বিষয়ের ভূমিকা
ভারতের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো জাতীয়তাবাদের উত্থান। দশম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় 'ভারতে জাতীয়তাবাদ' (Nationalism in India) আমাদের শেখায় কীভাবে একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল। এই অধ্যায়টি কেবল কিছু তারিখ বা ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গল্প। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংসা ও সত্যাগ্রহের আদর্শ কীভাবে ভারতীয় জনতাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং খিলাফত, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের মতো বিভিন্ন পর্যায় পার করে ভারত তার স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল, তা এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই অধ্যায়টি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি আমাদের বর্তমান গণতান্ত্রিক ভারতের ভিত বুঝতে সাহায্য করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব
১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। যদিও ভারত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি, কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার কারণে ভারতকে এর মাশুল দিতে হয়েছিল।
- প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি: যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারতে করের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। কাস্টমস ডিউটি বৃদ্ধি করা হয় এবং প্রথমবারের মতো আয়কর বা 'ইনকাম ট্যাক্স' প্রবর্তন করা হয়।
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি: ১৯১৩ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
- জোরপূর্বক নিয়োগ: গ্রাম থেকে তরুণদের জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছিল, যা গ্রামীণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
- দুর্ভিক্ষ ও মহামারী: ১৯১৮-১৯ এবং ১৯২০-২১ সালে ভারতের অনেক অংশে ফসল নষ্ট হয়, যার ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এর সাথে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীতে প্রায় ১২০ থেকে ১৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।
২. সত্যাগ্রহের ধারণা এবং মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাব
১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফিরে আসেন মহাত্মা গান্ধী। সেখানে তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সফলভাবে 'সত্যাগ্রহ' আন্দোলন চালিয়েছিলেন। ভারতে আসার পর তিনি একে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।
সত্যাগ্রহ কী? সত্যাগ্রহের মূল কথা হলো সত্যের শক্তি এবং সত্যের অনুসন্ধান। গান্ধীজির মতে, যদি উদ্দেশ্য সত্য হয় এবং সংগ্রাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে হয়, তবে অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শারীরিক শক্তির প্রয়োজন নেই। অহিংসার মাধ্যমেও জয়লাভ করা সম্ভব।
গান্ধীজি ভারতে এসেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় আন্দোলন পরিচালনা করেন:
- চম্পারণ সত্যাগ্রহ (১৯১৭): বিহারের নীল চাষিদের ওপর নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন ছিল গান্ধীজির প্রথম সফল সত্যাগ্রহ।
- খেদা সত্যাগ্রহ (১৯১৭): গুজরাটের খেদা জেলার কৃষকরা ফসল নষ্ট হওয়া ও প্লেগ মহামারীর কারণে খাজনা দিতে পারছিলেন না। তাঁদের খাজনা মকুবের দাবিতে গান্ধীজি আন্দোলন করেন।
- আহমেদাবাদ সত্যাগ্রহ (১৯১৮): আহমেদাবাদের সুতি বস্ত্র কলের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে গান্ধীজি সফল আন্দোলন পরিচালনা করেন।
৩. রাউলাট আইন এবং জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড
১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার 'ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল'-এ ভারতীয় সদস্যদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও 'রাউলাট আইন' পাস করে। এই আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক বন্দিদের কোনো বিচার ছাড়াই দু'বছর পর্যন্ত আটকে রাখা সম্ভব ছিল।
গান্ধীজি এই অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে ১৯১৯ সালের ৬ই এপ্রিল একটি দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেন। ১০ই এপ্রিল অমৃতসরে শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। ১৩ই এপ্রিল জালিয়ানওয়ালা বাগে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড (১৩ এপ্রিল, ১৯১৯): বৈশাখী উৎসব পালনের জন্য বহু মানুষ সেখানে জমা হয়েছিলেন। জেনারেল ডায়ার বাগানের একমাত্র ছোট প্রবেশপথ বন্ধ করে দিয়ে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। শত শত নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। এই ঘটনার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'নাইটহুড' উপাধি ত্যাগ করেন।
৪. খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন
গান্ধীজি বুঝেছিলেন যে, হিন্দু ও মুসলিমদের একজোট না করলে কোনো বড় আন্দোলন সফল হবে না। এই লক্ষ্যেই তিনি খিলাফত ইস্যুকে সমর্থন জানান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের (অটোমান সাম্রাজ্য) পরাজয়ের পর খলিফার ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছিল, যা মুসলিমদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। মুহাম্মদ আলি ও শওকত আলি—এই দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়।
