বিষয়ের ভূমিকা

আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার পৃষ্ঠভাগ কি সব সময় একই রকম ছিল? নিশ্চয়ই না। পাহাড়, মালভূমি, সমভূমি, উপত্যকা – এই সমস্ত ভূমিরূপ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কিছু পরিবর্তন এতটাই ধীর যে আমরা খালি চোখে বুঝতে পারি না, আবার কিছু পরিবর্তন, যেমন ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাত, আকস্মিকভাবে ঘটে। এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট শক্তি ও প্রক্রিয়া। একাদশ শ্রেণির ভূগোলের ষষ্ঠ অধ্যায়, 'ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া' (Geomorphic Processes), আমাদের এই fascinating বিষয়টির সঙ্গেই পরিচয় করিয়ে দেয়।

এই অধ্যায়ে আমরা জানব কোন কোন শক্তি পৃথিবীর উপরিভাগে কাজ করে চলেছে এবং কীভাবে তারা বিভিন্ন ভূমিরূপ তৈরি, পরিবর্তন বা ধ্বংস করছে। মূলত, এই প্রক্রিয়াগুলিকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়: অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া (Endogenic Processes) এবং বাহ্যিক প্রক্রিয়া (Exogenic Processes)। অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলি পৃথিবীর ভিতর থেকে শক্তি সঞ্চয় করে কাজ করে, যেমন ভূ-আলোড়ন বা অগ্ন্যুৎপাত। অন্যদিকে, বাহ্যিক প্রক্রিয়াগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগের উপরে কাজ করে, যেমন নদী, বায়ু, হিমবাহের কার্য। এই অধ্যায়টি মূলত বাহ্যিক প্রক্রিয়াগুলির উপর আলোকপাত করে, যা আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান জগৎকে প্রতিনিয়ত গড়ে তুলছে। চলুন, এই আকর্ষণীয় জগতের গভীরে প্রবেশ করা যাক এবং দেখি আমাদের পৃথিবী কীভাবে নিজের রূপ বদলায়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পৃথিবীর উপরিভাগের পরিবর্তনকারী প্রক্রিয়াগুলিকে ভালোভাবে বোঝার জন্য, আমাদের কয়েকটি মূল ধারণা সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই অধ্যায়ের আলোচনা এই ধারণাগুলির উপরই ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

১. ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া: সংজ্ঞা এবং প্রকারভেদ

যে সমস্ত ভৌত এবং রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগের উপাদানগুলি (শিলা, মাটি) এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবাহিত হয় বা তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং ফলস্বরূপ নতুন ভূমিরূপ গঠিত হয় বা পুরানো ভূমিরূপের পরিবর্তন সাধিত হয়, তাদের সম্মিলিতভাবে ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া (Geomorphic Processes) বলা হয়।

এই প্রক্রিয়াগুলি দুটি প্রধান উৎস থেকে শক্তি লাভ করে:

  • অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া (Endogenic Processes): এই প্রক্রিয়াগুলির শক্তির উৎস পৃথিবীর অভ্যন্তরে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ, পরিচলন স্রোত এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙ্গনের ফলে এই শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠে ভূ-আলোড়ন (Diastrophism) এবং আকস্মিক আলোড়ন বা অগ্ন্যুৎপাত (Volcanism) ঘটে। এই প্রক্রিয়াগুলি সাধারণত ভূপৃষ্ঠে নতুন ভূমিরূপ তৈরি করে, তাই এদের 'ভূমি গঠনকারী' (Land Building) প্রক্রিয়াও বলা হয়। যেমন, হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ফল।
  • বহির্জাত প্রক্রিয়া (Exogenic Processes): এই প্রক্রিয়াগুলির শক্তির মূল উৎস হল সূর্য। সৌরশক্তির কারণে বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা ও চাপের পার্থক্য ঘটে, যার ফলে বায়ুপ্রবাহ ও জলচক্র সক্রিয় হয়। এই প্রক্রিয়াগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগের উপর কাজ করে এবং অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলিকে ক্রমাগত ক্ষয় করে সমতল করার চেষ্টা করে। তাই এদের 'ভূমি ক্ষয়কারী' (Land Wearing) প্রক্রিয়াও বলা হয়। এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয় হলো এই বহির্জাত প্রক্রিয়াগুলি।

