বিষয়ের ভূমিকা

নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো 'জীবনের মৌলিক একক: কোষ'। আমরা এই মহাবিশ্বে যত জীব দেখতে পাই, তা সে একটি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া হোক বা একটি বিশাল তিমি মাছ, তাদের প্রত্যেকেরই জীবনের মূল ভিত্তি হলো এই কোষ। এটি শুধু জীবের ক্ষুদ্রতম এককই নয়, এটি জীবনের সকল কার্যাবলী যেমন – পুষ্টি, শ্বসন, রেচন, জনন ইত্যাদি পরিচালনা করে। এই অধ্যায়ে আমরা কোষের গঠন, প্রকারভেদ, বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু এবং তাদের কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই জ্ঞান জীববিজ্ঞানের অন্যান্য জটিল ধারণা বুঝতে সাহায্য করবে এবং জীবনের রহস্য উন্মোচনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

আসুন, এই যাত্রা শুরু করি এবং আমাদের চারপাশের জীবনের অবিশ্বাস্য নির্মাণশৈলী সম্পর্কে গভীরভাবে উপলব্ধি করি। কোষ হলো সেই ক্ষুদ্র ইঁট, যা দিয়ে জীবন্ত প্রাণীর বিশাল প্রাসাদ তৈরি হয়। এই ক্ষুদ্র এককের মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সমস্ত জটিলতা এবং সৌন্দর্য। কোষকে ভালোভাবে না জানলে জীবের গঠন ও কার্যপ্রণালী বোঝা অসম্ভব। এটি শুধুমাত্র একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং আমাদের শরীরের প্রতিটি মুহূর্তের কাজ, প্রতিটি রোগ বা সুস্থতার পেছনে এর ভূমিকা অপরিসীম।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

কোষ কী?

কোষ (Cell) হলো সকল সজীব বস্তুর গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক। ল্যাটিন শব্দ 'cella' থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ 'ক্ষুদ্র কক্ষ'। ১৬৬৫ সালে রবার্ট হুক তাঁর স্ব-নির্মিত অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে কর্কের পাতলা ছেদ পর্যবেক্ষণ করে মধুচক্রের মতো কিছু ক্ষুদ্র কক্ষ দেখতে পান এবং এদের নাম দেন কোষ। কিন্তু রবার্ট হুক যে কোষ দেখেছিলেন, সেগুলো ছিল মৃত কোষ প্রাচীর। পরবর্তীতে অ্যান্টনি ভন লিউয়েনহুক সর্বপ্রথম জীবিত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন।

কোষ তত্ত্ব (Cell Theory)

১৮৩৮-১৮৩৯ সালে জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী Schleiden এবং প্রাণিবিজ্ঞানী Schwann কোষ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে Rudolf Virchow ১৮৫৫ সালে এই তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন করেন। কোষ তত্ত্বের মূল বিষয়গুলি হলো:

  • সকল জীব এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। এর অর্থ হলো, আমরা আশেপাশে যত গাছপালা, প্রাণী বা অণুজীব দেখি, সবই কোষ দিয়ে তৈরি।
  • কোষ হলো জীবনের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক। যেমন একটি বাড়ির ক্ষুদ্রতম একক হলো ইঁট, তেমনই একটি জীবের ক্ষুদ্রতম একক হলো কোষ। সমস্ত জীবন প্রক্রিয়া কোষের মধ্যেই ঘটে।
  • সকল নতুন কোষ পূর্ববর্তী কোষ থেকে সৃষ্ট হয়। এই ধারণাটি Rudolf Virchow 'Omnis cellula e cellula' অর্থাৎ 'সকল কোষ কোষ থেকে আসে' – এই উক্তির মাধ্যমে প্রকাশ করেন। এর মানে হলো, কোষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপন্ন হয় না, বরং বিভাজনের মাধ্যমে বিদ্যমান কোষ থেকেই নতুন কোষের সৃষ্টি হয়।

কোষের প্রকারভেদ: প্রোকারিওটিক ও ইউকারিওটিক কোষ

কোষকে মূলত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, তাদের অভ্যন্তরীণ গঠনের জটিলতা এবং নিউক্লিয়াসের উপস্থিতির ভিত্তিতে:

১. প্রোকারিওটিক কোষ (Prokaryotic Cell)

