ঘটনার প্রেক্ষাপট
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলছে বিশ্বজুড়ে। ১৯১৮ সাল, আটলান্টিক মহাসাগর তখন মৃত্যুফাঁদ। একদিকে জার্মান ইউ-বোটের অতর্কিত হামলা, অন্যদিকে প্রকৃতির নির্মমতা। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব, ৫৫৩ ফুট লম্বা বিশাল আকৃতির কার্গো জাহাজ ইউএসএস সাইক্লপস (USS Cyclops) ব্রাজিলের সালভাদর থেকে প্রায় ১১,০০০ টন ম্যাঙ্গানিজ আকরিক ও ৩০৯ জন নাবিক নিয়ে বাল্টিমোরের দিকে যাত্রা শুরু করে। জাহাজটির নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার জর্জ ডব্লিউ ওয়ার্লি, যাঁকে নিয়ে নাবিকদের মধ্যে বেশ কিছু বিতর্ক ছিল। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। আবহাওয়াও ছিল অনুকূল। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে, এই যাত্রাই হতে চলেছে ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় এক সমুদ্রযাত্রার সূচনা।
রহস্যের জাল
১৯১৮ সালের ৪ঠা মার্চ বার্বাডোস থেকে শেষবারের মতো দেখা যায় ইউএসএস সাইক্লপসকে। এরপর? এরপর শুধুই অনন্ত নীরবতা। কোনো বিপদ সংকেত (SOS) পাঠানো হয়নি, কোনো জার্মান সাবমেরিন হামলার রেকর্ড নেই, এমনকি জাহাজের কোনো ধ্বংসাবশেষ, একটি লাইফবোট বা সামান্য কোনো চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেন সুবিশাল আটলান্টিকের বুক থেকে আস্ত একটি জাহাজ তার ৩০৯ জন আরোহীসহ স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী ইতিহাসের অন্যতম বড় অনুসন্ধান অভিযান চালায়। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় আটলান্টিকের বিশাল વિસ્તાર। কিন্তু ফলাফল ছিল শূন্য। কীভাবে সম্ভব? একটি আধুনিক, শক্তিশালী জাহাজ কীভাবে কোনো চিহ্ন না রেখে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে? বিশ্বযুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে নানা তত্ত্ব উঠে আসতে শুরু করে। কেউ বলল, জার্মান ইউ-বোটের অতর্কিত টর্পেডো হামলায় হয়তো মুহূর্তের মধ্যে জাহাজটি ডুবে গেছে। কিন্তু যুদ্ধ শেষে জার্মান রেকর্ড ঘেঁটেও এই এলাকায় কোনো হামলার প্রমাণ মেলেনি।
অন্য একটি তত্ত্ব ছিল জাহাজের কমান্ডার জর্জ ডব্লিউ ওয়ার্লিকে নিয়ে। অভিযোগ ছিল, তিনি জার্মানপন্থী এবং হয়তো শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়ে জাহাজটি তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু এর পক্ষেও কোনো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাহলে কি জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল? নাকি ম্যাঙ্গানিজ আকরিকের ভারে জাহাজের কাঠামোতে কোনো বিপর্যয় ঘটেছিল? কিন্তু সেরকম কিছু হলেও তো ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার কথা!
সত্যের উন্মোচন
বছরের পর বছর কেটে গেলেও ইউএসএস সাইক্লপসের অন্তর্ধানের রহস্য আজও অমীমাংসিত। কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই রহস্যময় অন্তর্ধানই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কিংবদন্তিকে আরও জোরালো করে তোলে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সাইক্লপস বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের সেই অশুভ শক্তির শিকার হয়েছিল, যা দশকের পর দশক ধরে বহু জাহাজ ও বিমানকে নিজের অতল গহ্বরে টেনে নিয়েছে। যদিও বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বকে কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু কোনো বাস্তবিক প্রমাণ হাজির করতে না পারায় রহস্যের মেঘ আরও ঘনীভূত হয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছাড়া এত বড় প্রাণহানির ঘটনা আর ঘটেনি। আজও ইউএসএস সাইক্লপসের সেই ৩০৯ জন নাবিকের পরিবার কোনো উত্তর পায়নি। তারা কি প্রকৃতির করাল গ্রাসের শিকার হয়েছিলেন, নাকি কোনো ষড়যন্ত্রের বলি হয়েছিলেন, অথবা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কিংবদন্তিই সত্যি? শতাধিক বছর পরেও এই প্রশ্নের উত্তর কেবলই অতলান্তিকের গভীর নীল জলে হারিয়ে গেছে। সাইক্লপসের গল্প তাই শুধু একটি নিখোঁজ জাহাজের কাহিনী নয়, এটি ইতিহাসের এক শীতল, অমীমাংসিত রহস্য, যা আজও আমাদের মনে শিহরণ জাগায়।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)