বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের এই জীবন্ত পৃথিবীতে শক্তির মূল উৎস সূর্য। কিন্তু আমরা, অর্থাৎ প্রাণীরা, সরাসরি সূর্যের শক্তি ব্যবহার করতে পারি না। তাহলে এই বিপুল শক্তি আমাদের কাছে পৌঁছায় কীভাবে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে সবুজ উদ্ভিদের মধ্যে। উদ্ভিদ এক জাদুকরী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে, যা তাদের নিজেদের এবং সমগ্র জীবজগতের খাদ্যের জোগান দেয়। এই অত্যাশ্চর্য প্রক্রিয়াটির নামই হলো সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis)।
একাদশ শ্রেণির জীববিজ্ঞানের ১৩ তম অধ্যায়, 'উচ্চতর উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ', আমাদের এই জীবনের সবুজ কারখানাটির ভেতরের কার্যপ্রণালীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়ে আমরা জানব সালোকসংশ্লেষ ঠিক কোথায় হয়, কীভাবে হয়, কোন কোন উপাদান এর জন্য প্রয়োজন এবং কোন কোন ফ্যাক্টর এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। এটি কেবল একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়, এটি হলো পৃথিবীর বুকে জীবনকে টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি। চলুন, এই সবুজ রহস্যের গভীরে প্রবেশ করা যাক এবং দেখি কীভাবে উদ্ভিদ আমাদের জন্য খাদ্য এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের অক্সিজেন তৈরি করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সালোকসংশ্লেষ কী? (What is Photosynthesis?)
সালোকসংশ্লেষ একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যেখানে সবুজ উদ্ভিদ, শৈবাল এবং কিছু ব্যাকটেরিয়া সূর্যালোকের উপস্থিতিতে, বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং মাটি থেকে জল (H₂O) ব্যবহার করে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট (গ্লুকোজ) জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় উপজাত বস্তু হিসেবে অক্সিজেন (O₂) নির্গত হয়।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি উদ্ভিদের সবুজ অংশে, মূলত পাতায় থাকা ক্লোরোপ্লাস্ট নামক কোষ অঙ্গাণুতে সংঘটিত হয়।
সালোকসংশ্লেষের সামগ্রিক রাসায়নিক সমীকরণ:
6CO₂ (কার্বন ডাইঅক্সাইড) + 12H₂O (জল) → [সূর্যালোক ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে] → C₆H₁₂O₆ (গ্লুকোজ) + 6H₂O (জল) + 6O₂ (অক্সিজেন)
এই সমীকরণ থেকে স্পষ্ট যে, উদ্ভিদ ৬ অণু কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং ১২ অণু জল ব্যবহার করে এক অণু গ্লুকোজ, ৬ অণু জল এবং ৬ অণু অক্সিজেন তৈরি করে। এই উৎপাদিত গ্লুকোজই উদ্ভিদের শক্তি জোগায় এবং বাকি জীবজগতের খাদ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে।
২. সালোকসংশ্লেষ কোথায় সংঘটিত হয়? (Site of Photosynthesis)
সালোকসংশ্লেষের প্রধান স্থান হলো উদ্ভিদের পাতা। তবে কচি সবুজ কাণ্ডেও এই প্রক্রিয়া চলতে পারে। পাতার মেসোফিল কলার কোষগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে, যা এই প্রক্রিয়ার আসল 'কারখানা'।
ক্লোরোপ্লাস্টের গঠন:
- বহিঃস্তর ও অন্তঃস্তর (Outer and Inner Membrane): ক্লোরোপ্লাস্ট একটি দ্বি-স্তরীয় পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে।
- স্ট্রোমা (Stroma): অন্তঃস্তরের ভেতরে থাকা তরল, জেলির মতো পদার্থ হলো স্ট্রোমা। এখানেই সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার বিক্রিয়া বা কেলভিন চক্র সংঘটিত হয়।
- থাইলাকয়েড (Thylakoid): স্ট্রোমার মধ্যে চাকতির মতো চ্যাপ্টা থলি দেখা যায়, এগুলিই থাইলাকয়েড। সালোকসংশ্লেষের জন্য প্রয়োজনীয় রঞ্জক পদার্থ (ক্লোরোফিল) এই থাইলাকয়েডের পর্দায় থাকে।
