প্রেম, ভালোবাসা, মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া—এইসব নিয়ে আমরা কতই না গল্প-সিনেমা দেখি! ভাবি, ‘ইশ্‌, আমার জীবনেও যদি এমন সিনেমার মতো কিছু হতো!’ কিন্তু আজ আপনাদের এমন এক সত্যি প্রেমের গল্প শোনাব, যা যেকোনো বলিউড বা হলিউড সিনেমাকেও হার মানিয়ে দেবে। আর এই গল্পের নায়ক কোনো রাজপুত্র নয়, বরং ছোট্ট এক শামুক! হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। এমন এক শামুক, যে ছিল আক্ষরিক অর্থেই ‘এক কোটিতে একজন’।

জেরেমির অদ্ভুত প্রেমকাহিনী

গল্পের নায়কের নাম জেরেমি। সে ছিল ইংল্যান্ডের এক বাগানে থাকা আর পাঁচটা সাধারণ শামুকের মতোই। কিন্তু তার মধ্যে একটা বিশেষত্ব ছিল, যা তাকে করে তুলেছিল সবার থেকে আলাদা। আর এই বিশেষত্বটাই তার জীবনে ভালোবাসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পৃথিবীর বেশিরভাগ শামুকের খোলস ডানদিকে অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটার দিকে প্যাঁচানো থাকে, কিন্তু জেরেমি ছিল এক বিরল ‘বাম-হাতি’ শামুক। তার খোলস ছিল বামদিকে প্যাঁচানো। এই ‘এক কোটিতে একটা’ ঘটনাটি তাকে বিখ্যাত করে তুললেও, তার একাকীত্বের কারণও ছিল এটাই।

ব্যাপারটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, শামুকদের জগতে এটা একটা বিশাল সমস্যা। কারণ খোলসের এই প্যাঁচের ভিন্নতার জন্য তাদের প্রজনন অঙ্গগুলোও উল্টো দিকে থাকে। ফলে, একজন ডান-প্যাঁচওয়ালা শামুকের সঙ্গে একজন বাম-প্যাঁচওয়ালা শামুকের মিলন প্রায় অসম্ভব। ভাবুন তো একবার, আপনার ভালোবাসার মানুষ আপনার সামনে, অথচ প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মের জন্য আপনি তার কাছে যেতেই পারছেন না! জেরেমির অবস্থাও ছিল ঠিক তেমনই।

জেরেমির এই একাকীত্ব নজরে আসে নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানীর। তিনি বুঝতে পারেন, জেরেমির এই বিরল বৈশিষ্ট্যটি জেনেটিক গবেষণার জন্য কতটা মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ছিল জেরেমির মতো আরও একজন ‘বাম-হাতি’ সঙ্গীর, যার সঙ্গে সে জুটি বাঁধতে পারবে। শুরু হলো বিশ্বজুড়ে জেরেমির জন্য জীবনসঙ্গী খোঁজার এক অভিনব অভিযান। বিজ্ঞানীরা #SnailLove হ্যাশট্যাগ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার শুরু করেন। জেরেমির গল্প ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে, আর সে হয়ে ওঠে এক ইন্টারনেট ‘শেলিব্রিটি’ (Shellebrity)।

অবশেষে, হাজার হাজার মানুষের সাহায্যে, জেরেমির জন্য দুজন সঙ্গীর খোঁজ পাওয়া গেল—স্পেনের টমেউ এবং ইপ্সউইচের লেফটি। সবাই ভাবল, এবার বুঝি জেরেমির একাকীত্বের অবসান হলো। কিন্তু গল্পের মোড় এখানেই! সিনেমার মতোই এক ‘ট্র্যাজিক টুইস্ট’ অপেক্ষা করছিল জেরেমির জন্য। তাকে অবাক করে দিয়ে, টমেউ আর লেফটি একে অপরের প্রেমে পড়ে যায় এবং তারা জুটি বেঁধে ফেলে। বেচারা জেরেমি আবারও একা!

তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি, আর জেরেমিও হয়তো আশা ছাড়েনি। জীবনের শেষ দিকে এসে, জেরেমি অবশেষে টমেউর সঙ্গে মিলিত হতে পেরেছিল এবং ৫৬টি সন্তানের জন্ম দিয়েছিল। যদিও তার সন্তানেরা সবাই ছিল ডান-প্যাঁচওয়ালা, কিন্তু সে তার বংশধর রেখে যেতে পেরেছিল। এর কিছুদিন পরেই, ২০১৭ সালের ১১ই অক্টোবর, জেরেমি মারা যায়।

জেরেমির এই ছোট্ট জীবনটা আমাদের একটা বড় শিক্ষা দিয়ে যায়। ভালোবাসা সত্যিই খুব অদ্ভুত। কখনও তা আসে অপ্রত্যাশিতভাবে, আবার কখনও তার জন্য করতে হয় लंबा অপেক্ষা। জেরেমি হয়তো সিনেমার নায়কদের মতো দেখতে ছিল না, কিন্তু তার প্রেমের গল্পটা ছিল সত্যিই অসাধারণ। সে আমাদের শিখিয়েছে, আপনি যতই দুর্লভ বা আলাদা হোন না কেন, এই বিশাল পৃথিবীতে আপনার জন্যও কেউ না কেউ কোথাও অপেক্ষা করছে। শুধু আশাটা জিইয়ে রাখতে হয়, ঠিক জেরেমির মতো।