প্রেমপত্র! শব্দটা শুনলেই কেমন যেন বুকের ভেতরটা করে ওঠে, তাই না? একটা সময় ছিল যখন নীল খামে ভরা চিঠিতেই বন্দি থাকতো কত না বলা কথা, কত অনুভূতি। যুগ বদলেছে, এখন মেসেজের ইনবক্সেই ভালোবাসার আসা-যাওয়া। কিন্তু যদি বলি, এমন এক প্রেমপত্র আছে যা কোনো ইনবক্স বা খামে নয়, বরং মহাকাশের ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে? শুধু তাই নয়, সেই চিঠি আজও অনন্ত মহাকাশের গভীরে ভেসে বেড়াচ্ছে! আজ শোনাবো তেমনই এক অবিশ্বাস্য ভালোবাসার গল্প, যা পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে তারাদের দেশে।
প্রেমপত্র, কিন্তু ঠিকানা? মহাকাশের অনন্ত শূন্যতা!
ঘটনাটা ১৯৭৭ সালের। পৃথিবী থেকে দুটি মহাকাশযান, ভয়েজার ১ এবং ভয়েজার ২, পাড়ি দিয়েছিল এক অকল্পনীয় যাত্রায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহগুলোর ছবি তোলা এবং তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু এর সাথে ছিল আরও এক অদ্ভুত সুন্দর উদ্দেশ্য। এই মহাকাশযান দুটির প্রত্যেকটিতে একটি করে সোনার রেকর্ড বা 'গোল্ডেন রেকর্ড' জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ভাবছেন, কেন? আসলে, এটি ছিল মহাজাগতিক এক bouteille à la mer বা বোতলে ভরা বার্তা। যদি কোনো বুদ্ধিমান ভিনগ্রহের প্রাণী কোনোদিন এর খোঁজ পায়, তারা যেন জানতে পারে আমাদের এই ছোট্ট সবুজ গ্রহ আর তার বাসিন্দাদের কথা।
এই রেকর্ডে ছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের অভিবাদন, পৃথিবীর নানা প্রাকৃতিক শব্দ, আর পৃথিবীর সেরা কিছু সঙ্গীত। কিন্তু এই সবকিছুর আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গোপন সংকেত, যা ছিল pure, unadulterated love - নিখাদ ভালোবাসা। আর এখানেই গল্পের আসল মজা!
১৯৭৭ সালে মহাকাশে পাঠানো ভয়েজার মহাকাশযানে ছিল একটি সোনালী রেকর্ড, যেখানে পৃথিবীর নানা শব্দের সাথে রেকর্ড করা হয়েছিল প্রেমে পড়া এক তরুণীর মস্তিষ্কের তরঙ্গ!
হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! এই গোল্ডেন রেকর্ডের শব্দ সম্ভারের মধ্যে এক ঘণ্টার একটি অডিও ফাইল আছে, যা আসলে এক নারীর মস্তিষ্কের EEG বা ব্রেইনওয়েভের রেকর্ডিং। আর সেই নারী তখন গভীরভাবে প্রেমে পড়েছিলেন। ভাবা যায়, ভালোবাসার অনুভূতি, যা কিনা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে বয়ে চলা বৈদ্যুতিক সংকেত মাত্র, তাকেই অমর করে পাঠানো হয়েছে মহাবিশ্বের দরবারে!
এই গল্পের নায়িকার নাম অ্যান ড্রুয়ান (Ann Druyan), আর নায়কের নাম কিংবদন্তী জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান (Carl Sagan)। কার্ল সেগান ছিলেন এই গোল্ডেন রেকর্ড প্রজেক্টের প্রধান। আর অ্যান ড্রুয়ান ছিলেন এই প্রজেক্টের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। পৃথিবীর সেরা শব্দগুলো বাছাই করার এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই একে অপরের প্রেমে পড়েন তারা। তাদের প্রেমটা ছিল কাজের মতোই সুন্দর আর গভীর।
রেকর্ডিংয়ের মাত্র দু'দিন আগে, এক ফোনালাপে কার্ল আর অ্যান একে অপরকে তাদের ভালোবাসার কথা জানান এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক তার পরেই আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। অ্যানের মাথায় আসে এক দারুণ বুদ্ধি। তিনি প্রস্তাব দেন, মানুষের চিন্তাভাবনা কতটা জটিল আর সুন্দর তা বোঝানোর জন্য একজনের মস্তিষ্কের তরঙ্গ রেকর্ড করে পাঠানো যেতে পারে। কার্ল সেগান সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান এবং এই কাজের জন্য অ্যানকেই বেছে নেন।
রেকর্ডিংয়ের দিন অ্যান মেডিটেশন করেন। তিনি পৃথিবীর ইতিহাস, মানব সভ্যতার উত্থান-পতন, শিল্পের মহত্ব—এমন অনেক কিছু নিয়ে ভাবেন। কিন্তু তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটিই অনুভূতি - কার্ল সেগানের জন্য তার ভালোবাসা। তিনি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমার ২৭ বছর বয়সে疯狂 প্রেমে পড়ার অনুভূতিগুলো ওই রেকর্ডে আছে। এটা চিরন্তন। ১০০ মিলিয়ন বছর পরেও এটা সত্যি থাকবে।"
তাই, আজ থেকে প্রায় ৪৭ বছর আগে যাত্রা শুরু করা ভয়েজার মহাকাশযান দুটি যখন সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অনন্ত নক্ষত্রলোকে ভেসে চলেছে, তখন তারা শুধু পৃথিবীর পরিচয় নয়, বয়ে নিয়ে চলেছে এক অসাধারণ প্রেমকাহিনী। হয়তো अरब বা खरब বছর পর কোনো এক ভিনগ্রহের সভ্যতা এই রেকর্ডের পাঠোদ্ধার করবে। তারা হয়তো আমাদের ভাষা বুঝবে না, আমাদের সঙ্গীত শুনে অবাক হবে, কিন্তু যখন তারা অ্যান ড্রুয়ানের মস্তিষ্কের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করবে, তখন হয়তো তারা প্রথমবার অনুভব করবে মানবীয় ভালোবাসার তীব্রতা।
ভালোবাসা যে কোনো সীমানা মানে না, তা তো আমরা জানি। কিন্তু কার্ল সেগান আর অ্যান ড্রুয়ানের এই গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয় যে ভালোবাসা শুধু দেশ বা কালের সীমা নয়, মহাবিশ্বের সীমাও ছাড়িয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর বুকে লেখা সবচেয়ে বড় প্রেমপত্র হয়তো এটাই, যার কালি হলো মস্তিষ্কের তরঙ্গ আর ঠিকানা হলো—সমগ্র মহাবিশ্ব।