোনাল্ড ম্যাকআর্থারের কোটটি তার হুকে ঝুলছিল। সেই ভয়ংকর আবহাওয়ায় কেউ কোট ছাড়া বাইরে যাবে, এটা ছিল প্রায় অসম্ভব। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো পরিস্থিতিতে অন্তত একজনকে বাতিঘরে থাকতেই হতো। তাহলে তিনজন একসাথে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন?

তদন্তকারীরা দ্বীপের পশ্চিম দিকের অবতরণের জায়গায় গিয়ে আরও ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে পান। ঝড়ের তাণ্ডবে সেখানকার লোহার রেলিং বেঁকে গিয়েছিল, প্রায় এক টন ওজনের একটি পাথর স্থানচ্যুত হয়েছিল এবং প্রায় ২০০ ফুট উঁচু चट्टान থেকেও ঘাস উপড়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যেন কোনো বিশাল দানবীয় ঢেউ এসে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে রহস্যজনক ছিল বাতিঘরের লগবুক। তাতে লেখা ছিল ১২ ডিসেম্বর থেকে ভয়ংকর ঝড়ের কথা, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। অথচ, আশেপাশে কোথাও এমন কোনো ঝড়ের রেকর্ড ছিল না। এমনকি এও লেখা ছিল যে, ম্যাকআর্থারের মতো একজন শক্তিশালী এবং অভিজ্ঞ নাবিক ভয়ে কাঁদছিলেন।

সত্যের উন্মোচন

নর্দান লাইটহাউস বোর্ডের আনুষ্ঠানিক তদন্তে বলা হয়, সম্ভবত ১৫ই ডিসেম্বরের বিকেলে পশ্চিম ল্যান্ডিং-এর কিছু সরঞ্জাম ঝড়ের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ডুকাট এবং মার্শাল বাইরে গিয়েছিলেন। এরপর কোনো এক বিশাল ঢেউ তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাদের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে, ম্যাকআর্থার নিয়ম ভেঙে তাদের খুঁজতে বাইরে যান এবং তিনিও একই পরিণতির শিকার হন। কোট ছাড়া বাইরে যাওয়ার কারণ হিসেবে ধারণা করা হয়, তিনি হয়তো বন্ধুদের বাঁচাতে এতটাই মরিয়া ছিলেন যে কোট পরার সময়টুকুও পাননি।

কিন্তু এই তত্ত্ব সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। কেন লগবুকে এমন কাল্পনিক ঝড়ের বর্ণনা লেখা ছিল? অভিজ্ঞ রক্ষীরা কেন একসাথে নিয়ম ভেঙে বাইরে গেলেন? আর যদি সত্যিই কোনো অতিকায় ঢেউ এসে থাকে, তবে তার শক্তি কতটা ছিল যা ২০০ ফুট উঁচু चट्टानকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে?

বছরের পর বছর ধরে এই ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা লোককথা। কেউ বলে, তাদের ভিনগ্রহীরা তুলে নিয়ে গেছে, আবার কেউ বলে সামুদ্রিক দৈত্যের শিকার হয়েছেন তারা। অনেকে মনে করেন, ম্যাকআর্থারের হিংস্র স্বভাবের কারণে তাদের মধ্যে কোনো ভয়ংকর লড়াই হয়েছিল, যার পরিণতি হয় মৃত্যু। কিন্তু কোনো তত্ত্বই আজ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।

ফ্ল্যানান দ্বীপপুঞ্জের সেই বাতিঘর আজও দাঁড়িয়ে আছে, তবে এখন তা স্বয়ংক্রিয়। সেখানে আর কোনো মানুষের প্রয়োজন হয় না। তিনটি জীবনের সেই রহস্যময় অন্তর্ধান আজও এক হিমশীতল নীরবতার সাক্ষী হয়ে রয়েছে। সমুদ্রের গর্জনের আড়ালে হয়তো লুকিয়ে আছে সেই রাতের আসল সত্য, যা কোনোদিনও জানা যাবে না।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)