বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের পৃথিবী কখনোই স্থির নয়। এর ভেতরে এবং বাইরে প্রতিনিয়ত নানা পরিবর্তন ঘটে চলেছে। সপ্তম শ্রেণি ভূগোলের তৃতীয় অধ্যায় 'আমাদের বদলাতে থাকা পৃথিবী'-তে আমরা শিখব কীভাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক শক্তিগুলো আমাদের এই পৃথিবীকে রূপ দিয়ে চলেছে। এই অধ্যায়টি আমাদের গ্রহের গতিশীল প্রকৃতি বুঝতে অত্যন্ত সাহায্য করে। লিথোস্ফিয়রিক প্লেটের নড়াচড়া থেকে শুরু করে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবং নদী বা বাতাসের মতো প্রাকৃতিক শক্তির কাজ—সবকিছুই এই অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়। নিচে আমরা এই বিষয়গুলো খুব সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পৃথিবীর পরিবর্তনশীল রূপের পেছনে প্রধানত দুটি শক্তি কাজ করে:

  • অন্তর্জাত বল (Endogenic Forces): যে বলগুলি পৃথিবীর অভ্যন্তরে উৎপন্ন হয়, তাদের অন্তর্জাত বল বলে। যেমন—ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির উদগিরণ।
  • বহির্জাত বল (Exogenic Forces): যে বলগুলি পৃথিবীর বাইরে বা উপরিভাগে কাজ করে, তাদের বহির্জাত বল বলে। যেমন—নদী, বাতাস, হিমবাহ এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের কাজ।

লিথোস্ফিয়রিক প্লেট বা শিলায়মণ্ডলের পাত

আমাদের পৃথিবীর শক্ত ওপরের আবরণ বা লিথোস্ফিয়ার বেশ কয়েকটি টুকরোয় বিভক্ত। এদের লিথোস্ফিয়রিক প্লেট বা শিলায়মণ্ডলের পাত বলা হয়। আপনি জেনে অবাক হবেন যে এই পাতগুলি অত্যন্ত ধীর গতিতে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমার ওপর ভাসমান অবস্থায় চারপাশেই নড়াচড়া করছে। এই নড়াচড়া এতই ধীর যে বছরে মাত্র কয়েক মিলিমিটার হয়, কিন্তু কোটি কোটি বছরে এর ফলে পৃথিবীর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়।

ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরি

যখন এই শিলায়মণ্ডলের পাতগুলি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা ঘষা লাগে, তখন প্রচণ্ড শক্তির সৃষ্টি হয়। এর ফলে পৃথিবীর উপরিভাগে কম্পন অনুভূত হয়, যাকে আমরা ভূমিকম্প (Earthquake) বলি। ভূমিকম্পের উৎসকে বলা হয় উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টার (Epicentre)। অন্যদিকে, পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রচণ্ড চাপ ও তাপের কারণে গলিত magma যখন ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে আগ্নেয়গিরি (Volcano) বলে।

বহির্জাত প্রক্রিয়া এবং নদীর কাজ

পৃথিবীর উপরিভাগে শিলা ক্ষয় হওয়াকে আবহবিকার বলে। নদী, বাতাস, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তিগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থগুলোকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বয়ে নিয়ে যায়, যাকে বলে ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্য। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো নদী পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সমভূমিতে নামে, তখন তা বিভিন্ন ভূপ্রকৃতি তৈরি করে:

  • জলপ্রপাত (Waterfall): নদী যখন শক্ত শিলাস্তর পেরিয়ে নরম শিলার ওপর দিয়ে গড়ায়, তখন জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়।
  • মিয়েন্ডার (Meander): সমভূমিতে ঢোকার পর নদী বাঁক নিয়ে বয়ে চলে, যা সাপের মতো দেখায়।
  • বদ্বীপ (Delta): নদী যখন সাগরে মেশার কাছাকাছি আসে, তখন তার গতি কমে যায় এবং পলি জমে বদ্বীপ তৈরি করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: লিথোস্ফিয়রিক প্লেট কেন নড়াচড়া করে?
উত্তর: পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত ম্যাগমার বৃত্তাকার বা পরিচলন গতির (Convectional movement) কারণে লিথোস্ফিয়রিক প্লেটগুলি অত্যন্ত ধীর গতিতে নড়াচড়া করে।

প্রশ্ন ২: ভূমিকম্পের মাত্রা মাপা হয় কোন যন্ত্রের সাহায্যে?
উত্তর: ভূমিকম্পের তীব্রতা বা মাত্রা মাপার জন্য সিসমোগ্রাফ (Seismograph) নামক যন্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং এর তীব্রতা রিখটার স্কেলে (Richter scale) প্রকাশ করা হয়।

প্রশ্ন ৩: অক্সবো হ্রদ (Oxbow Lake) কীভাবে সৃষ্টি হয়?
উত্তর: নদীর বাঁক বা মিয়েন্ডার সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি বাঁক নিতে শুরু করে এবং একসময় মূল নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘোড়ার খুরের মতো যে হ্রদ তৈরি করে, তাকে অক্সবো হ্রদ বলে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা যে বিষয়গুলি শিখলাম তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • পৃথিবীর পরিবর্তনশীল রূপের জন্য অন্তর্জাত ও বহির্জাত—উভয় শক্তিই দায়ী।
  • লিথোস্ফিয়রিক প্লেটের নড়াচড়াই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির মূল কারণ।
  • নদী, বাতাস এবং হিমবাহ প্রকৃতির প্রধান ক্ষয় ও সঞ্চয়কারী এজেন্ট।
  • নদীর কাজের ফলে জলপ্রপাত, বদ্বীপ এবং অক্সবো হ্রদের মতো আকর্ষণীয় ভূদৃশ্য তৈরি হয়।