ঘটনার প্রেক্ষাপট
সাল ১৯৭০, ২৯শে নভেম্বর। নরওয়ের বার্গেন শহরের কাছে ইসদাল উপত্যকার (Isdalen Valley) গভীরে কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর পাথুরে নির্জনতা। এই উপত্যকাকে স্থানীয়রা মজা করে ‘মৃত্যু উপত্যকা’ বা ‘Death Valley’ বলেও ডাকত, কারণ মধ্যযুগে এখানে অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটত এবং বর্তমানেও পর্বতারোহীদের জন্য এটি ছিল বেশ বিপজ্জনক। সেই দিন সকালে এক অধ্যাপক তার দুই কিশোরী কন্যাকে নিয়ে হাইকিং করছিলেন। হঠাৎ করেই তারা এক বীভৎস দৃশ্যের সাক্ষী হলেন। পাথরের আড়ালে পড়ে আছে এক নারীর অর্ধনগ্ন, পুড়ে যাওয়া দেহ। তার মুখ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে চেনার কোনো উপায় ছিল না। শরীরের সামনের অংশ ভয়াবহভাবে দগ্ধ হলেও পিঠের দিক ছিল অক্ষত। দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো এক ভয়ঙ্কর অগ্নিপরীক্ষার শিকার হয়েছেন তিনি।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যা দেখল, তাতে রহস্য আরও ঘনীভূত হলো। মৃতদেহের চারপাশে কিছু জিনিসপত্র এমনভাবে সাজানো ছিল, যেন কোনো অদ্ভুত আচার বা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পুড়ে যাওয়া একটি ছাতা, কয়েকটি বোতল, একটি ঘড়ি এবং কিছু গয়না সেখানে পড়ে ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সমস্ত বোতলের লেবেল চেঁছে তুলে ফেলা হয়েছিল এবং পোশাকের সব ট্যাগ কেটে ফেলা হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ বা কারা যেন মরিয়া হয়ে এই নারীর পরিচয় পৃথিবীর কাছ থেকে লুকাতে চেয়েছে। পুলিশি তদন্তের প্রথম পদক্ষেপই এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়াল – এই নারী কে?
রহস্যের জাল
তদন্ত এগোতে থাকলে রহস্যের জাল আরও জটিল হতে শুরু করে। বার্গেন শহরের রেলওয়ে স্টেশনের লকার থেকে দুটি স্যুটকেস উদ্ধার করা হয়, যা এই নারীর বলে শনাক্ত করা হয়। স্যুটকেস খুলতেই তদন্তকারীরা হতবাক হয়ে যান। ভেতরে ছিল বিভিন্ন ধরনের পরচুলা, জামাকাপড়, মেকআপ, কয়েকটি নন-প্রেসক্রিপশন চশমা এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রা—নরওয়েজিয়ান, জার্মান, বেলজিয়ান, ব্রিটিশ এবং সুইস। পোশাকগুলোর সব ব্র্যান্ড লেবেল নিখুঁতভাবে কেটে ফেলা হয়েছিল।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর আবিষ্কারটি ছিল একটি নোটবুক, যার পাতায় পাতায় লেখা ছিল এক রহস্যময় কোড। গোয়েন্দারা দ্রুতই সেই কোডের পাঠোদ্ধার করেন এবং বুঝতে পারেন যে এটি আসলে তার ভ্রমণপথের একটি বিস্তারিত ডায়েরি। কোডগুলো বিভিন্ন তারিখ এবং স্থানের নাম নির্দেশ করছিল। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ জানতে পারে, এই নারী অন্তত নয়টি ভিন্ন নামে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করেছেন। 'ফেনেলা লর্চ', 'জেনেভিভ ল্যান্সিয়ার', 'ক্লডিয়া টিল্ট', 'এলিজাবেথ লিনহাউফার'—এরকম নানা পরিচয়ে তিনি বিভিন্ন হোটেলে থেকেছেন। প্রতিটি পরিচয়ের জন্য সম্ভবত তিনি আলাদা পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন, যদিও পোড়া একটি পাসপোর্টের কভার ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি।
হোটেলের কর্মচারীরা তাকে একজন ফ্যাশনেবল, সুন্দরী, এবং বহুভাষী নারী হিসেবে মনে রেখেছিলেন। তিনি জার্মান, ফ্লেমিশ এবং ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারতেন। কিন্তু তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক এবং সবসময় নিজের পরিচয় গোপন রাখতেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে নরওয়ে ছিল গুপ্তচরবৃত্তির এক উর্বর ক্ষেত্র। নরওয়ের গোপন সামরিক কার্যকলাপ এবং ন্যাটোর (NATO) গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর কারণে কেজিবি (KGB) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার চররা এখানে সক্রিয় ছিল। ইসদালের এই নারী কি তবে কোনো দেশের গুপ্তচর ছিলেন, যার মিশন ব্যর্থ হওয়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে?
অটোপসি রিপোর্টে জানা যায়, তার পেটে ৫০টিরও বেশি ঘুমের বড়ি পাওয়া গিয়েছিল এবং তার ফুসফুসে ধোঁয়ার কণা ছিল, যা প্রমাণ করে যে আগুন লাগার সময়েও তিনি জীবিত ছিলেন। তার মৃত্যু কি আত্মহত্যা ছিল, নাকি ঠান্ডা মাথায় খুন? পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা বলে মামলাটি দ্রুত বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আত্মহত্যা হলে কেউ নিজের পরিচয় মুছতে এত কষ্ট কেন করবে? পোশাকের ট্যাগ কাটা, আঙ্গুলের ছাপ নষ্ট করার চেষ্টা, একাধিক নকল পরিচয় তৈরি করা—এই সবকিছুই এক গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করে।
সত্যের উন্মোচন
নরওয়ে পুলিশ ১৯৭০ সালে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে বন্ধ করে দিলেও, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আজও থামেনি। বহু স্বাধীন গবেষক এবং সাংবাদিক মনে করেন, ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কোনো সংবেদনশীল তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই হয়তো তড়িঘড়ি করে তদন্ত শেষ করা হয়েছিল।
বছর পর বছর ধরে এই রহস্য মানুষের মনে বিস্ময় জাগিয়ে রেখেছে। ২০১৬ সালে মামলাটি নতুন করে খোলা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তার দাঁতের আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন যে তার শৈশব সম্ভবত জার্মানির নুরেমবার্গ অঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও কেটেছে এবং পরে তিনি ফ্রান্স বা তার সীমান্তবর্তী কোনো এলাকায় চলে যান। তার বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ছিল। তার ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হলেও, এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক কোনো ডেটাবেসের সঙ্গে তা মেলেনি।
কে ছিলেন এই নারী? তিনি কি সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি-র চর ছিলেন? নাকি ইসরায়েলের মোসাদের এজেন্ট? অথবা কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের সদস্য, যে তার অতীত থেকে পালাতে চেয়েছিল? নাকি তিনি শুধুই মানসিক ভারসাম্যহীন একজন নারী ছিলেন, যিনি এক অদ্ভুত উপায়ে নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন? অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ইসদাল উপত্যকার সেই নারীর পরিচয় আজও এক গভীর রহস্যের চাদরে ঢাকা। তার কবরটি পর্যন্ত নামহীন, শুধু একটি জিঙ্কের কফিনে তার দেহ সংরক্ষণ করা আছে, এই আশায় যে একদিন হয়তো তার আসল পরিচয় জানা যাবে এবং এই কাহিনীর শেষ অধ্যায় লেখা হবে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)