  • সংজ্ঞা: যে কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং নিউক্লীয় পর্দা থাকে না এবং পর্দাবেষ্টিত কোষ অঙ্গাণু অনুপস্থিত, তাকে প্রোকারিওটিক কোষ বলে।
  • বৈশিষ্ট্য:
    • এদের নিউক্লিয়ার বস্তু (DNA) সাইটোপ্লাজমে ছড়িয়ে থাকে, যাকে নিউক্লিওয়েড (Nucleoid) বলে।
    • পর্দাবেষ্টিত কোষ অঙ্গাণু (যেমন – মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলগি বডি, ক্লোরোপ্লাস্ট) থাকে না।
    • রাইবোজোম উপস্থিত থাকে, যা প্রোটিন সংশ্লেষণ করে।
    • সাধারণত আকারে ছোট হয় (১-১০ µm)।
    • উদাহরণ: ব্যাকটেরিয়া, সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ সবুজ শৈবাল)।

২. ইউকারিওটিক কোষ (Eukaryotic Cell)

  • সংজ্ঞা: যে কোষে সুগঠিত নিউক্লিয়াস নিউক্লীয় পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে এবং পর্দাবেষ্টিত কোষ অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে, তাকে ইউকারিওটিক কোষ বলে।
  • বৈশিষ্ট্য:
    • এদের DNA নিউক্লিয়াসের মধ্যে ক্রোমোজোম আকারে সজ্জিত থাকে।
    • বিভিন্ন ধরনের পর্দাবেষ্টিত কোষ অঙ্গাণু (যেমন – মাইটোকন্ড্রিয়া, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম, গলগি বডি, লাইসোসোম, ক্লোরোপ্লাস্ট) উপস্থিত থাকে, যা কোষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে।
    • আকারে প্রোকারিওটিক কোষের চেয়ে বড় হয় (১০-১০০ µm)।
    • উদাহরণ: উদ্ভিদ কোষ, প্রাণী কোষ, ছত্রাক কোষ, শৈবাল কোষ।

উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের পার্থক্য

ইউকারিওটিক কোষের দুটি প্রধান প্রকার হলো উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষ, যাদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

  • কোষ প্রাচীর: উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীর উপস্থিত থাকে, যা সেলুলোজ দিয়ে গঠিত এবং কোষকে দৃঢ়তা ও সুরক্ষা দেয়। প্রাণী কোষে কোষ প্রাচীর অনুপস্থিত।
  • ক্লোরোপ্লাস্ট: উদ্ভিদ কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট থাকে, যা সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরিতে সাহায্য করে। প্রাণী কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট অনুপস্থিত।
  • vacuoles: উদ্ভিদ কোষে একটি বড় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থাকে, যা কোষের প্রায় ৯০% স্থান দখল করতে পারে এবং জল ও বর্জ্য পদার্থ জমা করে। প্রাণী কোষে ভ্যাকুওল ছোট এবং সংখ্যায় একাধিক হতে পারে, অথবা নাও থাকতে পারে।
  • সেন্ট্রোজোম: প্রাণী কোষে সেন্ট্রোজোম উপস্থিত থাকে, যা কোষ বিভাজনে অংশ নেয়। উদ্ভিদ কোষে সেন্ট্রোজোম সাধারণত অনুপস্থিত (তবে কিছু নিম্নশ্রেণির উদ্ভিদে থাকতে পারে)।
  • কোষের আকার: উদ্ভিদ কোষ সাধারণত নিয়মিত ও আয়তাকার হয়। প্রাণী কোষ সাধারণত অনিয়মিত ও গোলাকার হয়।

কোষের প্রধান অংশসমূহ (Cell Organelles)

একটি ইউকারিওটিক কোষে বিভিন্ন ধরনের সুনির্দিষ্ট অংশ থাকে, যাদের কোষ অঙ্গাণু (Cell Organelles) বলা হয়। প্রতিটি অঙ্গাণুর নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে।

১. প্লাজমা মেমব্রেন বা কোষপর্দা (Plasma Membrane)

