ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৮১২ সালের শেষ বিকেল। কনকনে শীতের হাওয়া আর আটলান্টিকের ধূসর জলরাশি যেন এক অশুভ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল। দক্ষিণ ক্যারোলিনার জর্জটাউন বন্দর থেকে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে প্রস্তুত 'প্যাট্রিয়ট' নামের একটি দ্রুতগতির জাহাজ। [2, 3] এই জাহাজের অন্যতম যাত্রী ছিলেন থিওডোসিয়া বুর আলস্টন, তৎকালীন আমেরিকার তৃতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যারন বুরের একমাত্র কন্যা। [2, 5] বিদূষী, সুন্দরী ও বাবার অত্যন্ত আদরের থিওডোসিয়া তখন গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন। মাত্র কয়েক মাস আগেই তিনি তাঁর দশ বছরের একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন ভয়ঙ্কর ম্যালেরিয়ায়। [4] এই শোক আর নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি পাড়ি দিচ্ছিলেন উত্তাল সমুদ্র, বাবাকে একটিবার দেখার জন্য। [5] তাঁর স্বামী, দক্ষিণ ক্যারোলিনার গভর্নর জোসেফ আলস্টন, যুদ্ধের কারণে তাঁর সঙ্গী হতে পারেননি। [3, 18] তাই একরাশ শূন্যতা আর ভয়কে সঙ্গী করেই জাহাজে উঠেছিলেন থিওডোসিয়া, সাথে ছিলেন কেবল একজন চিকিৎসক, টিমোথি গ্রিন, যাঁকে তাঁর বাবা পাঠিয়েছিলেন। [2, 18] তাঁরা কি জানতেন, এই যাত্রাই হতে চলেছে ইতিহাসের এক অমীমাংসিত রহস্যের সূচনা?
রহস্যের জাল
৩১শে ডিসেম্বর, ১৮১২। 'প্যাট্রিয়ট' জাহাজটি সমুদ্রের বুকে মিলিয়ে গেল। [3] সাধারণত এই যাত্রাপথে পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় লাগার কথা। [6] কিন্তু সপ্তাহ পেরিয়ে মাস গড়িয়ে গেল, নিউ ইয়র্কের বন্দরে 'প্যাট্রিয়ট' পৌঁছাল না। থিওডোসিয়ার বাবা অ্যারন বুর এবং স্বামী জোসেফ আলস্টন উদ্বেগে ছটফট করতে লাগলেন। [5] কোনো খবর নেই, কোনো চিহ্ন নেই। জাহাজটি যেন অতলান্তিকের অতলে বিলীন হয়ে গেছে। [6] কী ঘটেছিল থিওডোসিয়ার সাথে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসতে শুরু করে একের পর এক শিহরণ জাগানো তত্ত্ব।
তত্ত্ব ১: আটলান্টিকের অভিশাপ
সবচেয়ে منطقی ব্যাখ্যাটি ছিল একটি ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড়। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর লগবুক থেকে জানা যায়, ১৮১৩ সালের ২রা জানুয়ারি নাগাদ কেপ হ্যাটারাসের কাছে একটি ভয়ংকর ঝড় উঠেছিল। [2, 6, 17] এই অঞ্চলটি 'আটলান্টিকের কবরস্থান' নামে কুখ্যাত। ঐতিহাসিকদের মতে, এই হারিকেন-সম ঝড়ের কবলে পড়েই সম্ভবত 'প্যাট্রিয়ট' তার সকল যাত্রীসহ সমুদ্রে তলিয়ে যায়। [17] কিন্তু কোনোদিন জাহাজের একটি কাঠের টুকরো বা কোনো যাত্রীর দেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা এই তত্ত্বকে নিশ্চিত করতে পারেনি। [16]
তত্ত্ব ২: জলদস্যুদের নৃশংসতা
