ঘটনার প্রেক্ষাপট

সালটা ১৯১৪। সুইডেনের গোথেনবার্গ শহরে তৈরি হলো এক ইস্পাত-কঠিন মালবাহী জাহাজ, নাম তার ‘আঙ্গারম্যানেলফেন’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কাছ থেকে যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ হিসেবে জাহাজটি পায় ব্রিটেন এবং ১৯২১ সালে এর মালিক হয় কানাডার হাডসন’স বে কোম্পানি। নতুন নাম হয় এসএস বেকিমো (SS Baychimo)। এরপর প্রায় এক দশক ধরে বেকিমো কানাডার উত্তরাঞ্চলের ইনুইট বসতিগুলোতে পশমের বিনিময়ে তামাক, অস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজ সফলভাবে করে যাচ্ছিল। কিন্তু ১৯৩১ সালের এক অভিশপ্ত সফর তার ভাগ্যকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়।

১ অক্টোবর, ১৯৩১। মূল্যবান পশমের এক বিশাল সম্ভার নিয়ে বেকিমো কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের দিকে ফিরছিল। কিন্তু আলাস্কার উত্তর উপকূলে পৌঁছানোর পরেই এক অপ্রত্যাশিত তুষারঝড় জাহাজটিকে ঘিরে ফেলে। ক্যাপ্টেন সিডনি কর্নওয়েল ও তার নাবিকেরা দেখলেন, জাহাজটি পুরু বরফের চাদরে আটকা পড়ে গেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে বরফের মধ্যেই আটকে রইল বেকিমো। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হাডসন’স বে কোম্পানি পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাদের ২২ জন নাবিককে আকাশপথে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু ক্যাপ্টেন ও তার বিশ্বস্ত ১৪ জন নাবিক জাহাজ ছেড়ে যেতে রাজি হলেন না। তারা ভাবলেন, শীতটা কোনোক্রমে কাটিয়ে দিতে পারলেই বসন্তে বরফ গলার সাথে সাথে জাহাজটিকে মুক্ত করে নিয়ে যাবেন।

রহস্যের জাল

২৪শে নভেম্বর রাতে ভয়ঙ্কর এক তুষারঝড় আছড়ে পড়ল। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, নাবিকেরা তাদের অস্থায়ী আশ্রয় থেকে বেরোনোর সাহসটুকুও করতে পারেননি। ঝড় থামার পর তারা যেখানে জাহাজটিকে শেষবার দেখেছিলেন, সেখানে ফিরে এসে দেখলেন চারদিকে কেবল বরফের ধ্বংসস্তূপ। বেকিমোর কোনো চিহ্নই নেই। তারা ধরে নিলেন, জাহাজটি ঝড়ের দাপটে বরফের নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু তারা ভুল ছিলেন।

কয়েকদিন পরেই এক ইনুইট শিকারি খবর দিলেন, তাদের পরিত্যক্ত শিবির থেকে প্রায় ৭২ কিলোমিটার দূরে বেকিমোকে ভাসতে দেখা গেছে। ক্যাপ্টেন ও তার সঙ্গীরা জাহাজটিকে খুঁজে বের করলেন। কিন্তু জাহাজের অবস্থা দেখে তাদের মনে হলো, এই ভয়ঙ্কর শীতে এটি টিকতে পারবে না। তাই জাহাজে থাকা সবচেয়ে মূল্যবান পশমগুলো উদ্ধার করে তারা চিরদিনের মতো বেকিমোকে তার ভাগ্যের হাতে ছেড়ে চলে এলেন। তারা ভাবতেও পারেননি, এটাই ছিল এক অবিশ্বাস্য রহস্যের শুরু।

এরপরের প্রায় চার দশক ধরে শুরু হলো বেকিমোর নিঃসঙ্গ যাত্রা। নাবিকবিহীন, উদ্দেশ্যহীন এই জাহাজটি একাই আর্কটিকের হিমশীতল সমুদ্রে ঘুরে বেড়াতে লাগল। মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অভিযাত্রী, শিকারি ও ইনুইটদের চোখে পড়ত জাহাজটি। ১৯৩২ সালের মার্চ মাসে এক অভিযাত্রী তাকে দেখেছিলেন। ১৯৩৩ সালে একদল ইনুইট ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ১০ দিন পর আবিষ্কার করেন যে জাহাজটি তাদের প্রায় ২৫০ মাইল দূরে নিয়ে এসেছে।

বহুবার মানুষ চেষ্টা করেছে জাহাজটিকে উদ্ধার করার। অনেকেই জাহাজের বোর্ডে পা রেখেছেন, কিন্তু প্রতিবারই আবহাওয়া বা অন্য কোনো রহস্যময় কারণে তাদের খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। ১৯৩৯ সালে ক্যাপ্টেন হিউ পলসন বেকিমোকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন, কিন্তু বরফের স্রোত তাকে পিছু হটতে বাধ্য করে। বেকিমো যেন নিজের স্বাধীন সত্তা খুঁজে পেয়েছিল; সে কারো হাতে ধরা দিতে রাজি ছিল না। বছরের পর বছর ধরে আর্কটিকের ভয়ঙ্কর ঝড় আর বরফের চাপ সহ্য করেও সে ভেসে বেড়িয়েছে, যা যেকোনো সাধারণ জাহাজের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

সত্যের উন্মোচন

বেকিমোকে শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৬৯ সালে, অর্থাৎ পরিত্যক্ত হওয়ার ৩৮ বছর পর। একদল ইনুইট তাকে আলাস্কার উপকূলে চুকচি সাগরে বরফের মধ্যে আবারও আটকে পড়া অবস্থায় দেখতে পান। এটাই ছিল এসএস বেকিমোর শেষ নথিভুক্ত sighting। এরপর আর কেউ কোনোদিন জাহাজটিকে দেখেনি।

বেকিমোর ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল? এর কোনো সঠিক উত্তর নেই। হয়তো অবশেষে কয়েক দশকের লড়াইয়ের পর সে সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে গেছে। অথবা, আজও সে উত্তর মেরুর কোনো দুর্গম প্রান্তে বরফের চাদরে মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে, মানুষের চোখের আড়ালে। ২০০৬ সালে আলাস্কা সরকার জাহাজটিকে খুঁজে বের করার একটি প্রকল্প ঘোষণা করলেও, তা সফল হয়নি।

এসএস বেকিমো আজ আর শুধু একটি জাহাজ নয়, এটি আর্কটিকের এক অদম্য কিংবদন্তি—এক ভূতুড়ে জাহাজ যা প্রায় চার দশক ধরে একাকী সমুদ্রের বুকে রাজত্ব করেছে। তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিতে এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যার কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)