  • গঠন: এটি একটি অত্যন্ত পাতলা, স্থিতিস্থাপক, অর্ধ-ভেদ্য এবং জীবিত পর্দা যা লিপিড (ফসফোলিপিড বাইলেয়ার) এবং প্রোটিন দিয়ে গঠিত। এতে কার্বোহাইড্রেটও থাকতে পারে। এটি কোষের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক পরিবেশের মধ্যে একটি সীমানা তৈরি করে।
  • কার্যকারিতা:
    • নির্বাচনমূলক প্রবেশ্যতা: এটি কিছু নির্দিষ্ট অণুকে কোষের ভিতরে ঢুকতে বা বাইরে যেতে দেয়, কিন্তু অন্যদের বাধা দেয়। এজন্য এটিকে 'নির্বাচনমূলক ভেদ্য পর্দা' (selectively permeable membrane) বলা হয়।
    • কোষের আকার বজায় রাখা: এটি কোষকে নির্দিষ্ট আকার প্রদান করে।
    • বস্তু পরিবহন: ব্যাপন (diffusion) এবং অভিস্রবণ (osmosis) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদার্থের আনাগোনা নিয়ন্ত্রণ করে।
    • কোষের রক্ষা: বাহ্যিক আঘাত থেকে কোষকে রক্ষা করে।
    • এন্ডোসাইটোসিস ও এক্সোসাইটোসিস: অ্যামিবার মতো এককোষী জীবে প্লাজমা মেমব্রেন খাদ্য গ্রহণ (এন্ডোসাইটোসিস) এবং বর্জ্য নিষ্কাশন (এক্সোসাইটোসিস) প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • ব্যাপন: উচ্চ ঘনত্ব থেকে নিম্ন ঘনত্বের দিকে কণাগুলির স্বতঃস্ফূর্ত চলাচল। এটি গ্যাসীয় এবং তরল পদার্থের পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, অক্সিজেনের কোষের ভিতরে প্রবেশ এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের বাইরে নির্গমন।
  • অভিস্রবণ: একটি অর্ধ-ভেদ্য পর্দার মধ্য দিয়ে দ্রাবক অণু (সাধারণত জল) এর উচ্চ ঘনত্ব থেকে নিম্ন ঘনত্বের দিকে চলাচল। কোষের জলীয় ভারসাম্য রক্ষায় এটি অত্যাবশ্যক।
    • হাইপোটোনিক সলিউশন: কোষের বাইরের দ্রবণে জলের ঘনত্ব কোষের ভেতরের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হলে জল কোষের ভিতরে প্রবেশ করে, ফলে কোষ ফুলে ওঠে।
    • আইসোটোনিক সলিউশন: কোষের বাইরের ও ভেতরের জলের ঘনত্ব সমান হলে কোনো নেট জল চলাচল হয় না, কোষের আকার অপরিবর্তিত থাকে।
    • হাইপারটোনিক সলিউশন: কোষের বাইরের দ্রবণে জলের ঘনত্ব কোষের ভেতরের ঘনত্বের চেয়ে কম হলে জল কোষ থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে, ফলে কোষ সংকুচিত হয় (প্লাজমোলাইসিস)।

২. কোষ প্রাচীর (Cell Wall) – শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোষে

  • গঠন: উদ্ভিদ কোষে প্লাজমা মেমব্রেনের বাইরে একটি পুরু, অনমনীয়, মৃত এবং সম্পূর্ণ ভেদ্য স্তর থাকে, যাকে কোষ প্রাচীর বলে। এটি সেলুলোজ, হেমি-সেলুলোজ, পেক্টিন এবং লিগনিন দিয়ে তৈরি।
  • কার্যকারিতা:
    • সুরক্ষা: এটি কোষকে যান্ত্রিক চাপ এবং সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
    • দৃঢ়তা: কোষকে নির্দিষ্ট আকার এবং দৃঢ়তা প্রদান করে।
    • অতিঅভিস্রবণ প্রতিরোধ: হাইপোটোনিক দ্রবণে কোষ অতিরিক্ত জল শোষণ করে ফেটে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। কোষ প্রাচীর এর অনমনীয়তার কারণে কোষ ফুলে গেলেও ফেটে যায় না।
    • কোষ থেকে কোষ যোগাযোগ: প্লাজমাডেজমাটা নামক ছিদ্রের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী কোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে।

৩. নিউক্লিয়াস (Nucleus)

  • গঠন: এটি সাধারণত কোষের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি গোলাকার বা ডিম্বাকার অঙ্গাণু এবং ইউকারিওটিক কোষের সবচেয়ে বিশিষ্ট অংশ। এটি একটি দ্বি-স্তরীয় নিউক্লীয় পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে, যা নিউক্লীয় ছিদ্র (nuclear pores) দ্বারা যুক্ত। এই ছিদ্রগুলি নিউক্লিয়াস এবং সাইটোপ্লাজমের মধ্যে পদার্থের আদান-প্রদান নিয়ন্ত্রণ করে। নিউক্লিয়াসের ভিতরে নিউক্লিওপ্লাজম (nucleoplasm), ক্রোমাটিন জালিকা (chromatin network) এবং নিউক্লিওলাস (nucleolus) থাকে।
  • ক্রোমাটিন জালিকা: এটি DNA, প্রোটিন (হিস্টোন প্রোটিন) এবং RNA দিয়ে গঠিত জালের মতো একটি গঠন। কোষ বিভাজনের সময় ক্রোমাটিন জালিকা ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। ক্রোমোজোম হলো বংশগতির ধারক ও বাহক, যা পিতামাতার বৈশিষ্ট্যগুলি সন্তানদের মধ্যে বহন করে।
  • নিউক্লিওলাস: এটি নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি ঘন গোলাকার গঠন, যেখানে রাইবোজোম সংশ্লেষিত হয়।
  • কার্যকারিতা:
    • কোষের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র: নিউক্লিয়াস কোষের সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই একে কোষের মস্তিষ্ক (Brain of the cell) বলা হয়।
    • বংশগতির ধারক: ক্রোমোজোম ধারণ করে এবং বংশগত তথ্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত করে।
    • প্রোটিন সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ: জিনগুলির মাধ্যমে প্রোটিন সংশ্লেষণকে নির্দেশ দেয়।
    • কোষ বিভাজন: কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া শুরু ও নিয়ন্ত্রণ করে।