- গ্রানাম (Granum): অনেকগুলো থাইলাকয়েড একসঙ্গে একটি মুদ্রার স্তম্ভের মতো সজ্জিত হয়ে গ্রানাম (বহুবচনে গ্রানা) তৈরি করে। এখানেই সালোকসংশ্লেষের আলোক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- স্ট্রোমা ল্যামেলি (Stroma Lamellae): দুটি পাশাপাশি গ্রানামকে সংযোগকারী নলাকার গঠন।
৩. সালোকসংশ্লেষে অংশগ্রহণকারী রঞ্জক পদার্থ (Pigments involved)
সূর্যালোকের ফোটন কণাকে শোষণ করার জন্য উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্টে বিশেষ ধরনের রঞ্জক পদার্থ থাকে। এগুলি হলো:
- ক্লোরোফিল এ (Chlorophyll a): এটি মূল সালোকসংশ্লেষীয় রঞ্জক। এটি নীল-সবুজ বর্ণের এবং আলোক শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে কাজ করে।
- ক্লোরোফিল বি (Chlorophyll b): এটি হলুদ-সবুজ বর্ণের। এটি আলোক শক্তি শোষণ করে ক্লোরোফিল 'এ'-কে প্রদান করে। তাই একে সহায়ক রঞ্জক বলা হয়।
- ক্যারোটিনয়েডস (Carotenoids): এগুলি হলুদ থেকে কমলা-লাল বর্ণের হয়। এর মধ্যে ক্যারোটিন (কমলা) এবং জ্যান্থোফিল (হলুদ) প্রধান। এরাও সহায়ক রঞ্জক হিসেবে কাজ করে এবং অতিরিক্ত আলোক শক্তি থেকে ক্লোরোফিলকে রক্ষা করে (Photo-oxidation রোধ করে)।
এই বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থগুলি আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে। ক্লোরোফিল মূলত নীল এবং লাল আলো সবচেয়ে বেশি শোষণ করে, কিন্তু সবুজ আলো প্রতিফলিত করে, তাই পাতাকে সবুজ দেখায়।
৪. সালোকসংশ্লেষের পর্যায়সমূহ (Phases of Photosynthesis)
সম্পূর্ণ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াটিকে দুটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা হয়:
ক) আলোক-নির্ভর দশা বা আলোক বিক্রিয়া (Light-dependent Phase or Light Reaction)
খ) আলোক-নিরপেক্ষ দশা বা অন্ধকার বিক্রিয়া (Light-independent Phase or Dark Reaction)
ক) আলোক বিক্রিয়া (The Light Reaction)
নাম থেকেই বোঝা যায়, এই পর্যায়ের জন্য আলো অপরিহার্য। এটি ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রানাম অংশে (থাইলাকয়েড পর্দায়) সংঘটিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আলোক শক্তিকে ব্যবহার করে ATP (অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট) এবং NADPH (নিকোটিনামাইড অ্যাডেনিন ডাইনিউক্লিওটাইড ফসফেট) নামক দুটি উচ্চ শক্তিযুক্ত অণু তৈরি করা, যা পরবর্তী পর্যায়ে কার্বন ডাইঅক্সাইডকে বিজারিত করতে ব্যবহৃত হবে।
আলোক বিক্রিয়ার প্রধান ধাপগুলি হলো:
- আলোক শোষণ (Light Absorption): ক্লোরোফিল এবং অন্যান্য সহায়ক রঞ্জকগুলি সূর্যালোকের ফোটন কণা শোষণ করে উত্তেজিত হয়।
- জলের আলোক বিশ্লেষণ (Photolysis of Water): শোষিত আলোক শক্তির সাহায্যে জলের অণু ভেঙে যায়। 2H₂O → 4H⁺ + O₂ + 4e⁻। এই প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন নির্গত হয়, যা আমাদের শ্বাসকার্যের জন্য অপরিহার্য।
- আলোক ফসফোরীভবন (Photophosphorylation): উত্তেজিত ইলেক্ট্রনগুলি বিভিন্ন বাহকের মাধ্যমে পরিবাহিত হওয়ার সময় শক্তি নির্গত করে, যা ADP-কে ATP-তে রূপান্তরিত করে। এই প্রক্রিয়া দু'ভাবে হতে পারে:
i. অচক্রাকার বা নন-সাইক্লিক ফটোফসফোরিলেশন (Non-cyclic Photophosphorylation):
- এতে দুটি ফটোসিস্টেম (Photosystem) অংশ নেয়: ফটোসিস্টেম II (PS II) এবং ফটোসিস্টেম I (PS I)।
- প্রথমে PS II (P680) আলো শোষণ করে ইলেক্ট্রন ত্যাগ করে, যা ইলেক্ট্রন পরিবহন শৃঙ্খল (ETC) দিয়ে PS I-এর দিকে যায়। এই যাত্রাপথে ATP তৈরি হয়।
