১৯০০ সালের এক হিমশীতল ডিসেম্বরের রাত। স্কটল্যান্ডের দূরবর্তী পশ্চিম উপকূলে, ‘আউটার হেব্রাইডস’-এর প্রান্তে অবস্থিত ফ্ল্যানান দ্বীপপুঞ্জ, যা স্থানীয়ভাবে ‘সাত শিকারি’ নামে পরিচিত। এখানকার সবচেয়ে বড় দ্বীপ, ‘আইলান ম্যুর’ (Eilean Mòr), একটি নির্জন, পাথুরে ভূমি, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যসঙ্গী। এই বুনো সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক সুউচ্চ বাতিঘর, সমুদ্রগামী জাহাজের পথপ্রদর্শক। কিন্তু সেই ডিসেম্বরের শেষ দিকে এই বাতিঘরে ঘটেছিল এমন এক রহস্যময় ঘটনা, যা শতাব্দী পেরিয়ে আজও এক অমীমাংসিত ধাঁধা হয়ে আছে। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি যেন প্রকৃতির গভীর থেকে উঠে আসা এক চাপা আর্তনাদ, যা মানুষের কল্পনাকে আজও আচ্ছন্ন করে রাখে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালের ডিসেম্বরে ফ্ল্যানান দ্বীপের বাতিঘরটি প্রথম প্রজ্জ্বলিত হয়। এটি স্কটল্যান্ডের উপকূলকে বিপদসংকুল পথ থেকে রক্ষা করার জন্য অত্যাবশ্যক ছিল। এই নির্জন বাতিঘরের দায়িত্বে থাকতেন তিনজন প্রহরী, যারা পনেরো দিনের পালা করে কাজ করতেন। ১৯০০ সালের শেষ ভাগে, বাতিঘরের প্রধান প্রহরী ছিলেন অভিজ্ঞ জেমস ডিউকেট (James Ducat), তার সাথে ছিলেন থমাস মার্শাল (Thomas Marshall) এবং উইলিয়াম রস অসুস্থ থাকায় তার স্থলাভিষিক্ত অস্থায়ী প্রহরী ডোনাল্ড ম্যাকআর্থার (Donald McArthur)। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, দায়িত্বশীল সমুদ্রচারী। জোসেফ মুর (Joseph Moore) নামে চতুর্থ একজন প্রহরী তখন মূল ভূখণ্ডে ছুটিতে ছিলেন।
আইলান ম্যুর দ্বীপটি নিজেই রহস্যে ঘেরা ছিল। এর খাড়া ক্লিফ, প্রলয়ংকরী ঢেউ আর নিরন্তর বাতাসের করাল গ্রাস দ্বীপটিকে এক ভুতুড়ে রূপ দিত। স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ছিল নানা কুসংস্কারের গল্প, যা দ্বীপের নির্জনতাকে আরও গভীর করত। বাতিঘরের প্রহরীদের জীবন ছিল একঘেয়ে ও কঠোর, যেখানে প্রকৃতিই ছিল তাদের একমাত্র সঙ্গী। প্রতিটি ঢেউ যেন কোনো গোপন বার্তা নিয়ে আসত, প্রতিটি বাতাসের ফিসফিসানি যেন কোনো প্রাচীন গল্পের সূচনা করত। এই পরিবেশেই প্রহরীরা তাদের দৈনন্দিন কাজ করে যেতেন, প্রতিটি রাতের আলো জ্বালিয়ে রাখা ছিল তাদের প্রধান কর্তব্য।
রহস্যের জাল
১৫ ডিসেম্বর, ১৯০০। ফিলাডেলফিয়া থেকে লেইথগামী স্টিমার ‘আর্কটর’ (Archtor) ফ্ল্যানান দ্বীপপুঞ্জের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করে যে বাতিঘরটি জ্বলছে না। তাদের লগবুকে এই অস্বাভাবিক ঘটনাটি নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে এই খবর ‘নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ড’-এ পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়। এরপর ২০ ডিসেম্বর, নিয়মিত ত্রাণকারী জাহাজ ‘হেসপেরাস’ (Hesperus) যাত্রা করার কথা থাকলেও, বিধ্বংসী ঝড়ের কারণে সেটি আটকা পড়ে। অবশেষে, প্রায় এক সপ্তাহ পর, ২৬ ডিসেম্বর, ‘বক্সিং ডে’-এর দুপুরে জাহাজটি আইলান ম্যুর দ্বীপে পৌঁছায়।