৪. সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm)

  • গঠন: এটি প্লাজমা মেমব্রেন এবং নিউক্লিয়াসের মাঝখানে অবস্থিত জেলের মতো, অর্ধ-তরল স্বচ্ছ পদার্থ। এর প্রধান উপাদান হলো জল, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, লিপিড, নিউক্লিক অ্যাসিড, ভিটামিন এবং বিভিন্ন আয়ন। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু ভাসমান থাকে।
  • কার্যকারিতা:
    • রাসায়নিক বিক্রিয়ার স্থান: কোষের অধিকাংশ বিপাকীয় কার্যকলাপ (যেমন – গ্লাইকোলাইসিস) সাইটোপ্লাজমে ঘটে।
    • কোষ অঙ্গাণু ধারণ: মাইটোকন্ড্রিয়া, ER, গলগি বডি ইত্যাদির মতো সমস্ত কোষ অঙ্গাণু এর মধ্যে থাকে।
    • বস্তু পরিবহন: কোষের মধ্যে বিভিন্ন বস্তুর পরিবহনে সাহায্য করে।

৫. এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Endoplasmic Reticulum - ER)

  • গঠন: এটি সাইটোপ্লাজমে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য নলাকার এবং থলির মতো কাঠামোর (সিস্টারনি) একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। এটি নিউক্লীয় পর্দা থেকে শুরু হয়ে প্লাজমা মেমব্রেন পর্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রধানত দুটি প্রকার রয়েছে:
    • মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (SER - Smooth Endoplasmic Reticulum): এর পৃষ্ঠে রাইবোজোম থাকে না, তাই এটি মসৃণ দেখায়।
    • অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (RER - Rough Endoplasmic Reticulum): এর পৃষ্ঠে রাইবোজোম সংযুক্ত থাকে, তাই এটি অমসৃণ দেখায়।
  • কার্যকারিতা:
    • RER এর কাজ: রাইবোজোমের উপস্থিতির কারণে এটি প্রোটিন সংশ্লেষণ এবং সেই প্রোটিনগুলিকে কোষের বিভিন্ন অংশে পরিবহন করতে সাহায্য করে। এই প্রোটিনগুলি মূলত কোষের বাইরে নিঃসৃত হয় বা কোষপর্দায় ব্যবহৃত হয়।
    • SER এর কাজ: লিপিড সংশ্লেষণ, স্টেরয়েড হরমোন সংশ্লেষণ এবং কোষে প্রবেশকারী বিষাক্ত পদার্থকে (যেমন, ঔষধ) ডিটক্সিফাই করতে সাহায্য করে। পেশী কোষে SER ক্যালসিয়াম আয়ন সঞ্চয় করে, যা পেশী সংকোচনে গুরুত্বপূর্ণ।
    • পরিবহন পথ: ER কোষের ভিতরে বিভিন্ন পদার্থের পরিবহনের জন্য একটি পথ তৈরি করে, বিশেষ করে নিউক্লিয়াস থেকে সাইটোপ্লাজমে এবং সাইটোপ্লাজম থেকে নিউক্লিয়াসে।
    • যান্ত্রিক সমর্থন: কোষের অভ্যন্তরীণ কঙ্কাল (endoskeleton) হিসাবে কাজ করে।

৬. গলগি অ্যাপারেটাস বা গলগি বডি (Golgi Apparatus/Golgi Body)

