ঘটনার প্রেক্ষাপট
সময়টা ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি, উত্তর-পূর্ব ইতালির ফ্রিয়ুলি নামক এক পার্বত্য অঞ্চল। এখানকার জীবনযাত্রা ছিল কঠিন এবং অনেকাংশেই প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভরশীল। প্রতিটি ফসল ছিল গ্রামবাসীদের কাছে অমূল্য। কিন্তু এই দুশ্চিন্তার পাশাপাশি তাদের মনে ছিল আরও এক গভীর ভয়—ডাইনিদের অশুভ শক্তির ভয়। রাতের অন্ধকারে ডাইনিরা ফসলের ক্ষতি করে, শিশুদের অসুস্থ করে তোলে, এমনটাই ছিল তাদের বিশ্বাস। এই ভয় আর কুসংস্কারের অন্ধকারে ফ্রিয়ুলির বুকে জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত এবং রহস্যময় গোষ্ঠীর, যারা নিজেদের বলত ‘বেনানদান্টি’ বা ‘সৎ পথের যাত্রী’ (Good Walkers)।
কারা ছিল এই বেনানদান্টি? তারা ছিল সাধারণ কৃষক, পুরুষ ও নারী, যারা এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মাত—তাদের মাথা জন্মের সময় একটি পাতলা পর্দা বা ‘কল’ (caul) দিয়ে ঢাকা থাকত। গ্রামবাসীদের বিশ্বাস ছিল, এই চিহ্নই তাদের সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করেছে। এই চিহ্নই তাদের দিয়েছিল এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা—আত্মার জগতে ভ্রমণ করার এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার।
রহস্যের জাল
বছরের নির্দিষ্ট চারটি সময়ে, যখন ঋতু পরিবর্তন হতো, তখন বেনানদান্টিদের আত্মা তাদের ঘুমন্ত দেহ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ত। তাদের দাবি অনুযায়ী, এই আত্মারা ইঁদুর, বিড়াল বা প্রজাপতির রূপ ধরে রাতের আকাশে উড়ে যেত দূরবর্তী কোনো উপত্যকায়। সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করত অশুভ শক্তির প্রতীক, শয়তানের উপাসক ডাইনি বা ‘মালানদান্টি’ (Malandanti)।
এরপর শুরু হতো এক অদ্ভুত যুদ্ধ। বেনানদান্টিদের হাতে থাকত মৌরি গাছের ডাল, আর ডাইনিদের হাতে থাকত জোয়ারের ডাঁটা। যদি এই আধ্যাত্মিক যুদ্ধে বেনানদান্টিরা জিতত, তবে সেই বছরের ফসল ভালো হতো। আর যদি তারা হেরে যেত, তবে নেমে আসত দুর্ভিক্ষ আর মড়ক। তারা নিজেদের শয়তানের শত্রু এবং যিশুর অনুগত সৈনিক বলে মনে করত। তাদের বিশ্বাস ছিল, তারাই গ্রামের রক্ষাকর্তা।
কিন্তু এই গোপন বিশ্বাস বেশিদিন লুকিয়ে থাকেনি। ১৫৭৫ সাল নাগাদ, ইনকুইজিশন বা ধর্মীয় বিচারসভার কানে এই বেনানদান্টিদের কথা পৌঁছায়। প্রথমে ইনকুইজিটররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তারা এমন এক বিশ্বাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তাদের পরিচিত শয়তান উপাসনার ছকের সাথে全く মিলছিল না। বেনানদান্টিরা শয়তানের পূজা করত না, বরং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। তারা নিজেদের ধার্মিক খ্রিস্টান বলেই দাবি করত।
ইনকুইজিটরদের প্রশ্ন এবং চাপের মুখে বেনানদান্টিদের সরল বিশ্বাস ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে। ধর্মীয় আদালত তাদের রাতের যাত্রাকে ডাইনিদের প্রচলিত ‘স্যাবাথ’ (Witches' Sabbath) বা শয়তানের উপাসনার সাথে গুলিয়ে ফেলতে শুরু করে। যে মৌরি গাছের ডাল ছিল তাদের পবিত্র অস্ত্র, তাকেই শয়তানের প্রতীক হিসেবে দেখা হতে লাগল। যে আত্মারা গ্রামের ফসল রক্ষা করত, তাদেরকেই শয়তানের অনুচর বলে চিহ্নিত করা হলো।
সত্যের উন্মোচন
প্রায় একশ বছর ধরে এই বিচার চলতে থাকে। ইনকুইজিশনের ক্রমাগত চাপে এবং ভুল ব্যাখ্যার কারণে বেনানদান্টিদের মূল বিশ্বাসটি প্রায় হারিয়ে যায়। যে গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল গ্রামের রক্ষক হিসেবে, সময়ের সাথে সাথে তারাই ডাইনি হিসেবে পরিচিতি পায় এবং ধীরে ধীরে এই প্রথাটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
বিংশ শতাব্দীতে ইতালীয় ঐতিহাসিক কার্লো গিন্সবার্গ এই পুরনো নথিগুলো নতুন করে আবিষ্কার করেন। তার যুগান্তকারী গবেষণা, ‘দ্য নাইট ব্যাটলস’ (The Night Battles), এই রহস্যময় গোষ্ঠীর কাহিনী পৃথিবীর সামনে তুলে ধরে। গিন্সবার্গের মতে, বেনানদান্টিদের বিশ্বাস ছিল এক ধরনের প্রাচীন শস্যকেন্দ্রিক প্রথা (agrarian cult), যা খ্রিস্টধর্মের আগমনেরও আগে থেকে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে প্রচলিত ছিল। এটি ছিল প্রাক-খ্রিস্টীয় শামানিক সংস্কৃতির এক ক্ষীণ প্রতিধ্বনি, যা মধ্যযুগের ধর্মীয় গোঁড়ামির চাপে পড়ে নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলেছিল।
বেনানদান্টিদের রাতের যুদ্ধ কি শুধুই স্বপ্ন ছিল? নাকি কোনো প্রাচীন আধ্যাত্মিক প্রথার অংশ, যা আমরা আজ আর বুঝতে পারি না? তাদের দাবি কি ছিল নিছকই কল্পনা, নাকি এক হারানো জগতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি? এই প্রশ্নগুলো আজও ইতিহাসকে ঘিরে এক গভীর রহস্যের জাল বুনে রেখেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)