ঘটনার প্রেক্ষাপট
সময়টা ১৯৬৮ সাল। শীতল যুদ্ধের পারদ তখন ঊর্ধ্বমুখী। সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলছে এক নীরব কিন্তু ভয়ঙ্কর স্নায়ুযুদ্ধ। আটলান্টিকের হিমশীতল জলের নিচে নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন, একে অপরের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। ঠিক এমনই এক সময়ে, মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব, ইউএসএস স্করপিয়ন (এসএসএন-৫৮৯) নামের পারমাণবিক সাবমেরিনটি তার ৯৯ জন নাবিককে নিয়ে এক গোপন মিশনে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাত্রা করে।
স্করপিয়ন ছিল তার সময়ের অন্যতম সেরা এক শিকারি। ‘স্কিপজ্যাক’ ক্লাসের এই সাবমেরিনটি ছিল দ্রুত, নিঃশব্দ এবং বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন। এর প্রধান কাজই ছিল সোভিয়েত সাবমেরিন এবং জাহাজগুলোর গতিবিধির উপর নজর রাখা। ফেব্রুয়ারিতে ভার্জিনিয়ার নরফোক নৌঘাঁটি থেকে যখন এটি যাত্রা শুরু করে, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে এটিই তার অন্তিম যাত্রা হতে চলেছে। নাবিকদের পরিবার অধীর আগ্রহে তাদের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছিল।
অভিযান সফলভাবে শেষ করে স্করপিয়ন ফিরতি পথ ধরেছিল। ২১শে মে, ১৯৬৮, সাবমেরিনটি শেষবারের মতো কন্ট্রোল রুমে একটি রেডিও বার্তা পাঠায়। কমান্ডার ফ্রান্সিস স্ল্যাটারির পাঠানো সেই বার্তায় বলা হয়েছিল, সবকিছু স্বাভাবিক এবং তারা ২৭শে মে নরফোকে পৌঁছাবে। কিন্তু সেই বার্তাটিই ছিল অতলান্তিকের বুক থেকে ভেসে আসা শেষ কণ্ঠস্বর। এরপরই নেমে আসে এক রহস্যময়, জমাট বাঁধা নীরবতা। স্করপিয়ন আর তার ৯৯ জন নাবিক যেন অতলান্তিকের অতল গভীরে কোথাও হারিয়ে গেল।
রহস্যের জাল
নির্দিষ্ট দিনে যখন স্করপিয়ন বন্দরে ভিড়ল না, তখন মার্কিন নৌবাহিনীর সদর দফতরে উদ্বেগের ছায়া নেমে আসে। শুরু হয় নৌবাহিনীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অনুসন্ধান অভিযান। বিমান, জাহাজ, এবং অন্যান্য সাবমেরিন দিয়ে চিরুনি তল্লাশি চালানো হতে থাকে আটলান্টিকের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে গেলেও স্করপিয়নের কোনো চিহ্নই পাওয়া যাচ্ছিল না।
অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ মাস পর, ১৯৬৮ সালের অক্টোবরের শেষে, আজোরস দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ৭৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, সমুদ্রের প্রায় ১০,০০০ ফুট গভীরে স্করপিয়নের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মেলে। সমুদ্রের তলদেশে তোলা ছবিগুলো ছিল ভয়ঙ্কর। সাবমেরিনটি আক্ষরিক অর্থেই দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল। এর কাঠামোটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, যেন কোনো প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক চাপে এটি কাগজের মতো ভেঙে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানেই আরও ঘনীভূত হয় – কী এমন ঘটেছিল যার ফলে একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক সাবমেরিনের এই পরিণতি হতে পারে?