২. বহির্জাত প্রক্রিয়া: বিচূর্ণীভবন (Weathering)

বিচূর্ণীভবন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিলাসমূহ নিজের স্থানেই (in-situ) বিভিন্ন যান্ত্রিক, রাসায়নিক ও জৈব প্রক্রিয়ার প্রভাবে চূর্ণবিচূর্ণ বা বিয়োজিত হয়ে যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিচূর্ণীভবনে শিলাচূর্ণগুলি উৎসস্থল থেকে অপসারিত হয় না, কেবল ভেঙে যায় বা তার রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। এটি ক্ষয়ীভবনের (Erosion) থেকে আলাদা।

বিচূর্ণীভবনকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:

ক) ভৌত বা যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবন (Physical or Mechanical Weathering)

এই প্রক্রিয়ায় কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন ছাড়াই শিলা শুধুমাত্র ভৌত শক্তির প্রভাবে ভেঙে ছোট ছোট খণ্ডে পরিণত হয়। এর কয়েকটি প্রধান প্রক্রিয়া হলো:

  • তাপমাত্রার পরিবর্তনজনিত বিচূর্ণীভবন: উষ্ণ মরু অঞ্চলে দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমে শিলা প্রসারিত হয় এবং রাতের বেলায় ঠাণ্ডায় সংকুচিত হয়। এই ক্রমাগত প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে শিলার ওপরের স্তরে পীড়নের সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে তা ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় (Block Disintegration) বা পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে আসে (Exfoliation)।
  • তুহিন খণ্ডীকরণ (Frost Wedging): শীতল পার্বত্য অঞ্চলে বা উচ্চ অক্ষাংশে শিলার ফাটলে জল জমে বরফে পরিণত হলে তার আয়তন প্রায় ৯% বৃদ্ধি পায়। এই বরফ ফাটলের গায়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ফাটলটি আরও চওড়া হয়। এই প্রক্রিয়া বারবার চলতে থাকলে একসময় শিলাটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
  • লবণ কেলাসন (Salt Crystallization): শুষ্ক অঞ্চলে শিলার ছিদ্র বা ফাটলের মধ্যে লবণাক্ত জল প্রবেশ করে। পরে জল বাষ্পীভূত হয়ে গেলে লবণগুলি কেলাস (Crystal) আকারে জমা হয়। এই কেলাসগুলি বড় হতে থাকে এবং শিলাস্তরের মধ্যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে শিলাটি ভেঙে যায়।
  • চাপ হ্রাস (Unloading and Expansion): ভূপৃষ্ঠের উপরের শিলাস্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপসারিত হলে নীচের শিলাস্তরের উপর চাপ কমে যায়। এর ফলে নীচের শিলাস্তরটি প্রসারিত হয় এবং সমান্তরাল ফাটলের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে শিলাকে ভাঙতে সাহায্য করে।

খ) রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন (Chemical Weathering)

এই প্রক্রিয়ায় জল, অক্সিজেন, কার্বন ডাই অক্সাইড ইত্যাদির সংস্পর্শে এসে শিলার খনিজগুলির রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে শিলা বিয়োজিত বা দুর্বল হয়ে পড়ে। উষ্ণ এবং আর্দ্র জলবায়ুতে এই প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে।

  • দ্রবণ (Solution): কিছু খনিজ, যেমন সৈন্ধব লবণ বা জিপসাম, সরাসরি জলে দ্রবীভূত হয়ে যায়। এর ফলে শিলা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
  • কার্বনেশন (Carbonation): বৃষ্টির জল বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইডের সাথে মিশে মৃদু কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে। এই অ্যাসিড চুনাপাথর (ক্যালসিয়াম কার্বনেট) যুক্ত অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে চুনাপাথরকে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটে পরিণত করে, যা সহজেই জলে দ্রবীভূত হয়ে যায়। এর ফলেই চুনাপাথরযুক্ত অঞ্চলে গুহা, ডোলাইন ইত্যাদি ভূমিরূপ সৃষ্টি হয়।
  • জলযোজন (Hydration): কিছু খনিজ জল শোষণ করে ফুলে ওঠে এবং তাদের রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন আসে। এই প্রক্রিয়ায় খনিজের আয়তন বৃদ্ধি পায়, যা শিলার মধ্যে চাপ সৃষ্টি করে এবং তাকে ভাঙতে সাহায্য করে। যেমন, ফেল্ডস্পার খনিজ জলযোজনের ফলে কেওলিন বা চিনামাটিতে পরিণত হয়।
  • জারণ ও বিজারণ (Oxidation and Reduction): লৌহসমৃদ্ধ খনিজগুলি যখন অক্সিজেন ও জলের সংস্পর্শে আসে, তখন তাদের জারণ ঘটে, যা আমরা সাধারণভাবে 'মরিচা পড়া' বলে জানি। এই প্রক্রিয়ায় শিলার রং লাল বা বাদামী হয়ে যায় এবং শিলাটি দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জলমগ্ন পরিবেশে অক্সিজেনের অভাবে বিজারণ প্রক্রিয়া ঘটে।