- PS II-এর ইলেক্ট্রনের ঘাটতি জলের আলোক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পূরণ হয়।
- এরপর PS I (P700) আলো শোষণ করে উত্তেজিত হয় এবং ইলেক্ট্রন ত্যাগ করে। এই ইলেক্ট্রন NADP⁺-কে বিজারিত করে NADPH তৈরি করে।
- যেহেতু ইলেক্ট্রন PS II থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসে না, তাই একে অচক্রাকার বলা হয়। একে 'Z-স্কিম'ও বলা হয় কারণ ইলেক্ট্রনের গতিপথটি অনেকটা ইংরেজি 'Z' অক্ষরের মতো দেখায়।
- ফলাফল: ATP, NADPH এবং O₂ তৈরি হয়।
ii. চক্রাকার বা সাইক্লিক ফটোফসফোরিলেশন (Cyclic Photophosphorylation):
- এতে শুধুমাত্র ফটোসিস্টেম I (PS I) অংশ নেয়।
- PS I থেকে নির্গত উত্তেজিত ইলেক্ট্রন একটি ইলেক্ট্রন পরিবহন শৃঙ্খলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে পুনরায় PS I-এ ফিরে আসে।
- এই প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র ATP তৈরি হয়। কোনো NADPH বা O₂ তৈরি হয় না।
- যখন কোষে অতিরিক্ত ATP-এর প্রয়োজন হয় (কেলভিন চক্রের জন্য), তখন এই প্রক্রিয়াটি ঘটে।
খ) অন্ধকার বিক্রিয়া বা কেলভিন চক্র (The Dark Reaction or Calvin Cycle)
এই পর্যায়ের জন্য সরাসরি আলোর প্রয়োজন হয় না, তবে এটি আলোক বিক্রিয়ায় উৎপাদিত ATP এবং NADPH-এর উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তাই দিনের বেলাতেই এই প্রক্রিয়া চলে। এটি ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমাতে সংঘটিত হয়। বিজ্ঞানী মেলভিন কেলভিন এই চক্রটি আবিষ্কার করেন বলে একে কেলভিন চক্র বলা হয়।
কেলভিন চক্রের তিনটি প্রধান ধাপ:
- কার্বক্সিলেশন (Carboxylation): এই ধাপে বায়ুমণ্ডলের CO₂, স্ট্রোমাতে থাকা একটি 5-কার্বন যৌগ RuBP (রাইবিউলোজ-1,5-বাইফসফেট)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এই বিক্রিয়ায় সাহায্য করে RuBisCO (রাইবিউলোজ বাইফসফেট কার্বক্সিলেজ-অক্সিজিনেজ) নামক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক। এর ফলে একটি অস্থায়ী 6-কার্বন যৌগ তৈরি হয় যা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গিয়ে দুই অণু 3-কার্বন যৌগ 3-PGA (3-ফসফোগ্লিসারিক অ্যাসিড) তৈরি করে। যেহেতু প্রথম স্থায়ী যৌগটি 3-কার্বন যুক্ত, তাই এই পথকে C3 পথও বলা হয়।
- বিজারণ (Reduction): এই ধাপে, আলোক বিক্রিয়া থেকে পাওয়া ATP এবং NADPH ব্যবহার করে 3-PGA বিজারিত হয়ে ট্রায়োজ ফসফেট (গ্লিসার্যালডিহাইড-3-ফসফেট) তৈরি হয়। এই ট্রায়োজ ফসফেটই হলো শর্করা তৈরির মূল উপাদান।
- পুনরুৎপাদন (Regeneration): চক্রটিকে সচল রাখার জন্য CO₂ গ্রাহক RuBP-কে পুনরায় তৈরি করতে হয়। কিছু ট্রায়োজ ফসফেট অণু বিভিন্ন জটিল বিক্রিয়ার মাধ্যমে এবং ATP ব্যবহার করে RuBP পুনরুৎপাদন করে।
প্রতি ৬ বার কেলভিন চক্র আবর্তিত হলে, ৬ অণু CO₂ গৃহীত হয় এবং ১ অণু গ্লুকোজ (শর্করা) সংশ্লেষিত হয়।
৫. C4 পথ এবং ফটোরেসპირেশন (The C4 Pathway and Photorespiration)
কিছু উষ্ণ এবং শুষ্ক অঞ্চলের উদ্ভিদ (যেমন - ভুট্টা, আখ, জোয়ার) CO₂ সংবন্ধনের জন্য একটি বিকল্প পথ ব্যবহার করে, যা C4 পথ নামে পরিচিত।
ফটোরেসপিরেশন (Photorespiration): C3 উদ্ভিদগুলিতে, যখন তাপমাত্রা খুব বেশি থাকে এবং পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায়, তখন কোষের মধ্যে CO₂-এর ঘনত্ব কমে যায় এবং O₂-এর ঘনত্ব বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে RuBisCO উৎসেচক CO₂-এর পরিবর্তে O₂-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ফটোরেসপিরেশন বলে। এটি একটি ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া কারণ এতে কোনো শর্করা বা ATP তৈরি হয় না, বরং শক্তি ব্যয় হয়।
