ঘটনার প্রেক্ষাপট
অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্স, এক অস্থির সময়। বিপ্লবের আগুন জ্বলে উঠেছে দিকে দিকে। ঠিক এমনই এক সময়ে, ১৭৭২ সাল নাগাদ ফ্রান্সের এক গ্রামীণ এলাকায় জন্ম নেয় এক শিশু, নাম তার তারার (Tarrare)। আর পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতো সে ছিল না। তার মধ্যে ছিল এক অস্বাভাবিক, অতৃপ্ত এবং ভয়ঙ্কর ক্ষুধা।
কিশোর বয়সেই তার ক্ষুধা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, দিনে সে তার নিজের ওজনের সমান মাংস খেতে পারত। তার পরিবার তার এই রাক্ষুসে ক্ষুধা মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়লে, তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর তারার যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে শুরু করে। কখনো চোর বা দেহোপজীবিনীদের সঙ্গে ঘুরে, আবার কখনো রাস্তায় নানান অদ্ভুত জিনিস খেয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করে সে তার পেট ভরাত। পাথর, কর্ক, এমনকি জীবন্ত প্রাণীও সে আস্ত গিলে ফেলত। তার শরীর থেকে এক অসহ্য দুর্গন্ধ বের হতো, এতটাই তীব্র যে কুড়ি ফুট দূর থেকেও তা পাওয়া যেত। অদ্ভুতভাবে, এত খাওয়া সত্ত্বেও তারার চেহারা ছিল শীর্ণ, কেবল পেটটা ছাড়া। যখন সে খেত না, তার পেটের চামড়া এতটাই ঝুলে পড়ত যে তা কোমরের চারপাশে জড়িয়ে রাখা যেত।
রহস্যের জাল
ফরাসি বিপ্লবের সময় তারার ফরাসি সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর রেশন তার ক্ষুধার কাছে কিছুই ছিল না। quadruple বা চারগুণ রেশন দেওয়ার পরেও তার ক্ষুধা মিটত না। সে অন্য সৈন্যদের উচ্ছিষ্ট, আবর্জনা, এমনকি হাসপাতালের ক্ষত ঢাকার জন্য রাখা গজও খেয়ে ফেলত। তার এই অস্বাভাবিক ক্ষমতা সেনাবাহিনীর সার্জনদের নজরে আসে, বিশেষ করে ডক্টর কুরভিল এবং ব্যারন পিয়ের-ফ্রাঁসোয়া পার্সির।
তারা তারারের ওপর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। একবার তাকে ১৫ জন শ্রমিকের জন্য তৈরি করা খাবার দেওয়া হয়েছিল, যা সে একাই খেয়ে ফেলে। এমনকি জীবন্ত বিড়াল, সাপ, কুকুরছানা এবং আস্ত ইল মাছও সে গিলে খেয়েছিল, চিবানো ছাড়াই। তার এই ক্ষমতা দেখে জেনারেল আলেকজান্দ্রে দে বোহারনাইস তাকে গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করার এক অদ্ভুত পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা ছিল, তারার একটি কাঠের বাক্সে ভরা গোপন নথি গিলে ফেলবে, শত্রুসীমায় প্রবেশ করবে এবং পরে মলত্যাগের মাধ্যমে সেই বাক্সটি বের করে দেবে।
কিন্তু তার প্রথম অভিযানই ব্যর্থ হয়। জার্মান ভাষা না জানায় সে প্রুশিয়ানদের হাতে ধরা পড়ে যায়। প্রচণ্ড অত্যাচারের পর সে সব স্বীকার করে এবং তাকে একটি নকল মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তারারের মানসিক অবস্থাকে চিরতরে বদলে দেয়। সে সেনাবাহিনী ছেড়ে দেয় এবং desesperately বা মরিয়া হয়ে তার এই ভয়ঙ্কর ক্ষুধা থেকে মুক্তির জন্য ডাক্তারদের কাছে মিনতি করতে থাকে।
কিন্তু এর পরেই ঘটে সবচেয়ে শিহরণ জাগানো ঘটনাটি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন একদিন একটি ১৪ মাস বয়সী শিশু রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। সবাই তারারকেই সন্দেহ করে। যদিও কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না, কিন্তু তার পূর্বের ইতিহাস এবং জীবন্ত প্রাণী খাওয়ার অভ্যাস সন্দেহের আঙুল সরাসরি তার দিকেই তুলেছিল। এরপর জনরোষ থেকে বাঁচতে তারার হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়।
সত্যের উন্মোচন
চার বছর পর, ১৭৯৮ সালে, ভার্সাইয়ের এক হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় তারারের খোঁজ পাওয়া যায়। সে তখন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। তার ধারণা ছিল, সে দুই বছর আগে একটি সোনার কাঁটাচামচ গিলে ফেলেছিল, যা তার ভেতরে আটকে আছে। কিন্তু চিকিৎসা চলাকালীনই মাত্র ২৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর পর তার শরীর এত দ্রুত পচতে শুরু করে যে সার্জনরা প্রথমে অটোপসি বা শবব্যবচ্ছেদ করতে রাজি হননি। কিন্তু ব্যারন পার্সি এই রহস্যের শেষ দেখতে চেয়েছিলেন। অটোপসিতে যা দেখা গেল, তা ছিল ভয়ঙ্কর। তার গলার নালী অস্বাভাবিকভাবে চওড়া ছিল, এতটাই যে মুখ খুললে সোজা পেটের ভেতর পর্যন্ত দেখা যেত। তার পাকস্থলী ছিল বিশাল এবং আলসারে ভরা, যা প্রায় পুরো পেটজুড়ে বিস্তৃত ছিল। তার যকৃত এবং পিত্তথলিও ছিল অস্বাভাবিক বড়। তবে সেই সোনার কাঁটাচামচটি কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তারারের এই অবস্থা কি নিছকই কোনো বিরল শারীরিক রোগ, যেমন পলফ্যাগিয়া (Polyphagia) বা হাইপারথাইরয়েডিজম (hyperthyroidism) ছিল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে ছিল আরও গভীর কোনো অন্ধকার? সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুটিরই বা কী হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও ইতিহাসের পাতায় এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। তারারের জীবন এক মর্মান্তিক কাহিনী, যা আমাদের মানবদেহের অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)