গ) জৈব বিচূর্ণীভবন (Biological Weathering)

উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অণুজীবের কার্যকলাপের ফলেও শিলার বিচূর্ণীভবন ঘটে থাকে।

  • উদ্ভিদের প্রভাব: গাছের শিকড় শিলার ফাটলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে ফাটলটিকে আরও চওড়া করে শিলাকে ভেঙে ফেলে।
  • প্রাণীর প্রভাব: কেঁচো, ইঁদুর, খরগোশ ইত্যাদি মৃত্তিকাচারী প্রাণীরা মাটি খোঁড়ার সময় শিলাকে চূর্ণ করতে সাহায্য করে।
  • মানুষের কার্যকলাপ: খনি খনন, রাস্তা নির্মাণ, চাষাবাদ ইত্যাদি মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের ফলেও ব্যাপক হারে বিচূর্ণীভবন ঘটে।

৩. পুঞ্জিত ক্ষয় (Mass Movement)

বিচূর্ণীভবনের ফলে সৃষ্ট শিলাচূর্ণ যখন অভিকর্ষের টানে কোনো রকম বহমান মাধ্যম (যেমন জল, বায়ু) ছাড়াই পর্বতের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসে, তখন তাকে পুঞ্জিত ক্ষয় বা পুঞ্জস্খলন (Mass Movement) বলা হয়।

পুঞ্জিত ক্ষয় বিভিন্ন গতিতে হতে পারে। এর প্রকারভেদগুলি হলো:

  • ধীরগতি সম্পন্ন (Slow Movements): এই প্রক্রিয়াগুলি এতটাই ধীরে ঘটে যে তা চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব।
    • ভূমি বিসর্পণ (Creep): ঢালু জমিতে মাটি বা শিলাচূর্ণ অত্যন্ত ধীর গতিতে অভিকর্ষের টানে নীচে নামতে থাকে। এর ফলে গাছের গুঁড়ি, টেলিগ্রামের খুঁটি বা পাঁচিল সামান্য বেঁকে যায়।
    • সলিফ্লাকশন (Solifluction): শীতল তুন্দ্রা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে মাটির উপরের স্তর বরফমুক্ত হলেও নীচের স্তরটি স্থায়ীভাবে বরফাবৃত (Permafrost) থাকে। ফলে উপরের স্তরের জল নীচে প্রবেশ করতে পারে না এবং মাটি জলসিক্ত ও কাদাময় হয়ে ঢাল বরাবর ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়।
  • দ্রুতগতি সম্পন্ন (Rapid Movements): এই প্রক্রিয়াগুলি আকস্মিকভাবে এবং খুব দ্রুত ঘটে।
    • ভূমিপ্রবাহ (Earthflow): যখন জলসিক্ত মাটি বা শিলাচূর্ণ একটি নির্দিষ্ট খাত বরাবর প্রবাহিত হয়, তাকে ভূমিপ্রবাহ বলে।
    • কর্দমপ্রবাহ (Mudflow): প্রচুর বৃষ্টিপাতের পর পার্বত্য অঞ্চলে শিলাচূর্ণ, মাটি ও জল একসাথে মিশে নদীর মতো তীব্র বেগে নীচের দিকে প্রবাহিত হলে তাকে কর্দমপ্রবাহ বলে। এটি অত্যন্ত বিধ্বংসী হতে পারে।
    • ধস (Landslide): যখন পর্বতের ঢাল থেকে একটি বড় শিলাখণ্ড বা মাটির স্তর হঠাৎ করে অভিকর্ষের টানে নীচে নেমে আসে, তখন তাকে ধস বলে। ভূমিকম্প বা প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে এটি প্রায়শই ঘটে থাকে।