অসহযোগ আন্দোলন কেন? ১৯২০ সালে গান্ধীজির লেখা 'হিন্দ স্বরাজ' বইতে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা ভারতে টিকে আছে কেবল ভারতীয়দের সহযোগিতার কারণে। যদি ভারতীয়রা অসহযোগিতা শুরু করে, তবে এক বছরের মধ্যে স্বরাজ অর্জিত হবে।
আন্দোলনের ধারা ছিল নিম্নরূপ:
- সরকারি খেতাব বর্জন।
- সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, আদালত এবং স্কুল-কলেজ বর্জন।
- বিদেশি পণ্য বর্জন এবং বিলিতি কাপড়ের হোলি খেলা।
- খাদি কাপড়ের ব্যবহার বৃদ্ধি।
১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় একটি হিংসাত্মক ঘটনার (বিক্ষুব্ধ জনতা একটি পুলিশ স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয়, যেখানে ২২ জন পুলিশকর্মী মারা যান) পর গান্ধীজি আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
৫. আইন অমান্য আন্দোলনের পথে: লবণ সত্যাগ্রহ
১৯২০-এর দশকের শেষে ভারতে জাতীয়তাবাদ নতুন মাত্রা পায়। ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে জহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে 'পূর্ণ স্বরাজ' বা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ঘোষণা করা হয়। এরপর গান্ধীজি শুরু করেন 'আইন অমান্য আন্দোলন'।
লবণ সত্যাগ্রহ (ডান্ডি অভিযান): গান্ধীজি লবণকে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বেছে নেন, কারণ লবণ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার অপরিহার্য খাদ্যবস্তু। ৩১ জানুয়ারি ১৯৩০ সালে তিনি ভাইসরয় আরউইনকে ১১টি দাবি সম্বলিত একটি চিঠি দেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় ১২ মার্চ ১৯৩০ সালে তিনি সবরমতী আশ্রম থেকে ডান্ডি পর্যন্ত ২৪০ মাইল দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেন। ৬ এপ্রিল তিনি ডান্ডিতে পৌঁছে সমুদ্রের জল ফুটিয়ে লবণ তৈরি করে আইন অমান্য করেন।
৬. আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা এবং যৌথ একাত্মবোধ
আইন অমান্য আন্দোলনে সমাজের সব স্তর সমানভাবে অংশগ্রহণ করেনি। বিশেষ করে দলিত বা অস্পৃশ্য গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। ড. বি. আর. আম্বেদকর দলিতদের জন্য আলাদা নির্বাচনের দাবি করেন, যা নিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৩২ সালের 'পুনা চুক্তি'র (Poona Pact) মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয়।
যৌথ একাত্মবোধের সৃষ্টি: কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠেনি। লোকগাথা, গান, প্রতীক ও পতাকার মাধ্যমেও ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য তৈরি করা হয়েছিল।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম' গানটি দেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ ছড়িয়ে দেয়।
- ভারত মাতার চিত্রকল্প (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা অঙ্কিত) জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
- জাতীয় পতাকা (তৈরি করেন গান্ধীজি ও অন্যান্যরা) সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. গান্ধীজি কেন রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন?
উত্তর: রাউলাট আইন ছিল একটি কালাকানুন যার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার যে কাউকে বিনা বিচারে দুই বছর আটকে রাখতে পারত। এটি মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার হরণ করেছিল, তাই গান্ধীজি এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সত্যাগ্রহের ডাক দেন।
২. চৌরিচৌরার ঘটনা অসহযোগ আন্দোলনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
উত্তর: ১৯২২ সালে চৌরিচৌরায় এক উত্তেজিত জনতা পুলিশ স্টেশনে আগুন লাগিয়ে দেয়, যার ফলে গান্ধীজি গভীরভাবে মর্মাহত হন। তিনি মনে করেন আন্দোলনটি হিংসাত্মক হয়ে উঠছে এবং মানুষ এখনো অহিংসার সঠিক পাঠ পায়নি। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।
৩. লবণ সত্যাগ্রহ বা ডান্ডি অভিযানের তাৎপর্য কী?
উত্তর: লবণ সত্যাগ্রহ ছিল আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা। লবণ একটি সাধারণ বিষয় হলেও এটি সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। এটি ব্রিটিশদের অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে কাজ করেছিল এবং বিশ্ববাসীর নজর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
৪. ১৯৩২ সালের পুনা চুক্তির গুরুত্ব কী?
উত্তর: পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল মহাত্মা গান্ধী এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে। এর মাধ্যমে দলিত বা অনুন্নত শ্রেণিদের জন্য পৃথক নির্বাচনের পরিবর্তে সাধারণ নির্বাচক মণ্ডলীর মধ্যেই আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, যা জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল।
সারসংক্ষেপ
- ভারতের জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণও ছিল।
- গান্ধীজির অহিংসা ও সত্যাগ্রহের আদর্শ সাধারণ মানুষকে সংগ্রামের মূল ধারায় নিয়ে এসেছিল।
- জালিয়ানওয়ালা বাগ এবং রাউলাট আইনের মতো ঘটনাগুলো ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত রূপ ভারতের মানুষের সামনে উন্মোচিত করে।
- অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন ব্রিটিশ ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল।
- প্রতীক, গান ও ইতিহাসের পুনর্গঠন ভারতীয়দের মধ্যে একজাতীয়তাবোধ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।