ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৯১৯ সাল। মেইনের বাথ শহরে জি.জি. ডিয়ারিং কোম্পানি এক বিশাল, পাঁচ মাস্তুলের কাঠের জাহাজ তৈরি করল, যার নাম দেওয়া হলো ‘ক্যারল এ. ডিয়ারিং’। এটি ছিল বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য নির্মিত শেষ কাঠের পালতোলা জাহাজগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রায় ২৫৫ ফুট লম্বা এই জাহাজটি খুব দ্রুতই পণ্য পরিবহনের জন্য খ্যাতি লাভ করে। কিন্তু কে জানত, মাত্র দুই বছরের মাথায় আটলান্টিকের বুকে এই দৃষ্টিনন্দন জাহাজটি এক ভয়ঙ্কর ও অমীমাংসিত রহস্যের জন্ম দেবে, যা আজও মানুষকে শিহরিত করে।

১৯২০ সালের আগস্ট মাসে, জাহাজটি ভার্জিনিয়ার নরফোক থেকে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই ক্যাপ্টেন উইলিয়াম এইচ. মেরিট অসুস্থ হয়ে পড়লে, তার পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত ৬৬ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন উইলিস ওয়ার্মেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ব্রাজিলে সফলভাবে কয়লা পৌঁছে দেওয়ার পর, ১৯২০ সালের ২রা ডিসেম্বর জাহাজটি ১১ জন ক্রু নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়। মাঝপথে বার্বাডোজে রসদ সংগ্রহের জন্য থামে। সেখানেই ক্যাপ্টেন ওয়ার্মেল তার এক পুরনো বন্ধুকে বলেছিলেন যে, জাহাজের প্রথম মেট ম্যাকলেলানের উপর তার আস্থা নেই এবং ক্রুদের মধ্যে বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বিপদসঙ্কেত সত্ত্বেও, তিনি যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

রহস্যের জাল

১৯২১ সালের ২৯শে জানুয়ারী, উত্তর ক্যারোলিনার কেপ লুকআউট লাইটশিপ থেকে ক্যারল এ. ডিয়ারিংকে দেখা যায়। লাইটশিপের রক্ষক লক্ষ করেন, জাহাজের কর্মীরা ডেকে বিশৃঙ্খলভাবে ঘোরাফেরা করছে। জাহাজের এক ক্রু চিৎকার করে জানায় যে, ঝড়ে তারা জাহাজের দুটো নোঙরই হারিয়েছে। এর পরের দিন, ৩০শে জানুয়ারী, বিকেলে ডায়মন্ড শোলস লাইট স্টেশনের কাছ দিয়ে জাহাজটিকে শেষবারের মতো দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জাহাজটি অদ্ভুতভাবে চলছিল।

এরপরই ঘটল সেই রহস্যময় ঘটনা। ৩১শে জানুয়ারী, ১৯২১ সালের সকালে, কেপ হ্যাটেরাসের কুখ্যাত ডায়মন্ড শোলস-এ ক্যারল এ. ডিয়ারিংকে চড়ায় আটকে পড়া অবস্থায় পাওয়া গেল। জাহাজটির সব পাল ওড়ানো ছিল, কিন্তু ডেকে কোনো প্রাণের চিহ্ন ছিল না। উত্তাল সমুদ্রের কারণে উদ্ধারকারী দল চার দিন পর, অর্থাৎ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি জাহাজে উঠতে সক্ষম হয়। জাহাজের ভেতরের দৃশ্য ছিল আরও ভুতুড়ে। রান্নাঘরে খাবার তৈরির প্রস্তুতি চলছিল, যেন এক্ষুনি কেউ খেতে বসবে। কিন্তু জাহাজে কোনো মানুষ ছিল না, ছিল শুধু তিনটি বিড়াল।

জাহাজের লগবুক, নেভিগেশন সরঞ্জাম, ক্রুদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র এবং দুটি লাইফবোট—সবই উধাও ছিল। জাহাজের স্টিয়ারিং হুইলটি ভাঙা ছিল। ১১ জন অভিজ্ঞ নাবিক যেন বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল। এই ভয়ঙ্কর ও নিঃশব্দ অন্তর্ধানের কোনো ব্যাখ্যাই মিলছিল না।

সত্যের উন্মোচন

আমেরিকা সরকারের পাঁচটি বিভাগ এই রহস্যময় অন্তর্ধানের তদন্ত শুরু করে। জলদস্যুতা, বিদ্রোহ, এমনকি সোভিয়েত চরদের দ্বারা জাহাজ ছিনতাইয়ের মতো নানা তত্ত্ব উঠে আসতে থাকে। কয়েক মাস পরে, একটি বোতলে ভরা বার্তা পাওয়া যায়, যেখানে লেখা ছিল, "ডিয়ারিং একটি তেলচালিত জাহাজ দ্বারা বন্দী হয়েছে... ক্রুদের হাতকড়া পরানো হয়েছে..."। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণ হয় যে, বার্তাটি জাল ছিল এবং যিনি এটি খুঁজে পেয়েছিলেন, তিনিই এটি লিখেছিলেন।

সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য তত্ত্বটি ছিল বিদ্রোহ। ক্যাপ্টেন ওয়ার্মেল এবং তার প্রথম মেটের মধ্যে সম্পর্ক ভালো ছিল না, যা হয়তো কোনো মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। অন্য একটি ধারণা হল, ডায়মন্ড শোলসের ভয়ঙ্কর আবহাওয়া, যা "আটলান্টিকের কবরস্থান" নামে পরিচিত, এর জন্য দায়ী। হয়তো ক্রুরা ঝড়ের মুখে জাহাজ ত্যাগ করে লাইফবোটে বাঁচার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উত্তাল সমুদ্রে তারা হারিয়ে যায়।

তদন্তে আরও একটি তথ্য উঠে আসে। ডিয়ারিং নিখোঁজ হওয়ার সময় এসএস হিউইট নামে আরও একটি কার্গো জাহাজ একই এলাকায় নিখোঁজ হয়ে যায়। কেউ কেউ মনে করেন, দুটি জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল, অথবা ডিয়ারিং-এর ক্রুদের হয়তো হিউইট উদ্ধার করেছিল, কিন্তু পরে দুটি জাহাজই সমুদ্রে তলিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত, কোনো তত্ত্বই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। ক্যারল এ. ডিয়ারিং-এর ভাঙা অংশটিকে নৌচলাচলের জন্য বিপজ্জনক মনে করায় ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ১১ জন নাবিকের পরিণতি কী হয়েছিল, সেই রহস্য আজও ডায়মন্ড শোলসের গভীর জলের নিচে চাপা পড়ে আছে। ক্যারল এ. ডিয়ারিং আজও বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত এক সামুদ্রিক রহস্য হিসেবে পরিচিত।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)