  • গঠন: এটি চ্যাপ্টা থলির (সিস্টারনি) মতো সজ্জিত একটি অঙ্গাণু যা একটার উপর আরেকটা স্তূপ করে রাখা থাকে। ইতালীয় বিজ্ঞানী ক্যামিলো গলগি এটি আবিষ্কার করেন। এর দুটি পৃষ্ঠ আছে – একটি সিস (গঠনকারী) পৃষ্ঠ এবং একটি ট্রান্স (পরিপক্ককারী) পৃষ্ঠ।
  • কার্যকারিতা:
    • প্যাকেজিং এবং পরিবহন: ER এ সংশ্লেষিত প্রোটিন এবং লিপিড গলগি বডিতে আসে, যেখানে সেগুলিকে প্রক্রিয়া করা হয়, প্যাকেজ করা হয় এবং কোষের ভিতরে বা বাইরে তাদের গন্তব্যে পাঠানো হয়।
    • সংশ্লেষণ: কিছু জটিল শর্করা (যেমন সেলুলোজ) গলগি বডিতে সংশ্লেষিত হয়।
    • লাইসোসোম গঠন: গলগি বডি লাইসোসোম গঠনেও জড়িত।
    • কোষ প্রাচীর গঠন: উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীর গঠনের উপাদান সরবরাহ করে।

৭. লাইসোসোম (Lysosomes)

  • গঠন: এগুলি একক পর্দা দ্বারা আবৃত ক্ষুদ্র থলির মতো অঙ্গাণু, যা হাইড্রোলাইটিক এনজাইম (পাচক এনজাইম) দ্বারা পূর্ণ থাকে। এই এনজাইমগুলি গলগি বডিতে প্যাকেজ করা হয়।
  • কার্যকারিতা:
    • কোষের পরিষ্কারক: লাইসোসোম কোষের আবর্জনা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। এরা কোষের মধ্যে প্রবেশ করা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পুরানো বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ অঙ্গাণু হজম করে।
    • আত্মঘাতী থলি (Suicidal Bags): যখন কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়, তখন লাইসোসোমগুলি ফেটে যায় এবং তাদের এনজাইমগুলি নিজেদের কোষকে হজম করে ফেলে। এই কারণে তাদের 'কোষের আত্মঘাতী থলি' বলা হয়।

৮. মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria)

  • গঠন: এগুলি ডিম্বাকার বা দণ্ডাকার দ্বি-পর্দা বিশিষ্ট অঙ্গাণু। বাইরের পর্দা মসৃণ এবং ভেতরের পর্দা ভিতরের দিকে ভাঁজ হয়ে আঙুলের মতো প্রবর্ধক সৃষ্টি করে, যাদের ক্রিস্টি (Cristae) বলে। ক্রিস্টির ভিতরে একটি তরল পদার্থ থাকে, যাকে ম্যাট্রিক্স (Matrix) বলে। ক্রিস্টি এবং ম্যাট্রিক্সে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম থাকে।
  • কার্যকারিতা:
    • কোষের শক্তিঘর (Powerhouse of the Cell): মাইটোকন্ড্রিয়াতে কোষীয় শ্বসন ঘটে, যার মাধ্যমে খাদ্য থেকে শক্তি উৎপন্ন হয় এবং অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) অণু আকারে সঞ্চিত হয়। ATP হলো কোষের শক্তির মুদ্রা, যা কোষের সকল রাসায়নিক কার্যকলাপের জন্য শক্তি সরবরাহ করে।
    • নিজস্ব DNA: মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব DNA এবং রাইবোজোম রয়েছে, তাই এরা নিজেদের কিছু প্রোটিন সংশ্লেষণ করতে পারে এবং আংশিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত।

৯. প্লাস্টিড (Plastids) – শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোষে

  • গঠন: এগুলিও দ্বি-পর্দা বিশিষ্ট অঙ্গাণু এবং শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোষ ও কিছু শৈবালে পাওয়া যায়। প্লাস্টিড প্রধানত তিন প্রকারের হয়:
    • ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast): এতে সবুজ রঞ্জক পদার্থ ক্লোরোফিল থাকে। এর ভিতরে থাইলাকয়েড (Thylakoids) নামক চ্যাপ্টা থলির মতো গঠন থাকে, যা স্ট্যাকের মতো সাজানো থাকে (গ্রানাম)। স্ট্রোমা (Stroma) নামক তরল পদার্থ এই গ্রানামগুলিকে ঘিরে থাকে।
    • ক্রোমোসোম (Chromoplast): এতে ক্লোরোফিল ছাড়া অন্যান্য রঞ্জক পদার্থ (যেমন - লাল, কমলা, হলুদ) থাকে, যা ফুল ও ফলের রঙ নির্ধারণ করে।
    • লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast): এগুলি বর্ণহীন প্লাস্টিড, যা খাদ্য সঞ্চয় করে (যেমন – শ্বেতসার, তেল, প্রোটিন)।
  • কার্যকারিতা:
    • ক্লোরোপ্লাস্ট: সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য (শর্করা) উৎপাদন করে। এরা সূর্যালোক শোষণ করে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
    • ক্রোমোসোম: ফুল ও ফলকে আকর্ষণীয় করে পরাগায়ন ও বীজ বিস্তারে সাহায্য করে।
    • লিউকোপ্লাস্ট: খাদ্য সঞ্চয় করে।
    • প্লাস্টিডগুলিরও নিজস্ব DNA এবং রাইবোজোম থাকে।

