ঘটনার প্রেক্ষাপট

সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ অব্দ। পারস্যের সম্রাট দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসিস, যিনি পরাক্রমশালী সাইরাস দ্য গ্রেটের পুত্র, সবেমাত্র মিশর জয় করেছেন। পেলুসিয়ামের যুদ্ধে ফারাও তৃতীয় সামটিককে পরাজিত করে তার অহংকার তখন আকাশছোঁয়া। কিন্তু ক্যাম্বাইসিসের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সেখানেই থেমে থাকেনি। তার নজর পড়েছিল মিশরের পশ্চিমের মরুভূমির গভীরে অবস্থিত সিওয়া মরূদ্যানের ওপর।

এই সিওয়া মরূদ্যান সাধারণ কোনো জায়গা ছিল না। এখানে ছিল আমুন দেবতার বিখ্যাত ওরাকল বা দৈববাণীর মন্দির। এই মন্দিরের পুরোহিতদের প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল অপরিসীম। কথিত আছে, তারা ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারতেন এবং তাদের আশীর্বাদ ছাড়া কোনো শাসকের শাসন বৈধতা পেত না। ক্যাম্বাইসিস চেয়েছিলেন এই ক্ষমতাধর মন্দিরকে নিজের অধীনে আনতে। পুরোহিতরা তার মিশরের শাসনকে বৈধতা দিতে অস্বীকার করলে, ক্ষিপ্ত সম্রাট এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার বিশাল সেনাবাহিনী থেকে ৫০,০০০ সৈন্যের এক শক্তিশালী বাহিনীকে সিওয়া মরূদ্যান ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেন। শুরু হতে চলেছিল ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এক অভিযান, যার পরিণতি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

রহস্যের জাল

গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের লেখনী অনুযায়ী, ৫০,০০০ সৈন্যের সেই বিশাল বাহিনী থিবস (বর্তমান লুক্সর) থেকে যাত্রা শুরু করে। মরুভূমির গভীরে সাত দিন চলার পর তারা ‘মরূদ্যানের দ্বীপ’ নামে পরিচিত একটি জায়গায় পৌঁছায়, যা সম্ভবত আজকের খারগা মরূদ্যান। সেটাই ছিল শেষবার, যখন এই বিশাল বাহিনীকে কেউ দেখেছিল।

এরপর কী হয়েছিল, তা নিয়ে কেবলই ধোঁয়াশা। হেরোডোটাসের বর্ণনা অনুযায়ী, সেনাবাহিনীটি যখন খারগা থেকে সিওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন মরুভূমির দক্ষিণ দিক থেকে এক ভয়ঙ্কর বালুঝড় ওঠে। এই ঝড় সাধারণ কোনো ঝড় ছিল না; এটি ছিল এক দানবীয় ‘সিমুম’, যা আকাশকে অন্ধকার করে দিয়েছিল। ঘূর্ণি আকারে বালি উড়ে এসে ঢেকে দিচ্ছিল সবকিছু। দেখতে দেখতে সেই প্রলয়ঙ্করী ঝড় গ্রাস করে নেয় গোটা সেনাবাহিনীকে।

যখন ঝড় থেমে গেল, তখন যতদূর চোখ যায়, কেবল অনন্ত বালি আর বালি। ৫০,০০০ সৈন্য, তাদের ঘোড়া, অস্ত্রশস্ত্র, রসদ—সবকিছু যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। একজন সৈন্যও ফিরে আসেনি। কোনো বার্তাবাহকও পৌঁছায়নি। পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাসের পাতা থেকে যেন মুছে গিয়েছিল একটি আস্ত সেনাবাহিনী। অবাক করা বিষয় হলো, পারস্যের কোনো সরকারি নথিতে এত বড় একটা সামরিক বিপর্যয়ের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না, যা এই ঘটনাকে আরও রহস্যমণ্ডিত করে তুলেছে।

