ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৮১২ সালের শেষ দিন। আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনার জর্জটাউন বন্দরে নোঙর ফেলে আছে এক দ্রুতগামী জাহাজ, নাম ‘প্যাট্রিয়ট’। এটি কোনো সাধারণ জাহাজ নয়; কিছুদিন আগেও এটি ছিল একটি প্রাইভেটিয়ার, অর্থাৎ সরকারের অনুমতিতে শত্রু জাহাজে হামলাকারী ব্যক্তিগত জাহাজ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এর খ্যাতি ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু আজ এর যাত্রী তালিকাতে এমন একজনের নাম ছিল, যার পরিচিতি ছিল দেশজুড়ে। তিনি থিওডোসিয়া বার অ্যালস্টন—বিদুষী, রূপসী এবং আমেরিকার তৎকালীন তৃতীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যারন বারের একমাত্র কন্যা।

থিওডোসিয়ার জীবনটা ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। তার বাবা অ্যারন বার ছিলেন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনকে ডুয়েলে হত্যা করার পর তার সম্মান ধুলোয় মিশে যায়। এরপর দেশদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিনি ইউরোপে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। এই কঠিন সময়ে বাবাকে আগলে রেখেছিলেন একমাত্র মেয়ে থিওডোসিয়া। বাবার মতোই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন তিনি; ল্যাটিন, গ্রিক ভাষায় পারদর্শী, যা সেই যুগে নারীদের জন্য ছিল অকল্পনীয়।

কিন্তু থিওডোসিয়ার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল যন্ত্রণার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক অজানা রোগে ভুগছিলেন। এর মধ্যেই তার একমাত্র দশ বছর বয়সী সন্তান ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। শোকে পাথর হয়ে যাওয়া থিওডোসিয়া বাবাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, "আমার জন্য আর কোনো আনন্দ নেই। পৃথিবীটা শূন্য। আমি আমার ছেলেকে হারিয়েছি।" এই অবস্থাতেই নির্বাসন থেকে ফেরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে তিনি নিউইয়র্কের উদ্দেশে ‘প্যাট্রিয়ট’ জাহাজে ওঠেন। তার স্বামী, জোসেফ অ্যালস্টন, সাউথ ক্যারোলিনার গভর্নর হওয়ায় যুদ্ধের কারণে রাজ্য ছেড়ে যেতে পারেননি। ১৮১২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর, ‘প্যাট্রিয়ট’ নিউইয়র্কের দিকে যাত্রা শুরু করে। এরপর সেই জাহাজ বা তার কোনো যাত্রীকে আর কখনও দেখা যায়নি।

রহস্যের জাল

দিন গড়িয়ে সপ্তাহ হলো, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস। ‘প্যাট্রিয়ট’ নিউইয়র্কে পৌঁছাল না। অ্যারন বার এবং জোসেফ অ্যালস্টনের সমস্ত উদ্বেগ আর অপেক্ষা ব্যর্থ হলো। জাহাজটি যেন আটলান্টিকের অতল গহ্বরে মিলিয়ে গেছে। শুরু হলো আমেরিকার অন্যতম পুরোনো এক নৌ-রহস্যের জন্ম। কী হয়েছিল থিওডোসিয়ার? বিভিন্ন তত্ত্ব আর কিংবদন্তি ডালপালা মেলতে শুরু করলো, যার প্রতিটি ছিল আগেরটির চেয়েও রোমহর্ষক।

তত্ত্ব ১: ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড়

সবচেয়ে সহজ এবং যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যাটি ছিল ভয়ংকর এক সামুদ্রিক ঝড়। ১৮১৩ সালের ২রা এবং ৩রা জানুয়ারি, উত্তর ক্যারোলিনার কেপ হ্যাটারাসের কাছে একটি প্রচণ্ড ঝড় আঘাত হেনেছিল, যা 'আটলান্টিকের কবরস্থান' (Graveyard of the Atlantic) নামে কুখ্যাত। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর লগবুক থেকে জানা যায়, ওই রাতে ঝড়ের তাণ্ডবে তাদের নৌবহরও ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, দ্রুতগামী কিন্তু তুলনামূলকভাবে ছোট স্কুনার ‘প্যাট্রিয়ট’-এর পক্ষে সেই ঝড় মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল না। সম্ভবত, জাহাজটি ওই ঝড়ের কবলে পড়েই তার সকল যাত্রীসহ সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। অ্যারন বার নিজেও এই তত্ত্বটি বিশ্বাস করতে চেয়েছেন, কারণ অন্য সম্ভাবনাগুলো ছিল আরও ভয়ংকর।