তদন্ত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই একাধিক তত্ত্ব উঠে আসতে শুরু করে, যা এই ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তোলে:
১. টর্পেডোর অভিশাপ: সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘হট-রান’ টর্পেডো। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাবমেরিনের টিউবের ভেতরে থাকা মার্ক-৩৭ টর্পেডোগুলোর কোনো একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় এবং সেটি টিউবের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজের টর্পেডোই যখন নিজের দিকে ধেয়ে আসে, তখন নাবিকদের আর কিছুই করার থাকে না। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, টর্পেডোটি সাবমেরিনের ভেতরেই বিস্ফোরিত হয়, অথবা লঞ্চ হওয়ার পর ঘুরে এসে নিজের সাবমেরিনকেই আঘাত করে।
২. ব্যাটারির বিস্ফোরণ: আরেকটি শক্তিশালী তত্ত্ব হলো সাবমেরিনের বিশাল ব্যাটারি কক্ষে হাইড্রোজেন গ্যাসের বিস্ফোরণ। ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন হয় এবং কোনো কারণে সেই গ্যাস জমে গেলে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। নৌবাহিনীর গোপন অনুসন্ধানী দল এমন দুটি ছোট বিস্ফোরণের শব্দ সনাক্ত করেছিল, যা এই তত্ত্বকে সমর্থন করে।
৩. সোভিয়েত ষড়যন্ত্র: শীতল যুদ্ধের সেই উত্তপ্ত আবহে ষড়যন্ত্রের তত্ত্বটি ছিল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আতঙ্কজনক। অনেকেই বিশ্বাস করেন, স্করপিয়নকে সোভিয়েত নৌবাহিনী পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে ডুবিয়ে দিয়েছে। এই তত্ত্বের সমর্থকদের মতে, ১৯৬৮ সালে স্করপিয়নসহ মোট চারটি সাবমেরিন রহস্যজনকভাবে সমুদ্রে হারিয়ে যায়, যার মধ্যে একটি ছিল সোভিয়েত সাবমেরিন কে-১২৯। তাদের ধারণা, নিজেদের সাবমেরিন হারানোর প্রতিশোধ নিতেই সোভিয়েতরা স্করপিয়নকে টর্পেডো হামলা করে ধ্বংস করে দিয়েছিল। যদিও এই তত্ত্বের স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি, এটি আজও রহস্যের অন্যতম একটি দিক।
৪. যান্ত্রিক ত্রুটি: কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সাবমেরিনটির আবর্জনা নিষ্কাশন ব্যবস্থায় (Trash Disposal Unit) মারাত্মক ত্রুটি ছিল, যা থেকে জল ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং শর্ট সার্কিট থেকে বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ক্যাপ্টেন নিজেও সাবমেরিনের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন এবং জরুরি মেরামতির আবেদন জানিয়েছিলেন। অনেকে স্করপিয়নকে মজা করে ‘ইউএসএস স্ক্র্যাপআয়রন’ বা ভাঙা লোহার জাহাজ বলেও ডাকত।
সত্যের উন্মোচন
মার্কিন নৌবাহিনীর আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি বছরের পর বছর ধরে তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করেও কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, “স্করপিয়নের ধ্বংসের সঠিক কারণ налич প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।” এই অস্পষ্টতাই রহস্যকে জিইয়ে রেখেছে। নৌবাহিনী যদিও অভ্যন্তরীণ বিস্ফোরণের (টর্পেডো বা ব্যাটারি) তত্ত্বের দিকেই বেশি ঝুঁকেছিল, কিন্তু কোনো কিছুই তারা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
আজও, ইউএসএস স্করপিয়নের ধ্বংসাবশেষ আটলান্টিকের গভীরে শায়িত আছে, সাথে তার পারমাণবিক চুল্লি এবং অস্ত্রশস্ত্র। এটি ৯৯ জন সাহসী নাবিকের এক শীতল সমাধি, যারা শীতল যুদ্ধের এক নীরব শিকার হয়েছিলেন। তাদের শেষ মুহূর্তগুলো কেমন ছিল? তারা কি কোনো বিপদের আঁচ পেয়েছিলেন? নাকি মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও সেই গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে চিরতরে হারিয়ে গেছে।
স্করপিয়নের পরিণতি কি নিছকই এক দুর্ঘটনা, নাকি শীতল যুদ্ধের এক গোপন ও रक्तरंजিত অধ্যায়ের অংশ? এই রহস্যের ওপর থেকে হয়তো কোনোদিনই পর্দা উঠবে না। ৯৯ জন নাবিকের সেই অন্তিম যাত্রা আজও ইতিহাসের এক অন্যতম অমীমাংসিত এবং শিহরণ জাগানো রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)