ভালোবাসার কি কোনো ‘ফর্মুলা’ হয়? বিজ্ঞানের চোখে প্রেম!

প্রেম বা ভালোবাসা—শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে কত ছবি ভেসে ওঠে, তাই না? কারো মনে হয়তো বৃষ্টির দিনে একসাথে ভিজতে থাকা দুটো মানুষের ছবি, আবার কারো মনে হয়তো মাঝরাতে করা লম্বা ফোনালাপের স্মৃতি। আমরা ভাবি, প্রেম মানেই ভাগ্য, হঠাৎ দেখা, কিংবা ওপরওয়ালার লেখা কোনো মিষ্টি ষড়যন্ত্র। কিন্তু যদি বলি, ভালোবাসা তৈরি করার একটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে? একটা ‘রেসিপি’ আছে, যা দিয়ে দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ একে অপরের গভীর প্রেমে পড়তে পারে? শুনতে সিনেমার গল্পের মতো লাগলেও, ঘটনাটা কিন্তু সত্যি! আর এই অদ্ভুত সুন্দর পরীক্ষাটি করেছিলেন এক মনোবিজ্ঞানী।

গল্পটা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। মনোবিজ্ঞানী আর্থার অ্যারন (Arthur Aron) ও তাঁর সহকর্মীরা একটা বিষয় নিয়ে খুব আগ্রহী ছিলেন—কীভাবে দুজন মানুষের মধ্যে আত্মিক যোগাযোগ বা ‘কানেকশন’ তৈরি হয়? এই কৌতূহল থেকেই তাঁরা এক যুগান্তকারী পরীক্ষার পরিকল্পনা করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল এটা দেখা যে, দুটো অচেনা মানুষকে ল্যাবরেটরিতে এনে, কিছু নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেলে, তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বা তার চেয়েও গভীর কোনো সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব কি না।

১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞানী আর্থার অ্যারনের করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, ৩৬টি নির্দিষ্ট প্রশ্ন ও এরপর ৪ মিনিট একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে দুজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের মধ্যেও গভীর আত্মিক যোগাযোগ, এমনকি প্রেমও তৈরি হতে পারে!

ভাবছেন, কী এমন জাদুকরী প্রশ্ন এগুলো? আসলে প্রশ্নগুলো মোট তিনটি ভাগে বিভক্ত। প্রথমদিকের প্রশ্নগুলো বেশ সহজ-সরল আর মজার। যেমন, "যদি পৃথিবীর যেকোনো মানুষকে রাতের খাবারের জন্য অতিথি হিসেবে ডাকার সুযোগ পেতে, তাহলে কাকে ডাকতে?" অথবা, "শেষ কবে নিজের মনে গান গেয়েছিলে?" এই প্রশ্নগুলো দুজনের মধ্যে থাকা জড়তা কাটাতে সাহায্য করে।

এরপর দ্বিতীয় ভাগের প্রশ্নগুলো আরেকটু ব্যক্তিগত হতে শুরু করে। যেমন, "তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?" বা "বন্ধুত্ব তোমার কাছে ঠিক কী মানে রাখে?" এই পর্যায়ে এসে দুজন মানুষ একে অপরের ভাবনা, মূল্যবোধ আর জীবনের গল্প সম্পর্কে জানতে পারে।

সবশেষে আসে তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর পর্যায়। এই প্রশ্নগুলো দুজনের ভেতরকার ভয়, দুর্বলতা আর আবেগকে নাড়া দেয়। যেমন, "তোমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ স্মৃতি কোনটা?" অথবা "এমন একটা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলো, যেটা নিয়ে তুমি চিন্তিত, এবং তোমার সঙ্গীর কাছে পরামর্শ চাও যে সে তোমার জায়গায় থাকলে কী করত।" এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য সাহসের প্রয়োজন হয়, কারণ এখানে নিজেকে অন্যের সামনে অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় প্রকাশ করতে হয়। আর মনোবিজ্ঞান বলে, এই পারস্পরিক দুর্বলতার আদান-প্রদানই দুজন মানুষকে খুব দ্রুত কাছাকাছি নিয়ে আসে।

কিন্তু গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশটা এখনও বাকি! ৩৬টা প্রশ্নের পর্ব শেষ হওয়ার পর আসে ফাইনাল রাউন্ড—একে অপরের চোখের দিকে টানা ৪ মিনিট কোনো কথা না বলে তাকিয়ে থাকা। প্রথমদিকে এটা একটু অদ্ভুত আর অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু গবেষকরা বলেন, এই কয়েক মিনিটের নীরব চাহনি দুজন মানুষের মধ্যে এক অবর্ণনীয় শক্তিশালী মানসিক সংযোগ তৈরি করে। এটা অনেকটা শব্দহীন conversations-এর মতো, যেখানে ভাষা নয়, অনুভূতি কথা বলে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই পরীক্ষার ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য! অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানিয়েছিলেন যে, মাত্র ৪৫ মিনিটের এই প্রক্রিয়ার শেষে তাঁরা অপর মানুষটির সঙ্গে অদ্ভুত এক টান অনুভব করেছেন। এমনকি, এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একজোড়া অপরিচিত মানুষ ছ'মাস পরেই বিয়ে করেছিলেন! তাঁদের সেই গল্পটি পরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি আর্টিকেলের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তাহলে কি ভালোবাসা সত্যিই একটা ফর্মুলা? হয়তো পুরোপুরি তা নয়। আর্থার অ্যারন নিজেও বলেছিলেন যে, তাঁর উদ্দেশ্য প্রেম তৈরি করা ছিল না, বরং দুজন মানুষের মধ্যে অল্প সময়ে কীভাবে গভীর সংযোগ তৈরি করা যায়, তা দেখাই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু এই পরীক্ষাটা আমাদের একটা দারুণ জিনিস শেখায়। ভালোবাসা কোনো আকাশ থেকে পড়া অলৌকিক ঘটনা নয়। ভালোবাসা তৈরি হয়—পরস্পরকে জানার আগ্রহ থেকে, নিজের দুর্বলতাকে প্রকাশ করার সাহস থেকে, এবং একে অপরকে মন দিয়ে শোনার ইচ্ছা থেকে।

আজকের এই ব্যস্ত পৃথিবীতে, যেখানে আমাদের হাতে সময় খুব কম, হয়তো এই ৩৬টা প্রশ্ন আমাদের নতুন করে ভালোবাসার মানে শেখাতে পারে। এটা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য নয়, যেকোনো দুটো মানুষ—বন্ধু, বা এমনকি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে। কারণ দিনের শেষে, ভালোবাসা তো আসলে এক গভীর বন্ধুত্বেরই নাম, তাই না?