ঘটনার প্রেক্ষাপট

সাল ১৯৬২, ৩০শে জানুয়ারি। পূর্ব আফ্রিকার বুকে সদ্য জেগে ওঠা এক নতুন দেশ টাঙ্গানিকা (আজকের তানজানিয়া)। ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পেরিয়েছে। বাতাসে তখন নতুন দিনের স্বপ্ন, নতুন দিনের আশা। সেই স্বপ্ন আর আশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম। তাদের ঘিরেই বোনা হচ্ছিল এক শক্তিশালী ভবিষ্যতের জাল।

ভিক্টোরিয়া হ্রদের পশ্চিম তীরে, কাশিষা গ্রামের শান্ত, ছিমছাম পরিবেশে একটি মিশন পরিচালিত বোর্ডিং স্কুল। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েরা সেখানে পড়াশোনা করে। বাইরে থেকে দেখলে সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশের বাতাসে ভাসমান বিপুল প্রত্যাশার চাপ হয়তো ছাত্রীদের কোমল মনেও ফেলছিল তার অদৃশ্য ছায়া। বাবা-মা, শিক্ষক—সবার চোখেমুখে একটাই স্বপ্ন: তাদের মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। এই নীরব চাপই হয়তো ভবিষ্যতের এক অদ্ভুত নাটকের মঞ্চ প্রস্তুত করছিল, যার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি।

সেদিনও ছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই সাধারণ। ক্লাস চলছিল, ছাত্রীরা মন দিয়ে শুনছিল তাদের পাঠ। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এমন এক ঘটনার সূত্রপাত হতে চলেছে, যা কেবল টাঙ্গানিকা নয়, গোটা বিশ্বকে হতবাক করে দেবে। এক অদৃশ্য শত্রু হানা দেবে এই শান্ত গ্রামে, যার অস্ত্র কোনো কামান-বন্দুক নয়, বরং মানুষের সবচেয়ে নির্মল অভিব্যক্তি—হাসি।

রহস্যের জাল

সবকিছুর শুরু হয়েছিল একটি নিরীহ রসিকতাকে কেন্দ্র করে। ক্লাসের মধ্যে তিন ছাত্রী হঠাৎই খিলখিল করে হেসে ওঠে। আপাতদৃষ্টিতে খুবই সাধারণ ঘটনা। শিক্ষকের বকুনিতে হয়তো সেই হাসি থেমেও যেত। কিন্তু তা হলো না। সেই হাসি আর থামল না। মিনিটের পর ঘণ্টা গড়াল, তিনজনের হাসি যেন আরও তীব্র, আরও দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। তাদের দেখে একে একে অন্য ছাত্রীরাও হাসতে শুরু করল।

কিন্তু এ কোনো আনন্দের হাসি ছিল না। এ ছিল এক যন্ত্রণাদায়ক, খিঁচুনি দেওয়া হাসি, যার ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। হাসতে হাসতে ছাত্রীরা ক্লাসরুমের মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে লাগল, তাদের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হাসি থামলেই শুরু হচ্ছিল কান্না, তীব্র চিৎকার আর সীমাহীন অস্থিরতা। কেউ কেউ জ্ঞান হারাচ্ছিল, আবার কারও শরীরে দেখা দিচ্ছিল র‍্যাশ। স্কুলের শিক্ষকরা অসহায় হয়ে ছোটাছুটি করতে লাগলেন, কিন্তু এই অদ্ভুত 'অসুখ'কে থামানোর কোনো উপায় তাদের জানা ছিল না।

খুব দ্রুত এই হাসির 'সংক্রমণ' স্কুলের ১৫৯ জন ছাত্রীর মধ্যে ৯৫ জনকে গ্রাস করে ফেলল। যাদের হাসি শুরু হচ্ছিল, তাদের থামতে কয়েক ঘণ্টা থেকে ১৬ দিন পর্যন্ত সময় লাগছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ আর কোনো উপায় না দেখে ১৯৬২ সালের ১৮ই মার্চ স্কুলটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলো। তারা ভেবেছিল, ছাত্রীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেই হয়তো এই অদ্ভুত পরিস্থিতি শান্ত হবে।

কিন্তু ফল হলো ঠিক তার উল্টো। ছাত্রীরা বাড়ি ফেরার সাথে সাথে এই অদৃশ্য মহামারী আগুনের মতো তাদের পরিবার ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। কাশিষা থেকে কয়েক মাইল দূরের গ্রাম এনশাম্বাতেও এই হাসির রোগ হানা দিল। এপ্রিল ও মে মাসের মধ্যে সেখানে আরও ২১৭ জন আক্রান্ত হলো। একের পর এক গ্রাম, একের পর এক স্কুল এই विचित्र মহামারীর কবলে পড়তে লাগল। পুরো অঞ্চলে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ বুঝতে পারছিল না এটা কীসের অভিশাপ। কেউ ভাবছিল ডাকিনীবিদ্যার প্রভাব, কেউ বা অশুভ আত্মার কাজ। ডাক্তার, বিজ্ঞানীরা ছুটে এলেন, কিন্তু কোনো শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগের কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া গেল না। কোনো বিষক্রিয়া, কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার চিহ্নমাত্র ছিল না। এটি ছিল এমন এক শত্রু, যাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কেবল তার ভয়ঙ্কর প্রকাশ অনুভব করা যায়। প্রায় ১৮ মাস ধরে চলা এই রহস্যময় মহামারীতে মোট ১,০০০-এরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং ১৪টি স্কুল বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

সত্যের উন্মোচন

বছরের পর বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। কোনো জৈবিক কারণ খুঁজে না পেয়ে তারা অবশেষে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দিকে ঝোঁকেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান এই ঘটনাকে 'মাস সাইকোজেনিক ইলনেস' (Mass Psychogenic Illness) বা গণ মনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ছাত্রীরা এক চরম মানসিক চাপের মধ্যে ছিল। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের ওপর ভালো ফল করার এবং ভবিষ্যৎ গড়ার এক 엄청 চাপ ছিল। এই তীব্র মানসিক চাপ তাদের অবচেতন মনে এমনভাবে প্রভাব ফেলেছিল যে, শরীর তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলে। একটি সামান্য রসিকতা সেই জমে থাকা চাপের ওপর ট্রিগারের কাজ করে এবং মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণটি ঘটে হাসির মাধ্যমে। এই হাসি কোনো আনন্দের প্রকাশ ছিল না, বরং ছিল মানসিক যন্ত্রণার এক বহিঃপ্রকাশ।

যেহেতু ছাত্রীরা একটি আবদ্ধ পরিবেশে (বোর্ডিং স্কুল) একসাথে থাকত, তাই একজনের অস্বাভাবিক আচরণ খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, যাকে 'সামাজিক সংক্রমণ' বলা হয়। তাদের মস্তিষ্ক কোনো শারীরিক কারণ ছাড়াই অসুস্থতার লক্ষণ তৈরি করতে শুরু করে। এটি প্রমাণ করে, মানব মন কতটা শক্তিশালী এবং একই সাথে কতটা রহস্যময় হতে পারে।

কোনো ওষুধ ছাড়াই, সময়ের সাথে সাথে এই মহামারী যেমন রহস্যজনকভাবে শুরু হয়েছিল, তেমনই রহস্যজনকভাবে একদিন থেমেও যায়। টাঙ্গানিকার হাসির মহামারী আজও মনোবিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিকদের কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র বা রহস্যের আঁতুড়ঘর হয়তো আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)