C4 পথ: ফটোরেসপিরেশন এড়ানোর জন্য C4 উদ্ভিদগুলি একটি বিশেষ অভিযোজন দেখায়।
- ক্র্যাঞ্জ অ্যানাটমি (Kranz Anatomy): এই উদ্ভিদগুলির পাতায় ভাসকুলার বান্ডিলের চারপাশে বড় বড় বান্ডিল সিথ (Bundle sheath) কোষের একটি স্তর থাকে।
- প্রক্রিয়া: C4 উদ্ভিদে, CO₂ প্রথমে মেসোফিল কোষে প্রবেশ করে এবং PEP কার্বক্সিলেজ নামক উৎসেচকের সাহায্যে 4-কার্বন যৌগ (যেমন - অক্সালোঅ্যাসিটিক অ্যাসিড) তৈরি করে। এই 4-কার্বন যৌগটি বান্ডিল সিথ কোষে পরিবাহিত হয়, যেখানে এটি ভেঙে CO₂ নির্গত করে। এই CO₂ তখন স্বাভাবিক কেলভিন চক্রে প্রবেশ করে।
- সুবিধা: এই পদ্ধতির ফলে বান্ডিল সিথ কোষের মধ্যে CO₂-এর ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়, যা RuBisCO-কে অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হতে বাধা দেয় এবং ফটোরেসপিরেশন প্রায় বন্ধ করে দেয়। এর ফলে C4 উদ্ভিদগুলি উচ্চ তাপমাত্রা এবং তীব্র আলোতেও দক্ষতার সাথে সালোকসংশ্লেষ করতে পারে।
৬. সালোকসংশ্লেষকে প্রভাবিত করে এমন ফ্যাক্টর (Factors Affecting Photosynthesis)
সালোকসংশ্লেষের হার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ (পাতার বয়স, ক্লোরোফিলের পরিমাণ) এবং বাহ্যিক (আলো, CO₂, তাপমাত্রা, জল) ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হয়। ব্ল্যাকম্যানের 'ল অব লিমিটিং ফ্যাক্টর' অনুযায়ী, যখন একটি প্রক্রিয়া একাধিক ফ্যাক্টর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন যে ফ্যাক্টরটির পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় সবচেয়ে কম থাকে, সেটিই প্রক্রিয়ার হার নির্ধারণ করে।
- আলো (Light): আলোর তীব্রতা বাড়লে সালোকসংশ্লেষের হার বাড়ে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর বাড়ে না (Light Saturation)। আলোর গুণমান (তরঙ্গদৈর্ঘ্য) এবং সময়কালও হারকে প্রভাবিত করে।
- কার্বন ডাইঅক্সাইড (Carbon Dioxide): বায়ুমণ্ডলে CO₂-এর ঘনত্ব সাধারণত কম থাকে (0.03-0.04%), তাই এর ঘনত্ব বাড়ালে সালোকসংশ্লেষের হার একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বাড়ে।
- তাপমাত্রা (Temperature): সালোকসংশ্লেষ একটি উৎসেচক-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া, তাই এর জন্য একটি অনুকূল তাপমাত্রা (Optimum temperature) প্রয়োজন। C3 উদ্ভিদের জন্য এটি 20-25°C এবং C4 উদ্ভিদের জন্য 30-40°C। এর চেয়ে কম বা বেশি তাপমাত্রায় হার কমে যায়।
- জল (Water): জলের অভাব হলে পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায়, ফলে CO₂-এর প্রবেশ বাধা পায় এবং সালোকসংশ্লেষের হার কমে যায়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: আলোক বিক্রিয়া এবং অন্ধকার বিক্রিয়ার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: আলোক বিক্রিয়া এবং অন্ধকার বিক্রিয়ার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলি হলো:
- স্থান: আলোক বিক্রিয়া ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রানামে (থাইলাকয়েড পর্দায়) হয়, যেখানে অন্ধকার বিক্রিয়া স্ট্রোমাতে হয়।
- আলোর প্রয়োজনীয়তা: আলোক বিক্রিয়ার জন্য সরাসরি আলো প্রয়োজন, কিন্তু অন্ধকার বিক্রিয়ার জন্য সরাসরি আলোর প্রয়োজন নেই।
- বিক্রিয়ক: আলোক বিক্রিয়ায় জল, ADP এবং NADP⁺ ব্যবহৃত হয়। অন্ধকার বিক্রিয়ায় CO₂, ATP এবং NADPH ব্যবহৃত হয়।
- উৎপাদিত পদার্থ: আলোক বিক্রিয়ার ফলে অক্সিজেন, ATP এবং NADPH তৈরি হয়। অন্ধকার বিক্রিয়ার ফলে শর্করা (গ্লুকোজ), ADP এবং NADP⁺ তৈরি হয়।
প্রশ্ন ২: C3 এবং C4 উদ্ভিদের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি কী কী?
