ঘটনার প্রেক্ষাপট
ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিক। দিল্লির মসনদে তখন অপ্রতিরোধ্য সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি, যার চোখে সারা হিন্দুস্তান জয়ের স্বপ্ন। অন্যদিকে, আরাবল্লী পাহাড়ের কোলে অবস্থিত মেবারের রাজধানী চিতোরগড় দুর্গ ছিল রাজপুতদের শৌর্য, বীরত্ব আর গর্বের প্রতীক। এই দুর্গের শাসক ছিলেন মহারানা রাওয়াল রতন সিং। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি স্ফুলিঙ্গের, আর সেই স্ফুলিঙ্গ ছিলেন রতন সিংয়ের অপরূপা স্ত্রী, রানী পদ্মাবতী।
লোকগাথা অনুযায়ী, রানী পদ্মাবতী ছিলেন সিংহল রাজকন্যা, যার সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতবর্ষে। বলা হয়, राघव चेतन নামক এক নির্বাসিত সভাসদ সুলতান খিলজির কাছে রানীর রূপের এমন বর্ণনা দেন, যা সুলতানের মনে রানীকে পাওয়ার এক দুর্দমনীয় লালসা জাগিয়ে তোলে। এই আকাঙ্ক্ষাই ভয়ঙ্কর এক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে, যা শুধুমাত্র দুটি রাজ্যের সংঘাত ছিল না, ছিল সম্মান ও মর্যাদার লড়াই।
রহস্যের জাল
১৩০৩ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে চিতোরগড় দুর্গ অবরোধ করেন। महीनों ধরে চলা এই অবরোধে যখন দুর্গের রসদ ফুরিয়ে আসতে শুরু করে, তখন খিলজি এক কূটচালের আশ্রয় নেন। তিনি প্রস্তাব দেন, যদি তাকে একবার রানী পদ্মাবতীর দর্শন করানো হয়, তবে তিনি অবরোধ তুলে নেবেন। राजपूतরা এই প্রস্তাবে রাজি না হলেও, মহারানা রতন সিং রক্তক্ষয় এড়াতে একটি মধ্যম পন্থা বের করেন। তিনি সুলতানকে আয়নায় রানীর প্রতিবিম্ব দেখানোর ব্যবস্থা করেন।
কিন্তু আয়নায় রানীর ছায়া দেখেই খিলজির লালসা আরও বেড়ে যায়। তিনি প্রতারণা করে রতন সিংকে বন্দী করেন এবং শর্ত দেন, রানী পদ্মাবতীকে তার শিবিরে পাঠালে তবেই রাজাকে মুক্তি দেওয়া হবে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে রাজপুতদের বীরত্ব ও রানীর বুদ্ধিমত্তা வெளிப்பட হয়। রানী খিলজির প্রস্তাবে রাজি হওয়ার অভিনয় করেন এবং পালকিতে করে নিজের পরিবর্তে সশস্ত্র সৈন্যদের পাঠিয়ে রাজাকে উদ্ধার করে আনেন।
এই ঘটনায় খিলজি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে দুর্গ আক্রমণের নির্দেশ দেন। রাজপুত সেনারা জানতেন, খিলজির বিশাল বাহিনীর সামনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু আত্মসমর্পণের চেয়ে মৃত্যুই তাদের কাছে শ্রেয় ছিল। তারা ‘সাকা’ পালনের সিদ্ধান্ত নেন, অর্থাৎ শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করা।
কিন্তু নারীদের ভাগ্যে কী ছিল? শত্রুর হাতে বন্দী হয়ে সম্মান হারানোর চেয়ে তারা এক ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেন। রানী পদ্মাবতীর নেতৃত্বে দুর্গের সমস্ত নারীরা ‘জহর ব্রত’ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ‘জহর’ হলো শত্রুর হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার আগে আত্মসম্মান রক্ষার্থে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করার এক প্রাচীন প্রথা।
সত্যের উন্মোচন
সেই ভয়াল রাতে চিতোরগড়ের বুকে জ্বলে উঠেছিল এক বিশাল চিতা। রানী পদ্মাবতী প্রায় ১৬,০০০ রাজপুত নারীকে সঙ্গে নিয়ে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিজেদের উৎসর্গ করেন। দুর্গের পুরুষেরা গেরুয়া বসন পরে বেরিয়ে পড়েন তাদের জীবনের শেষ যুদ্ধে এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন। আলাউদ্দিন খিলজি যখন বিজয়ী হিসেবে দুর্গে প্রবেশ করেন, তিনি কেবল পান এক শূন্য, ভুতুড়ে দুর্গ আর ছাইয়ের স্তূপ। তিনি রানীকে পাননি, পেয়েছিলেন শুধু তার ভস্ম।
যদিও রানী পদ্মাবতীর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এবং মালিক মুহম্মদ জায়সীর ১৫৪০ সালের মহাকাব্য ‘পদ্মাবত’-কেই এই কাহিনীর মূল উৎস হিসেবে ধরা হয়, চিতোরগড়ের এই জহর ব্রত রাজপুতদের আত্মত্যাগ, সম্মান ও প্রতিরোধের এক জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে ইতিহাসে রয়ে গেছে। এটি শুধু একটি পরাজয়ের কাহিনী নয়, বরং এটি অসম্মানজনক জীবনের ঊর্ধ্বে মৃত্যুকে বেছে নেওয়ার এক শিহরণ জাগানো উপাখ্যান। খিলজি দুর্গ জয় করেছিলেন, কিন্তু যে রত্নের জন্য তার এই অভিযান, তা তিনি কখনোই জয় করতে পারেননি। সেই আগুন আজও যেন রাজপুতনার বাতাসে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ও গর্বের ইতিহাস হয়ে মিশে আছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)