ঘটনার প্রেক্ষাপট

সালটা ১৫১৮। জুলাই মাসের এক প্রখর উত্তপ্ত সকাল। পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা স্ট্রাসবার্গ শহরের (বর্তমান ফ্রান্স) এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। [3] শহরবাসীর তখনও ঘুম ভাঙেনি। কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশকে চুরমার করে দিয়ে নিজের বাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় নেমে এলেন এক নারী, নাম ফ্রাউ ট্রফিয়া। [4] তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টি, শরীরে অস্থির ছটফটানি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কোনও বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই, তিনি একা একাই নাচতে শুরু করলেন। [2]

প্রথমে পথচারীরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। হয়তো কোনও ব্যক্তিগত আনন্দ বা দুঃখ প্রকাশের ভঙ্গি। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা গড়িয়ে গেল, ট্রফিয়ার নাচ থামার কোনও লক্ষণ নেই। তার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, পা দুটো রক্তাক্ত, কিন্তু তিনি নেচেই চলেছেন। [13] তার চোখের দৃষ্টিতে আনন্দের লেশমাত্র নেই, বরং ফুটে উঠছে একরাশ আতঙ্ক আর যন্ত্রণা। যেন অদৃশ্য কোনও শক্তি তাকে নাচতে বাধ্য করছে। এক দিন, দুই দিন... প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একটানা চলেছিল ট্রফিয়ার এই বিরামহীন, যন্ত্রণাদায়ক নাচ। [8] স্ট্রাসবার্গের মানুষ এক অভূতপূর্ব এবং ভয়ঙ্কর রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, যার জন্য তারা কেউই প্রস্তুত ছিল না।

রহস্যের জাল

বিষয়টি ভয়াবহ মোড় নিল যখন এক সপ্তাহের মধ্যে আরও প্রায় জনা ত্রিশেক মানুষ ট্রফিয়ার মতো করেই রাস্তায় নেমে নাচতে শুরু করল। [4] তাদের মধ্যেও একই লক্ষণ — ক্লান্তি, যন্ত্রণা এবং সাহায্য প্রার্থনার আর্তি ছাপিয়েও এক অদম্য শক্তি তাদের নাচিয়ে চলেছে। [5] শহরের রাস্তায় এক অদ্ভুত сюরিয়ালিস্টিক দৃশ্যের অবতারণা হলো। শত শত মানুষ যেন কোনও এক অদৃশ্য সুতোর টানে পুতুলের মতো নেচে চলেছে, অথচ তাদের চোখেমুখে বাঁচার আকুতি।

শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও চিকিৎসকেরা এই ঘটনায় হতচকিত হয়ে পড়েন। [9] তৎকালীন বিশ্বাস অনুযায়ী, তারা এই রোগের কারণ হিসেবে 'গরম রক্ত' বা 'Hot Blood'-কে দায়ী করেন। [6] তাদের নিদান ছিল আরও অদ্ভুত। তারা ঘোষণা করলেন, এই রোগের একমাত্র প্রতিকার হলো আরও বেশি করে নাচা! [5] এই ধারণার বশবর্তী হয়ে নগর কর্তৃপক্ষ শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি বিশাল কাঠের মঞ্চ তৈরি করে এবং পেশাদার বাদকদের ভাড়া করে নিয়ে আসে। [11] তাদের ধারণা ছিল, রোগাক্রান্ত মানুষগুলোকে দিনরাত নাচতে বাধ্য করলে তাদের শরীর থেকে এই 'অতিরিক্ত' শক্তি বেরিয়ে যাবে এবং তারা সুস্থ হয়ে উঠবে।