১০. রাইবোজোম (Ribosomes)

  • গঠন: এগুলি ক্ষুদ্র, ঝিল্লিবিহীন কোষ অঙ্গাণু যা RNA এবং প্রোটিন দিয়ে গঠিত। এরা সাইটোপ্লাজমে মুক্ত অবস্থায় থাকতে পারে অথবা এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (RER) এর সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে।
  • কার্যকারিতা:
    • প্রোটিন সংশ্লেষণ: রাইবোজোম হলো প্রোটিন তৈরির কারখানা (Protein Factories)। এগুলি mRNA থেকে নির্দেশাবলী গ্রহণ করে অ্যামিনো অ্যাসিডগুলিকে একত্রিত করে প্রোটিন তৈরি করে।

১১. ভ্যাকুওল (Vacuoles)

  • গঠন: এগুলি একক পর্দা দ্বারা আবৃত থলির মতো গঠন, যার মধ্যে জল, স্যাপ (কোষ রস), বর্জ্য পদার্থ এবং অন্যান্য উপাদান জমা থাকে। উদ্ভিদ কোষে একটি বড় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থাকে, যা কোষের প্রায় ৫০-৯০% স্থান দখল করতে পারে। প্রাণী কোষে ভ্যাকুওল ছোট এবং অস্থায়ী হয়, অথবা অনুপস্থিতও থাকতে পারে।
  • কার্যকারিতা:
    • জল ও বর্জ্য সঞ্চয়: জল, আয়ন, পুষ্টি উপাদান এবং বর্জ্য পদার্থ সঞ্চয় করে।
    • কোষের টর্গিডিটি বজায় রাখা: উদ্ভিদ কোষে ভ্যাকুওল জল শোষণ করে কোষের টারগর চাপ (turgor pressure) বজায় রাখে, যা কোষকে স্ফীত ও দৃঢ় রাখে।
    • ক্ষতিকর বর্জ্য নিষ্কাশন: অ্যামিবার মতো এককোষী জীবে ভ্যাকুওল খাদ্য গ্রহণ (খাদ্য ভ্যাকুওল) এবং অতিরিক্ত জল ও বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনে (সংকোচনশীল ভ্যাকুওল) সাহায্য করে।

১২. সেন্ট্রোজোম (Centrosome) – শুধুমাত্র প্রাণী কোষে

  • গঠন: এটি নিউক্লিয়াসের কাছে অবস্থিত একটি অঙ্গাণু যা দুটি সেন্ট্রিওল (Centriole) নিয়ে গঠিত। সেন্ট্রিওলগুলি পরস্পর লম্বভাবে অবস্থিত এবং প্রতিটিতে ৯টি ট্রিপলেট মাইক্রোটিউবুল থাকে।
  • কার্যকারিতা:
    • কোষ বিভাজন: কোষ বিভাজনের সময় বেম তন্তু (spindle fibers) গঠনে সাহায্য করে।
    • সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলার গঠন: সিলিয়া ও ফ্ল্যাজেলার ভিত্তিদেহ (basal body) গঠনেও সেন্ট্রিওল জড়িত।

কোষ বিভাজন (Cell Division)

সকল নতুন কোষ পূর্ববর্তী কোষ থেকে উৎপন্ন হয় কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। এটি জীবের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ এবং জননের জন্য অপরিহার্য। প্রধানত দুই ধরনের কোষ বিভাজন দেখা যায়:

  • মাইটোসিস (Mitosis): দেহ কোষে ঘটে। একটি মাতৃকোষ থেকে দুটি অপত্য কোষ তৈরি হয়, যারা জিনগতভাবে মাতৃকোষের হুবহু সদৃশ হয়। এর ফলে জীবের বৃদ্ধি হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষের মেরামত ঘটে।
  • মিয়োসিস (Meiosis): জনন কোষে (গ্যামেট) ঘটে। একটি মাতৃকোষ থেকে চারটি অপত্য কোষ তৈরি হয়, যাদের ক্রোমোজোম সংখ্যা মাতৃকোষের অর্ধেক হয়। এটি যৌন জননের জন্য অপরিহার্য এবং প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

এই বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমরা কোষের প্রতিটি অংশের গুরুত্ব এবং তাদের সম্মিলিত কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছি। জীবনের এই ক্ষুদ্রতম একক কীভাবে এত জটিল এবং সুসংগঠিতভাবে কাজ করে, তা সত্যিই অসাধারণ।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: কোষকে 'জীবনের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক' বলা হয় কেন?