ক্যাপ্টেন জিম হার্ভি (Jim Harvie) জাহাজের হর্ন বাজান এবং সংকেত রকেট ছোঁড়েন, কিন্তু বাতিঘর থেকে কোনো সাড়া আসে না। কোনো পতাকা ওড়ানো ছিল না এবং তীরে নামানোর জন্য কোনো সরবরাহের বাক্সও প্রস্তুত ছিল না, যা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক ছিল। এক গভীর উদ্বেগ নিয়ে ত্রাণকারী প্রহরী জোসেফ মুর একা একটি ছোট নৌকা নিয়ে তীরে নামেন। দ্বীপের পাথুরে পথ বেয়ে বাতিঘরের দিকে এগোতে থাকেন তিনি। বাতাস আর সমুদ্রের শব্দ ছাড়া আর কোনো কিছু শোনা যাচ্ছিল না। এক অদ্ভুত নীরবতা যেন গোটা দ্বীপকে গ্রাস করে ছিল।
মুর বাতিঘরের প্রবেশদ্বার এবং প্রধান দরজা বন্ধ অবস্থায় দেখতে পান। ভেতরে ঢুকে তিনি এক হিমশীতল দৃশ্যের মুখোমুখি হন। প্রহরীদের থাকার ঘরটি ছিল জনমানবহীন। বিছানাগুলো ছিল অগোছালো, যেন সকালে তাড়াহুড়ো করে ছেড়ে যাওয়া হয়েছে। রান্নাঘরের ঘড়িটা থেমে ছিল। একটি খাবার প্রস্তুত করা ছিল, যা অস্পৃশ্য রয়ে গেছে, যেন মাঝপথেই কেউ উঠে চলে গেছে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, তিনটি অয়েলস্কিনের মধ্যে একটি দেওয়ালে ঝুলছিল, কিন্তু বাকি দু'টি উধাও ছিল। বাইরে যখন প্রবল ঝড় হচ্ছিল, তখন একজন প্রহরী কেন তার অয়েলস্কিন ছাড়াই বাইরে যাবেন, তা ছিল এক রহস্য। একমাত্র জীবন্ত প্রাণী ছিল একটি খাঁচায় থাকা ক্যানারি পাখি, যা নীরব দর্শকের মতো বসে ছিল।
লগবুক পরীক্ষা করে মুর দেখেন যে, শেষ এন্ট্রিটি করা হয়েছিল ১৩ ডিসেম্বর। এর পরের কয়েকটি এন্ট্রি একটি স্লেটে লেখা ছিল, কিন্তু মূল লগবুকে তোলা হয়নি। কিছু কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে, প্রহরীরা অস্বাভাবিক লগ এন্ট্রি করেছিলেন, যেখানে ১৫ ডিসেম্বরের আগে কয়েক দিনের 'প্রচণ্ড ঝড়'-এর কথা লেখা ছিল, যা ২০ বছরেও দেখা যায়নি। তাতে নাকি ডিউকেটকে 'খুব শান্ত' এবং ম্যাকআর্থারকে 'কাঁদতে' দেখা গিয়েছিল, এবং সবাই 'প্রার্থনা' করছিলেন। কিন্তু পরে তদন্তে জানা যায় যে, ওই সময়ে আশেপাশে কোনো ঝড়ের খবর ছিল না এবং এই লগ এন্ট্রিগুলি সম্ভবত গল্পকে নাটকীয় করার জন্য পরে যোগ করা হয়েছিল বা অতিরঞ্জিত ছিল।
পুরো দ্বীপ তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো। পশ্চিম দিকের ল্যান্ডিং স্টেজে (যেখানে জাহাজ থেকে জিনিসপত্র নামানো হতো) ব্যাপক ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘাস ছিঁড়ে উপড়ে ফেলা হয়েছিল, একটি সরবরাহ বাক্স ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল এবং লোহার রেলিংগুলি বেঁকে গিয়েছিল। দেখে মনে হচ্ছিল যেন বিশাল কোনো ঢেউ আছড়ে পড়েছিল সেখানে। কিন্তু প্রহরীদের কোনো চিহ্নই পাওয়া যায়নি – কোনো দেহ নয়, কোনো ধ্বংসাবশেষ নয়, যেন তারা বাতাসে মিলিয়ে গেছেন।
সত্যের উন্মোচন