এরপর উঠে আসে এক ভয়ঙ্কর কাহিনী—জলদস্যুদের আক্রমণ। 'প্যাট্রিয়ট' একসময় প্রাইভেটিয়ার বা সরকারি অনুমতিপ্রাপ্ত দস্যু জাহাজ হিসেবে কাজ করত এবং শোনা যায়, সে সময় জাহাজে করে মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। [4, 18] এই লোভেই হয়তো ক্যারোলিনার কুখ্যাত জলদস্যুরা জাহাজটি আক্রমণ করে। [4] বছরের পর বছর ধরে, বিভিন্ন জলদস্যুর смерशय्याয় দেওয়া স্বীকারোক্তির গল্প ছড়িয়ে পড়তে থাকে। [10, 14] তারা নাকি জাহাজের সমস্ত যাত্রীকে হত্যা করে, এবং সুন্দরী থিওডোসিয়াকে তক্তা দিয়ে হাঁটিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেয়। [7, 10] একজন জলদস্যু, ডমিনিক ইউক্সের নামে প্রচলিত এক স্বীকারোক্তিতে বলা হয়, থিওডোসিয়া নাকি angelic হাসিমুখে, ধীর পদক্ষেপে তক্তা থেকে সমুদ্রে নেমে গিয়েছিলেন, যেন তিনি কোনো বাহন থেকে নামছেন। [2] এই গল্পগুলো শিহরণ জাগালেও, তাদের কোনোটিরই ठोस প্রমাণ মেলেনি।
তত্ত্ব ৩: ন্যাশন্যাল হেডের সেই রহস্যময়ী
তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ও রহস্যময় ঘটনাটি ঘটে ১৮৬৯ সালে, অর্থাৎ অন্তর্ধানের প্রায় ৫৭ বছর পর। [9] উত্তর ক্যারোলিনার ন্যাশন্যাল হেড-এ ডা. উইলিয়াম পুল নামে এক চিকিৎসক এক মুমূর্ষু বৃদ্ধার চিকিৎসা করতে যান। [8] পারিশ্রমিক দেওয়ার মতো টাকা না থাকায়, বৃদ্ধার পরিবার তাঁকে একটি পুরোনো, কিন্তু অসাধারণ সুন্দর তৈলচিত্র দেয়। [11] ছবিটি ছিল এক তরুণীর, যার চেহারার সাথে থিওডোসিয়ার অবিশ্বাস্য মিল। [19] বৃদ্ধার পরিবার জানায়, ছবিটি নাকি বহু বছর আগে ঝড়ে ভেসে আসা এক পরিত্যক্ত জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। [13] অন্য একটি গল্প অনুযায়ী, এক স্মৃতিভ্রষ্ট তরুণী ঝড়ের পর একটি ছোট নৌকায় ভেসে এসেছিলেন, যার সাথে ছিল শুধু এই ছবিটি। [16] সেই ছবিটি, যা 'ন্যাশন্যাল হেড পোট্রেট' নামে পরিচিত, আজও রহস্য জিইয়ে রেখেছে। [8] অনেকেই বিশ্বাস করেন, থিওডোসিয়া বাবাকে উপহার দেওয়ার জন্য নিজের প্রতিকৃতিটি জাহাজে নিয়ে যাচ্ছিলেন। [12, 17] ছবিটি কি তবে তাঁর শেষ যাত্রার একমাত্র সাক্ষী?
সত্যের উন্মোচন
দুশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। থিওডোসিয়া বুর আলস্টনের অন্তর্ধান রহস্যের কোনো সমাধান হয়নি। তাঁর বাবা অ্যারন বুর বাকি জীবন মেয়ের শোকে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর মেয়ে ঝড়ের কবলেই প্রাণ হারিয়েছে। [2, 10] তিনি বলতেন, "সে বেঁচে থাকলে পৃথিবীর কোনো কারাগার তাকে আমার থেকে দূরে রাখতে পারত না।" [6, 10] জলদস্যুদের স্বীকারোক্তিগুলো ছিল পরস্পরবিরোধী এবং প্রমাণহীন। [14] ন্যাশন্যাল হেডের তৈলচিত্রটি আজও এক বিস্ময়, কিন্তু তা কোনো নিশ্চিত উত্তর দেয় না। [11]
সম্ভবত আটলান্টিকের এক ভয়াল রাতের ঝড়ই কেড়ে নিয়েছিল ২৯ বছর বয়সী থিওডোসিয়ার প্রাণ। [2] কিন্তু কোনো ধ্বংসাবশেষ না থাকায় কল্পনার দরজা চিরকালের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। থিওডোসিয়ার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল—সমুদ্রের শীতল গভীরতা, জলদস্যুদের তরবারি, নাকি একাকীত্বে ভরা স্মৃতিভ্রষ্ট জীবন? উত্তরটা হারিয়ে গেছে সময়ের অতলে, আটলান্টিকের হিমশীতল ঢেউয়ের নিচে, যা আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম এক করুণ ও অমীমাংসিত রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)