ঘটনার প্রেক্ষাপট
আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর আগের কথা। মেক্সিকোর পাজকুয়ারো হ্রদের ধারে তখন এক পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের বিস্তার। নাম তারাস্কান সাম্রাজ্য, যা ইতিহাসে পিউরেপেচা নামেও পরিচিত। তাদের রাজধানী ছিল জিনজুন্টজান, যার অর্থ ‘হামিংবার্ডদের স্থান’। অ্যাজটেকদের চিরশত্রু এই তারাস্কানরা ছিল দক্ষ воин, শিল্পী আর স্থপতি। তাদের গড়া পাথরের বিশাল পিরামিড ‘ইয়াকাটাস’ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এই ইয়াকাটাসগুলো ঠিক পিরামিডের মতো দেখতে ছিল না, বরং ছিল গোলাকার ভিত্তির উপর তৈরি লম্বাটে মঞ্চের মতো। এগুলো ছিল তাদের মন্দির, তাদের উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু এর চেয়েও বড় রহস্য লুকিয়ে ছিল এই কাঠামোগুলোর গভীরে। লোককথা অনুযায়ী, এই ইয়াকাটাসগুলোর নিচেই ছিল তারাস্কান রাজাদের সমাধি, যেখানে তাদের শেষ বিশ্রামের জন্য শোয়ানো হতো। প্রজারা বিশ্বাস করত, তাদের রাজারা মৃত্যুর পরেও এই পবিত্র স্থান থেকে তাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু ইতিহাস অন্য এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনে রেখেছিল।
রহস্যের জাল
বিংশ শতাব্দীর প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যখন জিনজুন্টজানের এই রহস্যময় ইয়াকাটাসগুলো খনন করা শুরু করলেন, তখন তারা এক অবিশ্বাস্য দৃশ্যের মুখোমুখি হলেন। তারা ভেবেছিলেন, মিশরের ফারাওদের মতো বা মায়া সভ্যতার রাজাদের মতোই এখানেও খুঁজে পাওয়া যাবে রাজকীয় সমাধি, সোনায় মোড়ানো শবাধার আর অমূল্য সব ধনরত্ন।
খননकार्य যতই এগোতে থাকল, ততই প্রত্নতাত্ত্বিকদের বিস্ময় বাড়ছিল। তারা সমাধির চিহ্ন খুঁজে পেলেন। সুসজ্জিত ঘর, মূল্যবানข้าวপত্র, সোনার গহনা, পাথরের মূর্তি – সবই ছিল। এগুলি প্রমাণ দিচ্ছিল যে এখানে সত্যিই কাউকে সমাধিস্থ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যা ছিল না, তা হলো খোদ রাজার দেহ! একটিও কঙ্কাল, বা মমির চিহ্নমাত্রও পাওয়া গেল না।
যেন রাজারা মৃত্যুর পর বাতাসে মিলিয়ে গেছেন! একটা-দুটো নয়, ইয়াকাটাসের নিচের প্রতিটি রাজকীয় সমাধি ছিল সম্পূর্ণ খালি। কে বা কারা সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রাজাদের দেহ? কেনই বা সরিয়েছিল?
এই আবিষ্কার এক ভয়ঙ্কর প্রশ্ন তৈরি করল। অ্যাজটেকদের মতো দুর্ধর্ষ শত্রুরাও তারাস্কান সাম্রাজ্য জয় করতে পারেনি। তাহলে কি বাইরের কোনো শত্রু এই কাজ করেছিল? কিন্তু সমাধির কোনো জিনিস চুরি যায়নি, শুধু দেহগুলোই অদৃশ্য। কোনো লুঠের চিহ্নও নেই। তাহলে কি এটা তারাস্কানদেরই কোনো গোপন প্রথা ছিল? তারা কি মৃত্যুর পর রাজাদের দেহ অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখত? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর, আরও অলৌকিক কোনো রহস্য?
সত্যের উন্মোচন
ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই শূন্য সমাধির রহস্য নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা করেছেন। কিন্তু কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে কয়েকটি তত্ত্ব উঠে এসেছে, যা এই অদ্ভুত ঘটনার একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে।
সবচেয়ে জোরালো তত্ত্বটি হলো, এটি ছিল এক ধরনের ‘প্রতীকী সমাধি’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, তারাস্কানরা হয়তো তাদের রাজাদের দেহ মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলত। তারপর সেই চিতাভস্ম কোনো পবিত্র স্থানে, যেমন পাজকুয়ারো হ্রদের জলে বা কোনো গোপন গুহায় ছড়িয়ে দেওয়া হতো। আর ইয়াকাটাসের নিচের এই জমকালো সমাধিগুলো তৈরি করা হতো শুধুমাত্র রাজার আত্মাকে সম্মান জানানোর জন্য। দেহ না থাকলেও, তারা বিশ্বাস করত রাজার আত্মা এখানেই বাস করে এবং তাদের সাম্রাজ্যকে রক্ষা করে।
অন্য একটি তত্ত্ব বলছে, স্প্যানিশ হানাদারদের হাত থেকে রাজাদের দেহকে রক্ষা করার জন্য তারাস্কান পুরোহিতরা হয়তো গোপনে সেগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন। তারা জানতেন, স্প্যানিশরা সমাধিস্থল অপবিত্র করতে পারে, তাই তারা তাদের পবিত্র রাজাদের দেহাবশেষকে বাঁচানোর জন্য এই চরম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু যদি তাই হবে, তাহলে সেই দেহগুলো কোথায় গেল? সেই গোপন স্থান আজও এক বিরাট রহস্য।
কোনো কোনো লোককথায় এমনও শোনা যায় যে, তারাস্কান রাজারা নাকি সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তারা ছিলেন ‘দেবতার বংশধর’ এবং মৃত্যুর পর তারা নাকি স্বর্গে ফিরে যেতেন, তাই তাদের পার্থিব দেহের কোনো অস্তিত্ব থাকত না।
আজও জিনজুন্টজানের ইয়াকাটাসগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শূন্য সমাধিগুলো এক অমীমাংসিত প্রশ্ন ছুড়ে দেয় – কোথায় হারিয়ে গেল এক পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের শাসকেরা? উত্তরটা হয়তো সময়ের অতলে চিরতরে হারিয়ে গেছে, রেখে গেছে শুধু এক শিহরণ জাগানো ঐতিহাসিক রহস্য।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)