ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৮৭২ সালের নভেম্বর মাস। নিউ ইয়র্কের বন্দর থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল আমেরিকান বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মেরি সেলেস্ট’। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন অভিজ্ঞ বেঞ্জামিন ব্রিগস। তার সাথে ছিলেন তার স্ত্রী, দুই বছরের শিশুকন্যা এবং সাতজন নাবিক। জাহাজের খোলে ছিল ১৭০১ ব্যারেল অপরিশোধিত অ্যালকোহল। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। শান্ত সমুদ্র, অনুকূল বাতাস আর একদল অভিজ্ঞ নাবিক—একটি সফল যাত্রার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই ছিল। কিন্তু কে জানত, এই যাত্রাই পরিণত হতে চলেছে সমুদ্রের ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এক অধ্যায়ে?

যাত্রা শুরুর लगभग এক মাস পর, ৫ই ডিসেম্বর, আজোরস দ্বীপপুঞ্জ এবং পর্তুগাল উপকূলের মাঝামাঝি এক জায়গায় ব্রিটিশ জাহাজ ‘দেই গ্রাসিয়া’-র ক্যাপ্টেন ডেভিড মোরহাউসের চোখে পড়ে মেরি সেলেস্টকে। জাহাজটি কেমন যেন খাপছাড়াভাবে চলছিল, পালগুলো ছেঁড়া, আর ডেকে কোনো মানুষের চিহ্নমাত্র নেই। ক্যাপ্টেন মোরহাউস অবাক হয়েছিলেন, কারণ মেরি সেলেস্ট তার জাহাজ থেকে আট দিন আগে রওনা দিয়েছিল এবং এতদিনে তার জেনোয়া পৌঁছে যাওয়ার কথা। কিছু একটা যে বড় গোলমাল হয়েছে, তা তিনি তখনই আঁচ করতে পেরেছিলেন।

রহস্যের জাল

ক্যাপ্টেন মোরহাউস তার নাবিকদের একটি দল পাঠান মেরি সেলেস্ট-এর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে। তারা জাহাজে উঠে যা দেখলেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য এবং হাড় হিম করে দেওয়ার মতো। জাহাজটি ছিল সম্পূর্ণ জনশূন্য! ক্যাপ্টেন ব্রিগস, তার পরিবার বা বাকি নাবিকদের কোনো চিহ্নই সেখানে ছিল না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, জাহাজে কোনো রকম লড়াই বা আক্রমণের চিহ্ন ছিল না। নাবিকদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, ছয় মাসের রসদ, খাবার, জল—সবই অক্ষত ছিল। জাহাজের খোলে থাকা অ্যালকোহলের ব্যারেলগুলোও প্রায় সবই ঠিকঠাক ছিল, কেবল কয়েকটি ব্যারেল খালি পাওয়া যায়। জাহাজের লগবুকে শেষ লেখা হয়েছিল ১০ দিন আগে, ২৫শে নভেম্বর সকাল ৫টায়। সেখানে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার উল্লেখ ছিল না।

কিন্তু কিছু জিনিস উধাও ছিল। জাহাজের একমাত্র লাইফবোটটি পাওয়া যায়নি। জাহাজের দুটি পাম্পের মধ্যে একটিকে খুলে রাখা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এবং খোলে প্রায় সাড়ে তিন ফুট জল জমে ছিল, যদিও তা জাহাজ ডোবানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ক্যাপ্টেনের সেক্সট্যান্ট (দিক নির্ণয় যন্ত্র) এবং ক্রনোমিটারও (সময় মাপার যন্ত্র) খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো এক অজানা আতঙ্কে জাহাজের সবাই খুব তাড়াহুড়োয় জাহাজ ছেড়ে লাইফবোটে করে পালিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কেন? কী এমন ঘটেছিল যে, একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সমুদ্রযাত্রার উপযুক্ত জাহাজ ছেড়ে দশজন মানুষ উত্তাল সমুদ্রে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন?

সত্যের উন্মোচন

‘দেই গ্রাসিয়া’-র নাবিকরা মেরি সেলেস্টকে ৮০০ মাইল চালিয়ে জিব্রাল্টারে নিয়ে আসেন। সেখানে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ একটি দীর্ঘ তদন্ত শুরু করে। জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে শুরু করে নাবিকদের বিদ্রোহ, এমনকি ‘দেই গ্রাসিয়া’-র নাবিকদের দ্বারা ষড়যন্ত্রের তত্ত্বও খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু কোনো কিছুর পক্ষেই শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বছরের পর বছর ধরে এই রহস্য সমাধানের জন্য নানা তত্ত্ব উঠে এসেছে। কেউ বলেছেন, অ্যালকোহলের ব্যারেল থেকে গ্যাস লিক করে বিস্ফোরণের ভয়ে ক্যাপ্টেন সবাইকে নিয়ে লাইফবোটে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু পরে আর জাহাজে ফিরতে পারেননি। অন্য একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি বিকল পাম্প এবং দিক নির্ণয় যন্ত্রের ভুল রিডিং-এর কারণে ক্যাপ্টেন ব্রিগস হয়তো ভেবেছিলেন জাহাজটি দ্রুত ডুবে যাচ্ছে, তাই তিনি জাহাজ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। সামুদ্রিক দৈত্যের আক্রমণ বা ভূমিকম্পের মতো কল্পনাপ্রবণ তত্ত্বও বাদ যায়নি, বিশেষ করে শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েলের একটি ছোট গল্প এই ঘটনাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার পর।

তবে কোনো তত্ত্বই আজ পর্যন্ত अकाट্য প্রমাণ সহ পেশ করা যায়নি। মেরি সেলেস্ট-এর সেই দশজন যাত্রীর কী হয়েছিল, তা কেউ জানে না। তারা কি সমুদ্রে হারিয়ে গিয়েছিলেন? নাকি অন্য কোনো জাহাজের দ্বারা উদ্ধার হয়েছিলেন? তাদের পরিণতি অতলান্তিকের গভীর নীল জলের মতোই রহস্যময় রয়ে গেছে। মেরি সেলেস্ট জাহাজটি পরে আরও ১৩ বছর বিভিন্ন মালিকের অধীনে সমুদ্রে ভেসে বেড়িয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইন্স্যুরেন্সের টাকা হাতানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে হাইতির উপকূলে এটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। জাহাজের শেষ পরিণতি হলেও, তার বুকে জমে থাকা রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি। আজও ‘মেরি সেলেস্ট’ নামটি সমুদ্রের বুকে এক ভুতুড়ে, জনশূন্য জাহাজের প্রতিচ্ছবি হয়ে রয়ে গেছে, যা আমাদের এক অমীমাংসিত ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করে।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)