সত্যের উন্মোচন

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্যাম্বাইসিসের হারিয়ে যাওয়া সেনাবাহিনীকে একটি কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা হতো। অনেকেই হেরোডোটাসের এই গল্পকে অতিরঞ্জিত বা নিছকই কাল্পনিক বলে মনে করতেন। কিন্তু মানুষের কৌতুহল থেমে থাকেনি। গুপ্তধন শিকারি থেকে শুরু করে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক, অনেকেই এই হারানো বাহিনীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।

বিভিন্ন সময়ে কিছু আবিষ্কারের দাবি করা হলেও, কোনোটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ২০০০ সালে হেলওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ভূতাত্ত্বিক কিছু মানব কঙ্কাল, ধাতব অস্ত্রের টুকরো এবং কাপড়ের ছেঁড়া অংশ খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছিলেন। এরপর ২০০৯ সালে দুই ইতালীয় প্রত্নতাত্ত্বিক, অ্যাঞ্জেলো এবং আলফ্রেডো কাস্টিগ্লিওনি, সিওয়া মরূদ্যানের কাছে পারস্য আমলের বেশ কিছু প্রত্নবস্তু ও মানব দেহাবশেষ আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাদের এই আবিষ্কার অ্যাকাডেমিক জার্নালের পরিবর্তে একটি তথ্যচিত্রে প্রকাশিত হওয়ায় এর সত্যতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

বর্তমানে এই রহস্য নিয়ে একাধিক তত্ত্ব প্রচলিত আছে:

১. বালুঝড়ের তত্ত্ব: সবচেয়ে সহজ এবং হেরোডোটাসের বর্ণিত তত্ত্বটি হলো, সত্যিই এক বিশাল বালুঝড় সেনাবাহিনীকে গ্রাস করেছিল। মরুভূমির আবহাওয়া অত্যন্ত অনিশ্চিত এবং একটি আকস্মিক ও শক্তিশালী ঝড় একটি despreprepared বাহিনীকে ধ্বংস করে দিতেই পারে।

২. মিশরীয় বিদ্রোহীর আক্রমণ: নেদারল্যান্ডসের প্রত্নতাত্ত্বিক ওলাফ কাপের একটি ভিন্ন তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে, সেনাবাহিনীকে কোনো বালুঝড় ধ্বংস করেনি, বরং তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছিল। সেই সময়ে পেতুবাসটিস তৃতীয় নামে এক মিশরীয় বিদ্রোহী নেতা পারস্য শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কাপেরের মতে, ক্যাম্বাইসিসের বাহিনী দাখলা মরূদ্যানে পৌঁছালে পেতুবাসটিসের সৈন্যরা তাদের অ্যামবুশ করে পরাজিত ও হত্যা করে। পরবর্তী পারস্য সম্রাট প্রথম দারিয়ুস এই লজ্জাজনক পরাজয়ের খবর চাপা দিতে বালুঝড়ের গল্পটি তৈরি করেন।

৩. দিকভ্রান্তি ও অনাহার: আরেকটি বাস্তবসম্মত তত্ত্ব হলো, বিশাল সেনাবাহিনীটি মরুভূমিতে পথ হারিয়ে ফেলে। অচেনা পরিবেশে, তীব্র গরমে এবং সীমিত জল ও খাদ্যের কারণে ধীরে ধীরে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাদের দেহাবশেষ ও অস্ত্রশস্ত্র সময়ের সাথে সাথে বালির নিচে চাপা পড়ে যায়।

আজও পর্যন্ত, আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেও ক্যাম্বাইসিসের হারানো সেনাবাহিনীর কোনো নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায়নি। ৫০,০০০ সৈন্যের সেই গণকবর আজও মিশরের পশ্চিমের মরুভূমির বালির নিচে কোথাও লুকিয়ে আছে। এটি ইতিহাসের সেইসব অমীমাংসিত রহস্যগুলোর মধ্যে একটি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি এবং ইতিহাসের কাছে মানুষ কতটা অসহায়।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)