তত্ত্ব ২: জলদস্যুদের নৃশংসতা

উনিশ শতকের শুরুর দিকে আটলান্টিকের ওই অঞ্চলে জলদস্যুদের অবাধ বিচরণ ছিল। ‘প্যাট্রিয়ট’ যেহেতু একটি প্রাইভেটিয়ার ছিল, তাই জলদস্যুদের ধারণা হতে পারে যে জাহাজে প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে। কয়েক বছর পর থেকে বিভিন্ন জলদস্যুর মৃত্যুশয্যায় স্বীকারোক্তির গল্প ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একজন জলদস্যু নাকি মরার আগে স্বীকার করে যে, তারাই ‘প্যাট্রিয়ট’ আক্রমণ করেছিল এবং সমস্ত যাত্রীকে হত্যা করে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, থিওডোসিয়াকে নাকি 'ওয়াক দ্য প্ল্যাঙ্ক' অর্থাৎ জাহাজের তক্তা দিয়ে হেঁটে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। আরেক কুখ্যাত জলদস্যু ডমিনিক ইউক্সের নামও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়েছিল। তবে এই স্বীকারোক্তিগুলোর কোনোটিরই ठोस প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তত্ত্ব ৩: ক্যারোলিনার ‘ব্যাংকার’ বা লুটেরারা

জলদস্যুদের চেয়েও ভয়ংকর ছিল উত্তর ক্যারোলিনার উপকূলের কিছু বাসিন্দা, যারা ‘ব্যাংকার’ (Bankers) বা ‘রেকার্স’ (Wreckers) নামে পরিচিত ছিল। অভিযোগ আছে, এরা রাতের অন্ধকারে নকল বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে বা তীরে লণ্ঠন ঝুলিয়ে রাখা ঘোড়াকে হাঁটিয়ে জাহাজকে বিভ্রান্ত করত। নাবিকেরা সেই আলোকে বন্দর ভেবে জাহাজ তীরে নিয়ে এলেই তা চড়ায় আটকে যেত। তখন এই লুটেরার দল জাহাজে হামলা করে সবকিছু লুট করে নিত এবং যাত্রী ও নাবিকদের হত্যা করত। অনেকেই মনে করেন, ‘প্যাট্রিয়ট’ হয়তো এমনই একদল ‘ব্যাংকারের’ শিকার হয়েছিল।

তত্ত্ব ৪: রহস্যময় ‘ন্যাগস হেড’ প্রতিকৃতি

এই রহস্যের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং অলৌকিক অধ্যায়টি শুরু হয় ঘটনার প্রায় ৬০ বছর পর, ১৮৬৯ সালে। উত্তর ক্যারোলিনার ন্যাগে হেডে (Nags Head) ডা. উইলিয়াম পুল নামে এক চিকিৎসক এক মুমূর্ষু বৃদ্ধার চিকিৎসা করতে যান। সেই গরিব মহিলার কুঁড়েঘরের দেয়ালে একটি অসাধারণ তৈলচিত্র দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। ছবিটি ছিল অভিজাত পোশাক পরা এক তরুণীর। চিকিৎসা ফি হিসেবে ডাক্তার সেই ছবিটি চান। কিংবদন্তি অনুযায়ী, বৃদ্ধা জানান যে ছবিটি তার প্রথম স্বামী একটি বিধ্বস্ত জাহাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করেছিলেন, যা ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় তীরে ভেসে এসেছিল। ডা. পুল ছবিটি সংগ্রহ করেন এবং তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে এটি আর কারও নয়, স্বয়ং থিওডোসিয়া বার অ্যালস্টনের প্রতিকৃতি। তিনি বারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও ছবিটির সঙ্গে থিওডোসিয়ার চেহারার মিল খুঁজে পান, যদিও নিশ্চিতভাবে কেউ কিছু বলতে পারেননি। সেই রহস্যময় প্রতিকৃতিটি, যা ‘ন্যাগস হেড পোরট্রেট’ নামে পরিচিত, আজও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে। এটি কি সত্যিই থিওডোসিয়ার ছবি? তিনি কি বাবার জন্য উপহার হিসেবে ছবিটি নিয়ে যাচ্ছিলেন? এই প্রশ্নগুলো রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।

সত্যের উন্মোচন

দুশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু থিওডোসিয়া বার অ্যালস্টনের অন্তর্ধান রহস্যের কোনো সমাধান হয়নি। কোনো ধ্বংসাবশেষ, কোনো প্রমাণ—কিছুই পাওয়া যায়নি। ঝড়, জলদস্যু, লুটেরা—নানা তত্ত্ব উঠে এলেও কোনোটিই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। তার বাবা অ্যারন বার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মেয়ের ফেরার আশায় পথ চেয়ে থাকতেন। মেয়ের শোকে এবং সম্মানহানির আঘাতে জর্জরিত হয়ে ১৮৩৬ সালে তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান। তার তিন বছর পরেই মারা যান থিওডোসিয়ার স্বামী জোসেফ অ্যালস্টন।

অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, আটলান্টিকের ভয়াল ঝড়ই ‘প্যাট্রিয়ট’-এর সলিলসমাধির কারণ। কিন্তু জলদস্যুদের স্বীকারোক্তি এবং ন্যাগে হেডের সেই ভূতুড়ে প্রতিকৃতির গল্প আজও মানুষের মনে শিহরণ জাগায়। থিওডোসিয়ার পরিণতি কি প্রকৃতির রোষ, নাকি মানুষের লোভের শিকার? আমেরিকার ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া এই বিদুষী নারীর শেষ পরিণতি হয়তো আটলান্টিকের গভীর নীল জলের তলায় চিরদিনের জন্য চাপা পড়ে গেছে।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)