ভালোবাসা যে কত অদ্ভুত আর সুন্দর হতে পারে, তার প্রমাণ আমরা প্রকৃতির কাছে বারবার পাই। কখনও পাখিরা গান গেয়ে মন জয় করে, আবার কখনও পোকামাকড়রা অভিনব নাচ দেখিয়ে সঙ্গীকে আকর্ষণ করে। কিন্তু যদি বলি, এমনও এক প্রেমিক আছে যে তার ভালোবাসার জন্য সমুদ্রের নিচে বালি দিয়ে আস্ত একখানা 'আল্পনা' বা 'ম্যানডালা' এঁকে ফেলে? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই সত্যি!

ভাবুন তো, কোনো এক শিল্পী দিনের পর দিন, অক্লান্ত পরিশ্রম করে, শুধু তার মনের মানুষের জন্য একটা নিখুঁত শিল্পকর্ম তৈরি করছে। এই গল্পটা তেমনই এক শিল্পীর, যে আসলে একটা মাছ। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, একটা মাছ!

সমুদ্রের তলার শিল্পী: হোয়াইট-স্পটেড পাফারফিশ

আমাদের গল্পের নায়ক হলো 'হোয়াইট-স্পটেড পাফারফিশ' (White-spotted pufferfish)। মাত্র পাঁচ ইঞ্চি লম্বা এই পুঁচকে মাছটি ভালোবাসার জন্য যা করে, তা শুনলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের কাছে সমুদ্রের গভীরে এদের বাস। ১৯৯৫ সাল থেকে ডুবুরিরা সমুদ্রের নিচে বালির উপর অদ্ভুত সুন্দর জ্যামিতিক নকশা দেখতে পাচ্ছিলেন। প্রায় দুই দশক ধরে এই রহস্যের কোনো সমাধান ছিল না। কে বা কারা তৈরি করছে এই 'আন্ডারওয়াটার ক্রপ সার্কেল'? অবশেষে ২০১৩ সালে এই রহস্যের সমাধান হয়। দেখা যায়, এই অসাধারণ শিল্পকর্মের কারিগর আর কেউ নয়, আমাদের ছোট্ট পাফারফিশ।

এই পুরুষ পাফারফিশ তার সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করার জন্য, প্রায় সাত থেকে নয় দিন ধরে, নিজের শরীর ও পাখনা ব্যবহার করে সমুদ্রের নিচে বালির উপর প্রায় সাত ফুট ব্যাসের এক বিশাল এবং নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা তৈরি করে।

এই কাজটি মোটেই সহজ নয়। পুরুষ মাছটি একটানা, দিনরাত পরিশ্রম করে তার পাখনা দিয়ে বালিতে খাঁজ কেটে কেটে এই অপূর্ব নকশা ফুটিয়ে তোলে। সমুদ্রের স্রোত বারবার তার শিল্পকর্মকে নষ্ট করে দিতে চায়, কিন্তু প্রেমিক নাছোড়বান্দা। সে ক্রমাগত নকশাটিকে মেরামত করতে থাকে। শুধু তাই নয়, নকশাটি আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সে বাইরে থেকে শামুক, ঝিনুকের টুকরো আর প্রবালের কুচি এনে তার চারপাশে সাজিয়ে দেয়। নকশার মাঝখানের অংশে সে একদম মিহি বালি এনে জড়ো করে, যাতে তার সঙ্গিনীর ডিম পাড়তে সুবিধা হয়।

কিন্তু কেন এত খাটুনি? কারণ, নারী পাফারফিশরা ভীষণ খুঁতখুঁতে। তারা চারপাশ ঘুরে সবচেয়ে সুন্দর এবং নিখুঁত নকশাটিকেই নিজেদের বাসা হিসেবে বেছে নেয়। যার শিল্পকর্ম যত সুন্দর, তার সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। নারী পাফারফিশ যখন কোনো একটি শিল্পকর্ম পছন্দ করে, তখন সে নকশার ঠিক মাঝখানে এসে শিল্পীকে তার সম্মতির কথা জানায়।

প্রেমের সফলতার পর, নারী মাছটি সেখানে ডিম পেড়ে চলে যায়। কিন্তু পুরুষের কাজ এখানেই শেষ নয়। আগামী প্রায় ছয়-সাত দিন, সেই পুরুষ মাছটি একাই সেই ডিমগুলোকে পাহারা দেয়, যতক্ষণ না সেগুলো ফুটে বাচ্চা বেরোয়। এই পুরো সময়টায় সে তার ভাংতে থাকা শিল্পকর্মের আর কোনো যত্ন নেয় না, কারণ তার একমাত্র চিন্তা তখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে। আরও মজার ব্যাপার হলো, এই শিল্পী একবার ব্যবহারের পর তার শিল্পকর্ম আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করে না। প্রতিবার নতুন করে, নতুন উদ্যমে সে আবার ভালোবাসার নতুন 'আল্পনা' তৈরি করে।

কি ভাবছেন? মানুষই শুধু ভালোবাসার জন্য তাজমহল গড়তে পারে? এই ছোট্ট পাফারফিশটি হয়তো তাজমহল গড়তে পারে না, কিন্তু তার ভালোবাসার এই বালির রাজত্ব কোনো অংশে কম নয়। পরেরবার যখন ভালোবাসার নিদর্শন নিয়ে ভাববেন, তখন সমুদ্রের তলার এই ছোট্ট, কিন্তু মহান শিল্পীর কথাটাও একবার মনে করবেন।