৪. ক্ষয়ীভবন এবং সঞ্চয় (Erosion and Deposition)

বহির্জাত প্রক্রিয়ার দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ক্ষয়ীভবন ও সঞ্চয়।

ক্ষয়ীভবন (Erosion)

ক্ষয়ীভবন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি বা মাধ্যম (Geomorphic Agents) যেমন – নদী, বায়ু, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ ইত্যাদি – বিচূর্ণীভূত শিলাখণ্ডগুলিকে উৎসস্থল থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় বহন করে নিয়ে যায়। বিচূর্ণীভবন যেখানে শিলাকে শুধু ভাঙে, ক্ষয়ীভবন সেখানে সেই ভাঙা টুকরোগুলিকে অপসারিত করে। এই অপসারণের কাজটিই ক্ষয়ীভবনের মূল বৈশিষ্ট্য। যেমন, একটি নদী তার স্রোতের মাধ্যমে উপত্যকার পাথরগুলিকে ভেঙে বহন করে নিয়ে যায়।

সঞ্চয় (Deposition)

যখন ক্ষয়কারী মাধ্যমগুলির (নদী, বায়ু ইত্যাদি) গতিশক্তি বা বহন ক্ষমতা কমে যায়, তখন তারা আর বাহিত পদার্থগুলিকে ধরে রাখতে পারে না এবং সেগুলিকে কোনো নিম্নভূমিতে জমা করে। এই জমা করার প্রক্রিয়াটিই হলো সঞ্চয়। যেমন, নদী যখন সমভূমিতে প্রবেশ করে তখন তার স্রোতের বেগ কমে যায়, ফলে বাহিত পলি, বালি, নুড়ি ইত্যাদি জমা করে প্লাবনভূমি, বদ্বীপ ইত্যাদি ভূমিরূপ গঠন করে।

ক্ষয়ীভবন এবং সঞ্চয় একে অপরের পরিপূরক। এক জায়গায় ক্ষয় হলে অন্য জায়গায় অবশ্যই সঞ্চয় হয়। এই দুটি প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবেই পৃথিবীর উপরিভাগে বিভিন্ন ধরনের ভূমিরূপ, যেমন – গিরিখাত, মন্থকূপ (ক্ষয়জাত) এবং বদ্বীপ, বালিয়াড়ি (সঞ্চয়জাত) সৃষ্টি হয়।

৫. মৃত্তিকা গঠন (Soil Formation)

মৃত্তিকা বা মাটি হলো ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল। মাটি হলো পৃথিবীর উপরিভাগের সেই নরম স্তর যা বিচূর্ণীভূত শিলাখণ্ড এবং জৈব পদার্থের মিশ্রণে গঠিত হয়। মাটি গঠন একটি অত্যন্ত ধীর এবং জটিল প্রক্রিয়া, যা পেডোজেনেসিস (Pedogenesis) নামে পরিচিত।

মাটি গঠনের প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি হলো:

  • জনক শিলা (Parent Material): যে শিলা থেকে মাটির উৎপত্তি হয়, তার খনিজ গঠন ও প্রকৃতি মাটির বৈশিষ্ট্যকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে।
  • জলবায়ু (Climate): উষ্ণতা এবং বৃষ্টিপাত বিচূর্ণীভবনের হার এবং জৈব পদার্থের পচনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, যা মাটি গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
  • ভূপ্রকৃতি (Topography): ভূমির ঢাল মাটির গভীরতাকে প্রভাবিত করে। খাড়া ঢালে মাটির স্তর পাতলা হয়, কারণ ক্ষয়ীভবন বেশি। অন্যদিকে, সমতল ভূমিতে মাটির স্তর গভীর হয়।
  • জৈব কার্যকলাপ (Biological Activity): উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব মাটিতে জৈব পদার্থ (হিউমাস) যোগ করে এবং মাটির গঠন উন্নত করে।
  • সময় (Time): একটি পরিণত মাটি তৈরি হতে হাজার হাজার বছর সময় লেগে যায়। সময়ের সাথে সাথে মাটিতে বিভিন্ন স্তর (Horizon) তৈরি হয়।