উত্তর: কোষকে 'জীবনের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একক' বলা হয় কারণ: প্রথমত, গঠনগত একক: সকল জীব এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত। একটি বাড়ি যেমন ইঁট দিয়ে তৈরি হয়, তেমনি একটি জীবের শরীর কোষ দিয়ে গঠিত। কোষের বাইরে কোনো স্বাধীন সত্তা নেই যা জীবন্ত বলে বিবেচিত হতে পারে। জীবনের সকল প্রকারের সংগঠন কোষ থেকেই শুরু হয়। দ্বিতীয়ত, কার্যগত একক: কোষ জীবনের সকল মৌলিক কাজ যেমন – পুষ্টি গ্রহণ, শ্বসন, রেচন, জনন এবং পরিবেশের প্রতি সাড়া দেওয়া ইত্যাদি সম্পন্ন করতে সক্ষম। কোষের ভেতরে থাকা বিভিন্ন অঙ্গাণু নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে সম্মিলিতভাবে কোষের জীবন বজায় রাখে। একটি একক কোষ যেমন অ্যামিবা নিজেই একটি সম্পূর্ণ জীব হিসেবে বেঁচে থাকতে পারে এবং তার সমস্ত জীবন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। তাই, জীবনের সকল কার্যকলাপ কোষের মধ্যেই ঘটে এবং এর থেকেই সকল জীবের কাঠামো তৈরি হয়।

প্রশ্ন ২: লাইসোসোমকে কেন 'কোষের আত্মঘাতী থলি' (Suicidal Bags) বলা হয়?

উত্তর: লাইসোসোমকে 'কোষের আত্মঘাতী থলি' বলা হয় কারণ এর মধ্যে শক্তিশালী পাচক এনজাইম থাকে যা জৈব পদার্থকে হজম করতে সক্ষম। যখন কোনো কোষের ক্ষতি হয় বা এটি বুড়ো হয়ে যায়, তখন লাইসোসোমগুলি ফেটে যেতে পারে এবং তাদের এনজাইমগুলি বেরিয়ে এসে কোষের নিজস্ব উপাদানগুলিকে হজম করে ফেলে। এটি কোষের অভ্যন্তরীণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, ক্ষতিগ্রস্ত বা অপ্রয়োজনীয় কোষ উপাদানগুলিকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু যখন কোষ গুরুতরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় বা প্রোগ্রামড সেল ডেথ (অ্যাপোপটোসিস) এর সময় আসে, তখন লাইসোসোমের এই আত্ম-হজমের ক্ষমতা কোষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে কোষটি নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে। এই কারণে লাইসোসোমকে 'আত্মঘাতী থলি' উপাধি দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন ৩: মাইটোকন্ড্রিয়াকে কেন 'কোষের শক্তিঘর' বলা হয় এবং এর গঠনগত বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী?

উত্তর: মাইটোকন্ড্রিয়াকে 'কোষের শক্তিঘর' (Powerhouse of the Cell) বলা হয় কারণ এটি কোষের মধ্যে শক্তি উৎপাদন এবং সঞ্চয়ের প্রধান স্থান। কোষীয় শ্বসন প্রক্রিয়া মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যেই সম্পন্ন হয়, যেখানে খাদ্য থেকে উৎপাদিত শক্তি অ্যাডেনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) অণু আকারে জমা হয়। ATP হলো কোষের 'শক্তির মুদ্রা', যা কোষের বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। মাইটোকন্ড্রিয়ার গঠনগত বৈশিষ্ট্য হলো এটি দ্বি-পর্দা বিশিষ্ট অঙ্গাণু। এর বাইরের পর্দাটি মসৃণ এবং ভেতরের পর্দাটি ভিতরের দিকে অসংখ্য ভাঁজ তৈরি করে, যাদের ক্রিস্টি (Cristae) বলে। এই ক্রিস্টিগুলি মাইটোকন্ড্রিয়ার পৃষ্ঠতল বৃদ্ধি করে, যা শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলির কার্যকারিতার ক্ষেত্র বাড়িয়ে দেয়। ক্রিস্টির অভ্যন্তরে একটি জেলির মতো তরল পদার্থ থাকে যাকে ম্যাট্রিক্স (Matrix) বলে, যেখানে নিজস্ব DNA, রাইবোজোম এবং বিভিন্ন এনজাইম উপস্থিত থাকে। এই অনন্য গঠন এটিকে দক্ষভাবে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম করে তোলে।

