ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৯৪৪ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলছে ইউরোপের বুকে। মিত্রশক্তি জার্মানির উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে, কিন্তু নাৎসি বাহিনীর প্রতিরোধও প্রচণ্ড। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ রক্ত দিয়ে মাপা হয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী এমন একদল সেনাকে প্রস্তুত করছিল যাদের প্রধান অস্ত্র ছিল না কোনও বন্দুক বা কামান। তাদের অস্ত্র ছিল বিভ্রম, মায়া এবং ধোঁকা।
এই গোপন ইউনিটের নাম ছিল 'টুয়েন্টি থার্ড হেডকোয়ার্টার্স স্পেশাল ট্রুপস', কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে তাদের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ঘোস্ট আর্মি’ বা ভুতুড়ে সেনা। এই দলে ছিল প্রায় ১১০০ জন সৈন্য, কিন্তু তারা সাধারণ সৈনিক ছিলেন না। তাদের মধ্যে ছিলেন শিল্পী, ডিজাইনার, আর্কিটেক্ট, অভিনেতা এবং সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিউ ইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়ার আর্ট স্কুল থেকে বেছে বেছে আনা হয়েছিল এই প্রতিভাবান তরুণদের। তাদের মিশন ছিল একটাই - নিজেদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে জার্মান সেনাবাহিনীকে বোকা বানানো এবং হাজার হাজার মিত্রশক্তির সেনার জীবন বাঁচানো। তাদের অস্তিত্ব এতটাই গোপন রাখা হয়েছিল যে, যুদ্ধের পরেও প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্ব তাদের কথা জানতে পারেনি।
রহস্যের জাল
এই ভুতুড়ে সেনারা কীভাবে তাদের ভৌতিক কার্যকলাপ চালাত? তাদের কৌশল ছিল মূলত তিন প্রকারের: ভিজ্যুয়াল, সোনিক এবং রেডিও ডিসেপশন।
দৃশ্যমান বিভ্রম: দলের সদস্যরা রাবারের তৈরি বিশাল বিশাল নকল ট্যাঙ্ক, কামান, জিপ এবং বিমান ব্যবহার করত। এই নকল যানগুলোকে কম্প্রেসার দিয়ে ফুলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি এমনভাবে সাজিয়ে রাখা হতো, যাতে আকাশ থেকে জার্মান গুপ্তচর বিমান সেগুলোকে আসল বলে মনে করে। একটা আস্ত সাঁজোয়া ডিভিশন তৈরি করতে তাদের মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত। শুধু তাই নয়, নকল সৈন্যদের কাপড় শুকানোর জন্য দড়ি টাঙানো বা নকল টায়ারের ছাপ ফেলার মতো খুঁটিনাটি বিষয়েও তারা নজর রাখত, যাতে সবকিছু একেবারে বাস্তব মনে হয়।
শব্দের মায়া: এই বাহিনীর কাছে ছিল বিশালাকার সব স্পিকার, যা দিয়ে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের নকল শব্দ তৈরি করত। ফোর্ট নক্সের মতো জায়গায় আসল ট্যাঙ্কের এগিয়ে যাওয়ার শব্দ, সৈন্যদের কুচকাওয়াজ, বা ব্রিজ তৈরির শব্দ রেকর্ড করে আনা হয়েছিল। রাতের অন্ধকারে এইসব স্পিকার থেকে সেই শব্দগুলো বাজিয়ে জার্মানদের বোঝানো হতো যে, মিত্রশক্তির বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। তারা প্রায় ১৫ মাইল দূর থেকেও এই শব্দের বিভ্রম তৈরি করতে পারত।
রেডিও প্রতারণা: ভুতুড়ে সেনারা নকল রেডিও বার্তা পাঠাত। তারা বিভিন্ন কাল্পনিক ইউনিটের নামে এমনভাবে রেডিও ট্র্যাফিক তৈরি করত, যা জার্মানদের কাছে একেবারে আসল মনে হতো। তারা এমনকি মিত্রশক্তির অন্যান্য ইউনিটের রেডিও অপারেটরদের ধরন নকল করে বার্তা পাঠাত, যাতে জার্মান গোয়েন্দারা কোনওভাবেই সন্দেহ করতে না পারে।
এই ভুতুড়ে সেনারা ডি-ডে'র কিছুদিন পর থেকেই ফ্রান্সে তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। রাইন নদী পার হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে তারা একাই প্রায় দুটি ডিভিশনের (প্রায় ৩০,০০০ সৈন্যের) বিভ্রম তৈরি করেছিল। তারা জার্মানদের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রেখেছিল, যার ফলে আসল সেনারা প্রায় বিনা প্রতিরোধে নদী পার হতে সক্ষম হয়। এই সেনারা ২০টিরও বেশি বড় বড় প্রতারণামূলক মিশন সফলভাবে পরিচালনা করে, অথচ তাদের নিজেদের সুরক্ষার জন্য ছিল শুধু সাধারণ মেশিনগান।
সত্যের উন্মোচন
এই ভুতুড়ে সেনাদের অভিযান এতটাই সফল ছিল যে, অনুমান করা হয় তারা প্রায় ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ আমেরিকান সেনার জীবন বাঁচিয়েছিল। তাদের তৈরি বিভ্রমের জালে জার্মানরা বারবার পা দিয়েছে এবং নিজেদের বাহিনীকে ভুল জায়গায় পাঠিয়ে শক্তি ক্ষয় করেছে। যুদ্ধের ময়দানে যেখানে একটি ছোট ভুলও মৃত্যুর কারণ হতে পারে, সেখানে এই শিল্পীরা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা আর সৃজনশীলতা দিয়ে যুদ্ধের গতিপথকেই প্রভাবিত করেছিল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, এই সেনাদের কঠোর গোপনীয়তার শপথ নিতে হয়। তাদের সমস্ত কার্যকলাপের নথি 'টপ সিক্রেট' হিসেবে চিহ্নিত করে তালাবন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি তাদের পরিবারও জানতে পারেনি তারা ঠিক কী কাজ করত। বিশ্ব এই সাহসী শিল্পীদের কথা জানতে পারে ১৯৯৬ সালে, যখন তাদের ফাইলগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। অবশেষে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তাদের এই অসামান্য অবদানের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার 'কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল' দিয়ে সম্মানিত করে।
আজও যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ওঠে, তখন সবাই ট্যাঙ্ক, কামান আর বীর সৈনিকদের কথাই ভাবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল একদল শিল্পী, যারা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে যুদ্ধ জেতার জন্য সবসময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না, কখনও কখনও একটু বিভ্রমই যথেষ্ট।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)