এই সমস্ত প্রক্রিয়া একত্রে কাজ করে পৃথিবীর পৃষ্ঠকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করে চলেছে। অভ্যন্তরীণ শক্তি যেখানে বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ তৈরি করে, সেখানে বহির্জাত শক্তি সেই বৈচিত্র্যকে মসৃণ করার চেষ্টা করে। এই দুই শক্তির অবিরাম সংগ্রামের ফলেই আমাদের এই বৈচিত্র্যময় পৃথিবী গড়ে উঠেছে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

এই অধ্যায়ের কিছু সাধারণ প্রশ্ন যা ছাত্রছাত্রীদের মনে আসতে পারে, সেগুলি নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো।

প্রশ্ন ১: বিচূর্ণীভবন (Weathering) এবং ক্ষয়ীভবনের (Erosion) মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: বিচূর্ণীভবন এবং ক্ষয়ীভবন দুটিই বহির্জাত প্রক্রিয়া হলেও এদের মধ্যে একটি মূল পার্থক্য রয়েছে।
বিচূর্ণীভবন (Weathering) হলো একটি স্থাণু (static) প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে শিলা নিজের স্থানেই (in-situ) যান্ত্রিক, রাসায়নিক বা জৈব কারণে ভেঙে যায় বা বিয়োজিত হয়। এখানে পদার্থের কোনো অপসারণ বা পরিবহন ঘটে না। উদাহরণস্বরূপ, একটি বড় পাথর তাপমাত্রার পরিবর্তনে ফেটে ছোট ছোট টুকরো হয়ে একই জায়গায় পড়ে থাকা হলো বিচূর্ণীভবন।
অন্যদিকে, ক্ষয়ীভবন (Erosion) একটি গতিশীল (dynamic) প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন নদী, বায়ু, হিমবাহ ইত্যাদি বিচূর্ণীভূত পদার্থগুলিকে এক স্থান থেকে তুলে নিয়ে অন্য স্থানে বহন করে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, ক্ষয়ীভবনে পদার্থের অপসারণ এবং পরিবহন দুটিই জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, নদীর স্রোত যখন সেই ভাঙা পাথরের টুকরোগুলিকে বহন করে নিয়ে যায়, তখন তাকে ক্ষয়ীভবন বলে।
সহজ কথায়, বিচূর্ণীভবন হলো শিলা ভাঙার প্রক্রিয়া এবং ক্ষয়ীভবন হলো সেই ভাঙা অংশগুলিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া।

প্রশ্ন ২: রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে বেশি সক্রিয় কেন?

উত্তর: রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনের জন্য দুটি প্রধান উপাদান অপরিহার্য – জল এবং উচ্চ তাপমাত্রা। উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, যেমন নিরক্ষীয় অঞ্চল, এই দুটি শর্তই পূরণ করে, যার কারণে এখানে রাসায়নিক বিচূর্ণীভবন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এর কারণগুলি হলো:

  • জলের প্রাচুর্য: রাসায়নিক বিক্রিয়া, যেমন দ্রবণ, জলযোজন, কার্বনেশন ইত্যাদি ঘটার জন্য জল একটি অপরিহার্য মাধ্যম। আর্দ্র অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের কারণে শিলা সবসময় জলের সংস্পর্শে থাকে, যা বিক্রিয়ার হার বাড়িয়ে দেয়।
  • উচ্চ তাপমাত্রা: সাধারণভাবে, তাপমাত্রা বাড়লে যেকোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতিও বৃদ্ধি পায়। উচ্চ তাপমাত্রা শিলার খনিজগুলির মধ্যে বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, ফলে শিলা দ্রুত বিয়োজিত হয়।
  • জৈব পদার্থের প্রাচুর্য: উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে গাছপালা ও অণুজীবের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। গাছপালার পচনের ফলে মাটিতে হিউমিক অ্যাসিডের মতো জৈব অ্যাসিড তৈরি হয়, যা রাসায়নিক বিচূর্ণীভবনের হারকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বিপরীতে, শুষ্ক মরু অঞ্চলে জলের অভাবে এবং শীতল মেরু অঞ্চলে নিম্ন তাপমাত্রার কারণে রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রায় বন্ধ থাকে। তাই ওইসব অঞ্চলে যান্ত্রিক বিচূর্ণীভবনই প্রধান।

প্রশ্ন ৩: পুঞ্জিত ক্ষয় (Mass Movement) বলতে কী বোঝায় এবং এটি কেন ঘটে?

