ঘটনার প্রেক্ষাপট

আজকের কাহিনী এক অভিশপ্ত জাহাজকে ঘিরে, যার প্রেতাত্মা আজও প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাহাকার করে বেড়ায়। তার নাম এসএস ভ্যালেন্সিয়া। ১৮৮২ সালে নির্মিত এই বাষ্পীয় জাহাজটি তার কর্মজীবনের শুরুতে নিউইয়র্ক এবং ভেনিজুয়েলার মধ্যে যাত্রী পরিবহন করত। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে তাকে নিয়ে আসা হয় উত্তর আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে, এক কুখ্যাত জলপথে, যা নাবিকদের কাছে পরিচিত ছিল ‘গ্রেভইয়ার্ড অফ দ্য প্যাসিফিক’ বা ‘প্রশান্ত মহাসাগরের সমাধিক্ষেত্র’ নামে। এই ভয়াল জলপথ ওরেগনের টিলামুক বে থেকে শুরু করে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের উত্তর প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। ঘন কুয়াশা, উত্তাল ঢেউ, আর লুকানো পাথরের প্রাচীর এই অঞ্চলকে পরিণত করেছিল এক মৃত্যুফাঁদে, যা কেড়ে নিয়েছিল প্রায় দুই হাজারেরও বেশি জাহাজের সলিলসমাধি এবং শত শত নাবিকের প্রাণ। আর এই সমাধিক্ষೇತ್ರেই লেখা হয়েছিল এসএস ভ্যালেন্সিয়ার শেষ অধ্যায়।

রহস্যের জাল

দিনটা ছিল ২০শে জানুয়ারি, ১৯০৬। সান ফ্রান্সিসকো থেকে সিয়াটলের উদ্দেশে পাড়ি জমায় এসএস ভ্যালেন্সিয়া। জাহাজে তখন ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী ও ক্রু। যাত্রা শুরুর দুই দিন পর, ২২শে জানুয়ারির রাতে, ভ্যাঙ্কুভার দ্বীপের কাছে আসতেই প্রকৃতি তার ভয়াল রূপ ধারণ করে। ভয়ঙ্কর ঝড় আর непроница্য কুয়াশায় দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে জাহাজটি। ক্যাপ্টেন এবং নাবিকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও, জাহাজটি সজোরে ধাক্কা খায় এক লুকানো পাথরের সঙ্গে। জাহাজের তলদেশে তৈরি হয় এক বিশাল ফাটল, আর হিমশীতল জল হু হু করে ঢুকতে শুরু করে ভেতরে।

বাঁচার জন্য শুরু হয় এক απεγν চেষ্টা। উত্তাল সমুদ্রে লাইফবোট নামানো হয়, কিন্তু তা ছিল আত্মহত্যারই সামিল। বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে বেশিরভাগ লাইফবোট উল্টে যায় বা পাথরের উপর আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। যারা বাঁচার আশায় লাইফবোটে উঠেছিল, অতলান্তিকের হিমশীতল অন্ধকার তাদের গ্রাস করে। জাহাজের এক বেঁচে যাওয়া কর্মী, ফ্র্যাঙ্ক লিন, সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, "নারী ও শিশুদের আর্তনাদ, ঝড়ের গর্জন আর উত্তাল ঢেউয়ের শব্দ মিলেমিশে এক নারকীয় ঐকতান তৈরি করেছিল।" প্রায় ৪০ ঘণ্টা ধরে চলেছিল এই মৃত্যুযন্ত্রণা। উদ্ধারকারী জাহাজ কাছে এসেও ভয়ঙ্কর আবহাওয়ার কারণে সাহায্য করতে পারছিল না। অবশেষে, ১৩০ জনেরও বেশি যাত্রীর সলিলসমাধি ঘটে। ভাগ্যের পরিহাসে, এই দুর্ঘটনায় একজন নারী বা শিশুও বাঁচেনি। মাত্র ৩৭ জন পুরুষ কোনোক্রমে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হন।

কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়, বরং শুরু। ভ্যালেন্সিয়ার ধ্বংস হওয়াটা ছিল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল, তা বিজ্ঞানের কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে মেলানো যায় না।

সত্যের উন্মোচন

জাহাজডুবির কয়েক মাস পর থেকেই শুরু হয় অদ্ভুত সব ঘটনা। স্থানীয় জেলে এবং নাবিকরা দাবি করতে শুরু করে যে, তারা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভ্যালেন্সিয়ার মতো একটি ভৌতিক জাহাজকে ভাসতে দেখেছে। সেই জাহাজের ডেকে নাকি দেখা যেত ছায়ামূর্তি, যারা সেই ভয়ঙ্কর রাতের ঘটনারই পুনরাভিনয় করে চলেছে। শুধু তাই নয়, অনেকেই কঙ্কালবাহী লাইফবোট দেখতে পাওয়ার দাবি করেন। সবচেয়ে শিহরণ জাগানো ঘটনাটি ঘটে জাহাজডুবির প্রায় ৬ মাস পর। এক স্থানীয় জেলে এবং তার স্ত্রী প্যাশিনা উপসাগরের কাছে একটি समुद्री গুহার ভেতরে ৮টি কঙ্কালসহ একটি লাইফবোট ভাসতে দেখেন। কিন্তু দুর্গমতার কারণে সেই লাইফবোটটিকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, এবং গুহাটির অবস্থানও কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

তবে সবথেকে অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছিল আরও অনেক পরে, ১৯৩৩ সালে। জাহাজডুবির ২৭ বছর পর, বার্কলে সাউন্ডে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় একটি লাইফবোট ভেসে ওঠে। পরিচ্ছন্ন লাইফবোটটির গায়ে লাগানো নামফলক থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এটি এসএস ভ্যালেন্সিয়ার হারিয়ে যাওয়া ‘লাইফবোট নম্বর ৫’। এটা কীভাবে সম্ভব? ২৭টা বছর ধরে সমুদ্রের নোনা জল আর প্রকৃতির করাল গ্রাসকে উপেক্ষা করে কীভাবে একটি কাঠের লাইফবোট প্রায় অক্ষত অবস্থায় থাকতে পারে? এতদিন সে কোথায় ছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এসএস ভ্যালেন্সিয়ার দুর্ঘটনা ছিল খারাপ আবহাওয়া এবং দিক নির্ণয়ের ভুলের করুণ পরিণতি। কিন্তু তারপরের ঘটনাগুলো? কঙ্কালবাহী লাইফবোট, ভৌতিক জাহাজের আনাগোনা, আর ২৭ বছর পর লাইফবোটের অলৌকিক প্রত্যাবর্তন—এসবই এসএস ভ্যালেন্সিয়াকে ইতিহাসের এক নিছক দুর্ঘটনা থেকে এক শিহরণ জাগানো ভৌতিক কিংবদন্তীতে পরিণত করেছে। আজও ভ্যাঙ্কুভারের সেই উপকূলে কান পাতলে নাকি শোনা যায় সেই অভিশপ্ত জাহাজের যাত্রীদের আর্তনাদ।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)