প্রশ্ন ৪: উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য উল্লেখ করুন।

উত্তর: উদ্ভিদ কোষ ও প্রাণী কোষের মধ্যে দুটি প্রধান পার্থক্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. কোষ প্রাচীর: উদ্ভিদ কোষে প্লাজমা মেমব্রেনের বাইরে একটি দৃঢ়, মৃত কোষ প্রাচীর থাকে যা সেলুলোজ দিয়ে গঠিত। এই কোষ প্রাচীর উদ্ভিদ কোষকে নির্দিষ্ট আকার, যান্ত্রিক শক্তি এবং সুরক্ষা প্রদান করে। প্রাণী কোষে কোনো কোষ প্রাচীর থাকে না; তাদের সবচেয়ে বাইরের আবরণ হলো প্লাজমা মেমব্রেন।
  2. ক্লোরোপ্লাস্ট: উদ্ভিদ কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট নামক অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে, যার মধ্যে সবুজ রঞ্জক ক্লোরোফিল থাকে। ক্লোরোপ্লাস্ট সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্যালোক ব্যবহার করে খাদ্য (শর্করা) সংশ্লেষণ করে। প্রাণী কোষে ক্লোরোপ্লাস্ট অনুপস্থিত থাকায় তারা নিজেদের খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে না এবং খাদ্যের জন্য অন্য জীবের উপর নির্ভরশীল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে আমরা জীবনের মৌলিক একক কোষ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কোষ হলো জীবনের গঠনগত ও কার্যগত ভিত্তি, যা রবার্ট হুক আবিষ্কার করেন এবং কোষ তত্ত্বের মাধ্যমে এর সর্বজনীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

মূল বিষয়গুলি হলো:

  • কোষ তত্ত্ব: সকল জীব কোষ দ্বারা গঠিত, কোষ জীবনের মৌলিক একক এবং সকল নতুন কোষ পূর্ববর্তী কোষ থেকে আসে।
  • কোষের প্রকারভেদ: নিউক্লিয়াসের গঠনের ওপর ভিত্তি করে প্রোকারিওটিক (সুগঠিত নিউক্লিয়াস নেই) এবং ইউকারিওটিক (সুগঠিত নিউক্লিয়াস আছে) কোষ।
  • কোষ অঙ্গাণু:
    • প্লাজমা মেমব্রেন: কোষের বাইরের আবরণ, নির্বাচনমূলক ভেদ্য পর্দা।
    • কোষ প্রাচীর (উদ্ভিদ): দৃঢ়তা ও সুরক্ষা প্রদানকারী।
    • নিউক্লিয়াস: কোষের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, বংশগত উপাদান (DNA) ধারণ করে।
    • সাইটোপ্লাজম: কোষ অঙ্গাণু ধারণকারী জেলের মতো পদার্থ।
    • এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম: প্রোটিন ও লিপিড সংশ্লেষণ এবং পরিবহনে জড়িত (RER: প্রোটিন, SER: লিপিড)।
    • গলগি অ্যাপারেটাস: প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াকরণ ও পরিবহন কেন্দ্র।
    • লাইসোসোম: পাচক এনজাইম ধারণকারী 'আত্মঘাতী থলি'।
    • মাইটোকন্ড্রিয়া: 'কোষের শক্তিঘর', ATP উৎপাদন করে।
    • প্লাস্টিড (উদ্ভিদ): ক্লোরোপ্লাস্ট সালোকসংশ্লেষণ করে, ক্রোমোসোম রঙ দেয়, লিউকোপ্লাস্ট খাদ্য সঞ্চয় করে।
    • রাইবোজোম: প্রোটিন তৈরির কারখানা।
    • ভ্যাকুওল: জল, বর্জ্য ও পুষ্টি সঞ্চয়, টারগর চাপ বজায় রাখে।
    • সেন্ট্রোজোম (প্রাণী): কোষ বিভাজনে সাহায্য করে।
  • কোষ বিভাজন: জীবের বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ এবং জননের জন্য মাইটোসিস ও মিয়োসিস।

এই কোষগুলি সম্মিলিতভাবে এবং সুসংগঠিতভাবে কাজ করে জীবনের সমস্ত জটিল প্রক্রিয়াগুলিকে পরিচালনা করে। কোষের এই মৌলিক জ্ঞান জীববিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় আরও গভীর অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়।