উত্তর: পুঞ্জিত ক্ষয় বা পুঞ্জস্খলন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বিচূর্ণীভূত শিলা, মাটি বা অন্যান্য আবর্জনা শুধুমাত্র অভিকর্ষের (gravity) টানে কোনো পাহাড় বা উঁচু স্থানের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে আসে। এই প্রক্রিয়ায় জল, বায়ু বা বরফের মতো কোনো বহমান মাধ্যমের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে না; মাধ্যাকর্ষণই হলো মূল চালিকাশক্তি। পুঞ্জিত ক্ষয় ঘটার প্রধান কারণগুলি হলো:

  • অভিকর্ষ: এটিই মূল শক্তি যা ঢালের উপর থাকা পদার্থকে নীচের দিকে টানে।
  • ঢালের খাড়াই: ঢাল যত খাড়া হয়, অভিকর্ষের টান তত বেশি কার্যকর হয় এবং পুঞ্জিত ক্ষয়ের সম্ভাবনা বাড়ে।
  • জল: যদিও জল সরাসরি পদার্থ বহন করে না, তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অতিরিক্ত জল মাটির কণাগুলির মধ্যে ঘর্ষণ কমিয়ে দেয় এবং পদার্থের ওজন বাড়িয়ে দেয়, যা ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রবল বৃষ্টিপাতের পরেই সাধারণত ধস নামে।
  • উদ্ভিদের অভাব: গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে। বনভূমি ধ্বংস বা গাছ কেটে ফেলার ফলে মাটি আলগা হয়ে যায় এবং পুঞ্জিত ক্ষয়ের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
  • ভূমিকম্প বা বিস্ফোরণ: ভূমিকম্পের কাঁপুনি বা মানুষের দ্বারা সৃষ্ট বিস্ফোরণ পাহাড়ের ঢালকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং আকস্মিক ধসের কারণ হতে পারে।
সুতরাং, পুঞ্জিত ক্ষয় হলো অভিকর্ষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যা ভূমির ঢালকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি পড়ার পর আমরা পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগের পরিবর্তনকারী প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা লাভ করলাম। ছাত্রছাত্রীদের মনে রাখার সুবিধার জন্য মূল বিষয়গুলি এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া: পৃথিবীর পৃষ্ঠের পরিবর্তনকারী সমস্ত প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যা মূলত দুই প্রকার – অভ্যন্তরীণ (Endogenic) ও বহির্জাত (Exogenic)।
  • অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া: পৃথিবীর ভিতর থেকে শক্তি লাভ করে এবং নতুন ভূমিরূপ (যেমন পর্বত) তৈরি করে।
  • বহির্জাত প্রক্রিয়া: সূর্য থেকে শক্তি লাভ করে এবং ভূপৃষ্ঠের উঁচু স্থানগুলিকে ক্ষয় করে সমতল করার চেষ্টা করে।
  • বিচূর্ণীভবন (Weathering): শিলা তার নিজের স্থানেই ভেঙে যাওয়া বা বিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়া। এটি তিন প্রকার – ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব।
  • পুঞ্জিত ক্ষয় (Mass Movement): অভিকর্ষের টানে শিলাচূর্ণের ঢাল বরাবর নীচে নেমে আসা। এর গতি ধীর (Creep) বা দ্রুত (Landslide) হতে পারে।
  • ক্ষয়ীভবন (Erosion): নদী, বায়ু, হিমবাহের মতো প্রাকৃতিক মাধ্যম দ্বারা বিচূর্ণীভূত পদার্থ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অপসারিত হওয়ার প্রক্রিয়া।
  • সঞ্চয় (Deposition): ক্ষয়কারী মাধ্যমগুলির শক্তি কমে গেলে বাহিত পদার্থ জমা হওয়ার প্রক্রিয়া। ক্ষয় ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে বদ্বীপ, বালিয়াড়ি ইত্যাদি ভূমিরূপ গঠিত হয়।
  • মৃত্তিকা গঠন (Pedogenesis): বিচূর্ণীভবন হলো মাটি তৈরির প্রথম ধাপ। জলবায়ু, জনক শিলা, ভূপ্রকৃতি, জৈব পদার্থ এবং সময় হলো মাটি গঠনের প্রধান নিয়ন্ত্রক।