এই রহস্যময় অন্তর্ধানের ঘটনাটি দ্রুত স্কটল্যান্ড জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণের কল্পনার খোরাক যোগায়। ২৯ ডিসেম্বর, ‘নর্দার্ন লাইটহাউস বোর্ড’-এর সুপারিন্টেন্ডেন্ট রবার্ট মুইরহেড (Robert Muirhead) একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেন। তিনি নিখোঁজ প্রহরীদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। মুইরহেড বাতিঘরের পরিস্থিতি এবং পাওয়া সূত্রগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন। তার চূড়ান্ত উপসংহার ছিল যে, প্রহরীরা সম্ভবত পশ্চিম ল্যান্ডিং স্টেজের কাছে কোনো সরঞ্জাম সুরক্ষিত করার চেষ্টা করার সময় এক বিশাল 'রগ ওয়েভ' বা আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়ে সমুদ্রে ভেসে গেছেন।
একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, মার্শাল এবং ডিউকেট হয়তো কোনো জরুরি সরঞ্জাম সুরক্ষিত করতে নিচে নেমেছিলেন, যা সম্ভবত জরিমানা এড়াতে তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ম্যাকআর্থার বাতিঘরের ভেতরে ছিলেন, কিন্তু বাইরে বিপদ দেখে তিনি দ্রুত তার অয়েলস্কিন ছাড়াই তাদের সাহায্য করতে ছুটে যান এবং তিনিও ঢেউয়ের শিকার হন। পশ্চিম ল্যান্ডিংয়ের ব্যাপক ক্ষতি এই তত্ত্বকে সমর্থন করে। সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন এবং ‘জিও’ (geos) নামক গভীর খাদগুলি বিশাল ঢেউয়ের প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে যা ৬০ মিটার উঁচু ক্লিফের উপর পর্যন্ত জল ছিটিয়ে দিতে পারত।
তবে, এই ব্যাখ্যা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। কেন একটি খাবার প্রস্তুত অবস্থায় পড়ে ছিল? কেন একজন প্রহরী তার অয়েলস্কিন ছাড়া ঝড়ের মধ্যে বের হবেন? এই প্রশ্নগুলি আজও বিতর্কের জন্ম দেয়। অন্যান্য তত্ত্বগুলির মধ্যে ছিল: প্রহরীদের মধ্যে মারামারি বা মনোমালিন্য, যেখানে ম্যাকআর্থারের মেজাজ খারাপ হওয়ার প্রবণতা উল্লেখ করা হয়েছিল। কেউ কেউ আরও উদ্ভট ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যেমন: সমুদ্র দানব দ্বারা আক্রমণ, গুপ্তচরদের দ্বারা অপহরণ, বা এমনকি অতিপ্রাকৃত ঘটনা। কিন্তু কোনোটিই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়নি।
ফ্ল্যানান দ্বীপের বাতিঘরের প্রহরীদের অন্তর্ধান স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে এক স্থায়ী রহস্য হয়ে আছে। তাদের দেহগুলি কখনোই পাওয়া যায়নি, এবং তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা আজও অজানা। এই ঘটনাটি অসংখ্য বই, কবিতা, গান এবং চলচ্চিত্রকে অনুপ্রাণিত করেছে, যার মধ্যে ২০১৮ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য ভ্যানিশিং’ অন্যতম। ১৯৭১ সালে বাতিঘরটি স্বয়ংক্রিয় করা হয় এবং এরপর থেকে সেখানে আর কোনো প্রহরীর প্রয়োজন হয়নি। আইলান ম্যুর দ্বীপ আজও সেই রহস্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার নীরব সৈকতে ঢেউয়ের আনাগোনা আর বাতাসের ফিসফিসানি যেন আজও নিখোঁজ প্রহরীদের গল্প বলে যায়। প্রকৃতির রুক্ষতা এবং মানুষের অসহায়তা – এই দুইয়ের মাঝে ফ্ল্যানান দ্বীপের বাতিঘরের রহস্য ইতিহাসের পাতায় এক অন্ধকার অধ্যায় হয়ে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)