কিন্তু ফল হলো তার ঠিক উল্টো। [9] বাজনার শব্দে এবং কর্তৃপক্ষের এই অদ্ভুত 'চিকিৎসা'য় এই নাচের মহামারী যেন আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল। এক মাসের মধ্যে, প্রায় ৪০০ জন শহরবাসী এই রহস্যময় নাচের কবলে পড়ল। [7] পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। দিনের পর দিন একটানা নাচতে নাচতে বহু মানুষ হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শারীরিক ক্লান্তির কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগল। [5] কিছু কিছু ঐতিহাসিক দলিলের মতে, এই মহামারীর শিখরে থাকাকালীন প্রতিদিন প্রায় ১৫ জন মানুষ মারা যাচ্ছিল। [11] স্ট্রাসবার্গের বাতাস কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠল, কিন্তু নাচ থামল না। গোটা শহর এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়েছিল, যেখানে মৃত্যু আসছিল নাচের ছন্দে।

সত্যের উন্মোচন

সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, এই মহামারী ঠিক ততটাই রহস্যময়ভাবে শেষ হয়ে গেল, যতটা রহস্য নিয়ে এর শুরু হয়েছিল। [3] কিন্তু রেখে গেল একরাশ প্রশ্ন আর অমীমাংসিত রহস্য। কেন এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটল? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঐতিহাসিক এবং বিজ্ঞানীরা এর উত্তর খুঁজে চলেছেন।

১. অলৌকিক বা ধর্মীয় কারণ: তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ছিল, এটি সেন্ট ভিটাস (Saint Vitus) নামক এক ধর্মগুরুর অভিশাপ। [8] সেন্ট ভিটাসকে অসম্মান করার কারণেই তিনি শহরবাসীর উপর এই ভয়ঙ্কর নাচের অভিশাপ দিয়েছেন বলে অনেকে মনে করত। এই ভয়ে বহু মানুষ প্রায়শ্চিত্ত করতে সেই নাচিয়েদের দলে যোগ দিয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। [2]

২. আরগট (Ergot) ছত্রাকের বিষক্রিয়া: একটি আধুনিক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এই ঘটনার পিছনে আরগট (Ergot) নামক এক ধরনের ছত্রাকের ভূমিকা থাকতে পারে। [4] এই ছত্রাক সাধারণত রাই জাতীয় শস্যে জন্মায় এবং এর থেকে তৈরি হওয়া পাউরুটি খেলে মানুষের শরীরে বিষক্রিয়া হতে পারে। এই বিষক্রিয়ার ফলে খিঁচুনি, হ্যালুসিনেশন এবং অস্বাভাবিক শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দেখা দিতে পারে। [5] তবে এই তত্ত্বের একটি দুর্বলতা হলো, আরগট বিষক্রিয়া রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়, ফলে দিনের পর দিন একটানা নাচা প্রায় অসম্ভব। [6]

৩. গণ হিস্টিরিয়া বা ম্যাস সাইকোজেনিক ইলনেস (Mass Psychogenic Illness): আজকের দিনের অধিকাংশ ঐতিহাসিক এবং মনোবিজ্ঞানী যে তত্ত্বটিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, তা হলো 'গণ হিস্টিরিয়া'। [3] ঐতিহাসিক জন ওয়ালারের মতে, ১৫১৮ সালের স্ট্রাসবার্গ এক ভয়ঙ্কর দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। [6] লাগাতার দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য এবং সিফিলিস ও গুটিবসন্তের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব শহরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল। [3] এই চরম মানসিক চাপ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিশ্বাস থেকেই সম্ভবত এই গণ হিস্টিরিয়ার জন্ম হয়, যেখানে একজনের অস্বাভাবিক আচরণ দেখে বাকিরাও প্রভাবিত হতে শুরু করে। ফ্রাউ ট্রফিয়ার নাচ হয়তো ছিল তার ব্যক্তিগত মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ, যা পরবর্তীতে গোটা শহরে এক সংক্রামক মানসিক ব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।

যদিও গণ হিস্টিরিয়ার তত্ত্বটিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত, তবুও কোনও একটি নির্দিষ্ট কারণ দিয়ে এই ভয়ঙ্কর এবং অদ্ভুত ঐতিহাসিক ঘটনাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। স্ট্রাসবার্গের 'ডান্সিং প্লেগ' আজও ইতিহাসের এক শিহরণ জাগানো রহস্য হিসেবে রয়ে গেছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানব মনের জটিলতা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সমাজের ভঙ্গুরতার কথা।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)