উত্তর: C3 এবং C4 উদ্ভিদের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো:
- CO₂ সংবন্ধন: C3 উদ্ভিদে CO₂ সরাসরি কেলভিন চক্রে RuBP দ্বারা গৃহীত হয় এবং প্রথম স্থায়ী যৌগটি হলো 3-কার্বন যুক্ত 3-PGA। C4 উদ্ভিদে CO₂ প্রথমে মেসোফিল কোষে PEP দ্বারা গৃহীত হয়ে 4-কার্বন যৌগ তৈরি করে, যা পরে কেলভিন চক্রে CO₂ সরবরাহ করে।
- পাতার গঠন: C4 উদ্ভিদের পাতায় বিশেষ 'ক্র্যাঞ্জ অ্যানাটমি' দেখা যায়, যা C3 উদ্ভিদে থাকে না।
- ফটোরেসপিরেশন: C3 উদ্ভিদে ফটোরেসপিরেশন ঘটে, কিন্তু C4 উদ্ভিদে এটি প্রায় নগণ্য।
- অনুকূল তাপমাত্রা: C4 উদ্ভিদগুলি C3 উদ্ভিদের তুলনায় উচ্চ তাপমাত্রায় বেশি দক্ষতার সাথে সালোকসংশ্লেষ করতে পারে।
প্রশ্ন ৩: RuBisCO উৎসেচকের দ্বৈত ভূমিকা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: RuBisCO (রাইবিউলোজ-1,5-বাইফসফেট কার্বক্সিলেজ-অক্সিজিনেজ) বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচুর্যময় উৎসেচক। এর দ্বৈত ভূমিকা রয়েছে কারণ এটি কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) এবং অক্সিজেন (O₂) উভয়ের সাথেই আবদ্ধ হতে পারে। যখন CO₂-এর ঘনত্ব বেশি থাকে, তখন এটি কার্বক্সিলেজ হিসেবে কাজ করে এবং কেলভিন চক্র শুরু করে (সালোকসংশ্লেষ)। কিন্তু যখন O₂-এর ঘনত্ব CO₂-এর তুলনায় বেড়ে যায়, তখন এটি অক্সিজিনেজ হিসেবে কাজ করে এবং ফটোরেসপিরেশন প্রক্রিয়া শুরু করে, যা উদ্ভিদের জন্য একটি ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া। CO₂ এবং O₂-এর আপেক্ষিক ঘনত্বের উপরই এর কার্যকলাপ নির্ভর করে।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি শিখলাম, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
- সালোকসংশ্লেষ হলো সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ সৌরশক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে খাদ্য তৈরি করে এবং অক্সিজেন নির্গত করে।
- এই প্রক্রিয়া ক্লোরোপ্লাস্ট নামক কোষ অঙ্গাণুতে সংঘটিত হয়, যার গ্রানাম অংশে আলোক বিক্রিয়া এবং স্ট্রোমা অংশে অন্ধকার বিক্রিয়া চলে।
- আলোক বিক্রিয়ায় জলের অণু ভেঙে অক্সিজেন নির্গত হয় এবং ATP ও NADPH তৈরি হয়।
- অন্ধকার বিক্রিয়া বা কেলভিন চক্রে, ATP ও NADPH ব্যবহার করে CO₂-কে বিজারিত করে শর্করা (গ্লুকোজ) তৈরি করা হয়।
- C4 উদ্ভিদগুলি ফটোরেসপিরেশন নামক ক্ষতিকারক প্রক্রিয়া এড়ানোর জন্য একটি বিশেষ অভিযোজন (C4 পথ) ব্যবহার করে, যা তাদের উচ্চ তাপমাত্রা ও শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
- আলো, কার্বন ডাইঅক্সাইড, তাপমাত্রা এবং জলের মতো বিভিন্ন ফ্যাক্টর সালোকসংশ্লেষের হারকে নিয়ন্ত্রণ করে।