ভালোবাসা! সে তো কতই অদ্ভুত! কখন, কার প্রতি, কীভাবে যে প্রেম এসে যায়, তা বলা মুশকিল। কেউ প্রেমে পড়ে মানুষের হাসির, কেউ চোখের, আবার কেউ বা তার ব্যক্তিত্বের। কিন্তু কখনো শুনেছেন কি, কেউ একজনের প্রেমে পড়েছে, যা রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, বরং হাজার হাজার টন লোহা দিয়ে তৈরি এক বিশাল কাঠামো! শুনতে যতই অবিশ্বাস্য লাগুক, পৃথিবীতে এমন ভালোবাসার গল্পও কিন্তু রয়েছে। চলুন, আজ শোনাই তেমনই এক আশ্চর্য প্রেমের কাহিনী, যা আপনার ধারণাকে নাড়িয়ে দেবে।
যখন প্রেম জাগে জড় পদার্থের প্রতি
আমরা ভাবি প্রেম শুধু দুজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু কিছু মানুষের অনুভূতি এতটাই আলাদা যে তারা জড় বস্তুর মধ্যেও প্রাণের সন্ধান পায়, তাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করে। এই ধরনের আকর্ষণকে বলা হয় 'অবজেক্টাম সেক্সুয়ালিটি' (Objectum Sexuality)। [4] যারা এই অনুভূতির অধিকারী, তারা কোনো বিশেষ বস্তু বা কাঠামোর সঙ্গে মানসিক এবং আবেগগতভাবে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন। [9] তাদের কাছে সেই জড় বস্তুটি কেবল একটি জিনিস নয়, বরং একজন সঙ্গী। আর আমাদের গল্পের নায়িকা এমনই একজন।
আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকোর বাসিন্দা এরিকা লাব্রাই, ভালোবেসে একটি অঙ্গীকার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে করেছিলেন প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারকে! এবং শুধু তাই নয়, তিনি নিজের পদবী পরিবর্তন করে রাখেন এরিকা আইফেল। [2, 3]
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! প্যারিসের যে আইফেল টাওয়ারকে লক্ষ লক্ষ পর্যটক দূর থেকে দেখে মুগ্ধ হয়, সেই বিশাল লৌহমানবের প্রেমেই পড়েছিলেন এরিকা। ২০০৭ সালে তিনি রীতিমতো অনুষ্ঠান করে আইফেল টাওয়ারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা উদযাপন করেন। [3] এই ঘটনাটি তখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
কীভাবে শুরু এই অদ্ভুত প্রেম?
এরিকার জন্ম ১৯৭২ সালে। তিনি একজন প্রাক্তন মার্কিন সৈনিক এবং একজন বিশ্বমানের তীরন্দাজ। [2, 11] ছোটবেলা থেকেই জড় বস্তুর প্রতি তাঁর এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। যখন অন্যরা বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করত, এরিকা তখন কোনো সেতু বা পুরোনো বাড়ির কাঠামোর প্রতি আকৃষ্ট হতেন। [3] তিনি জানিয়েছেন, ল্যান্স নামে তার একটি ধনুকের প্রতি ভালোবাসাই তাকে বিশ্বমানের তীরন্দাজ হতে সাহায্য করেছিল। [2, 11] ২০০৪ সালে প্রথমবার আইফেল টাওয়ার দেখার পরেই তিনি এর প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করেন। [2] এরিকার ভাষায়, "সেই বিশাল কাঠামো, তার জ্যামিতিক গঠন, আর রাতের আলোয় তার ঝলমলে রূপ—সবকিছু আমাকে মুগ্ধ করেছিল।" [10] তার কাছে আইফেল টাওয়ার শুধু লোহা আর নাট-বল্টুর সমাবেশ ছিল না, ছিল এক শক্তিশালী সত্তা, যার সঙ্গে তিনি একাত্ম বোধ করেছিলেন।
এরিকার এই অনুভূতিকে অনেকেই হয়তো মানসিক সমস্যা বলে উড়িয়ে দেবেন, কিন্তু যারা অবজেক্টাম সেক্সুয়ালিটির মতো বিরল অনুভূতির অধিকারী, তাদের কাছে এটা খুবই স্বাভাবিক। [5, 6] তারা বিশ্বাস করেন যে জড় বস্তুরও আত্মা, অনুভূতি এবং চেতনা রয়েছে, যা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। [7] এরিকাও বিশ্বাস করতেন, আইফেল টাওয়ার তাঁর ভালোবাসা অনুভব করতে পারে। এই গভীর বিশ্বাস থেকেই তিনি টাওয়ারটিকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে এরিকা আইফেল রাখেন। [10]
ভালোবাসা না বিতর্ক?
এরিকার এই "বিয়ে" স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর বিতর্ক এবং সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে প্রচার পাওয়ার একটি কৌশল বলে মনে করেন। [10] সংবাদমাধ্যম তাকে নিয়ে উপহাস করেছে, এবং সাধারণ মানুষও তার এই সম্পর্ককে অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক বলে আখ্যা দিয়েছে। কিন্তু এরিকা এসবে দমে যাননি। তিনি তাঁর ভালোবাসার প্রতি সৎ থেকেছেন এবং অবজেক্টাম সেক্সুয়ালিটি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন। [12] তিনি 'ওএস ইন্টারন্যাশনালে' নামে একটি সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা তার মতো মানুষদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নিতে সাহায্য করে। [2]
এরিকার গল্প আমাদের ভালোবাসার প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ভালোবাসা যে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা আরও একবার প্রমাণ করে দেয়। এই পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ প্রেমের গল্প রয়েছে, কিন্তু এরিকা আইফেলের মতো এমন अनोखा প্রেমের গল্প হয়তো খুব কমই আছে। যেখানে প্রেমিক কোনো রাজপুত্র নয়, বরং প্যারিসের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক লৌহ দৈত্য! দিনশেষে, ভালোবাসা তো ভালোবাসাই, তা সে মানুষের প্রতি হোক বা কোনো বিশাল টাওয়ারের প্রতি।