ভালোবাসা জিনিসটা ঠিক কখন, কীভাবে আর কার ওপর এসে পড়ে, তা বলা মুশকিল। কখনও তা আসে ঝড়ের মতো, আবার কখনও শান্ত নদীর মতো চুপিসারে। কিন্তু একটা গোটা শহর যখন ভালোবেসে ফেলে এমন একজনকে, যার না আছে সিংহাসন, না আছে রাজত্ব, তখন সেই গল্পটা রূপকথাকেও হার মানায়। আজ বলব তেমনই এক অদ্ভুত ‘সম্রাট’-এর গল্প, যিনি কোনোদিন যুদ্ধ করেননি, রাজ্যজয় করেননি, কিন্তু জিতে নিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষের হৃদয়। আর সেই জয়টা হয়েছিল তরোয়াল দিয়ে নয়, কেবল তাঁর অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আর একরাশ পাগলামি দিয়ে।

আমেরিকার প্রথম (এবং একমাত্র) সম্রাট, মহামান্য নর্টন I

গল্পের শুরুটা উনিশ শতকের সান ফ্রান্সিসকো শহরে। সোনা আবিষ্কারের лихорадці শহরটা তখন গমগম করছে। চারিদিকে টাকা, স্বপ্ন আর সুযোগের হাতছানি। এই শহরেই বাস করতেন জোশুয়া আব্রাহাম নর্টন নামের এক বিচক্ষণ ব্যবসায়ী। একসময় বেশ নামডাক ছিল তাঁর, কিন্তু ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে, চালের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে যান। এই বিশাল ধাক্কার পর নর্টন বেশ কিছুদিন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।

যখন তিনি আবার জনসমক্ষে এলেন, তখন তিনি আর সাধারণ জোশুয়া নর্টন নন। তিনি এক নতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হলেন। আর সেই পরিচয়টা ছিল রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।

১৮৫৯ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর, জোশুয়া আব্রাহাম নর্টন শহরের এক সংবাদপত্রের অফিসে হেঁটে ঢোকেন এবং একটি চিঠি জমা দেন। সেই চিঠিতে তিনি নিজেকে 'আমেরিকার সম্রাট এবং মেক্সিকোর রক্ষাকর্তা' হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, সান ফ্রান্সিসকো শহরের মানুষ কোনো প্রতিবাদ না করে, বরং ভালোবেসে এবং মজাদার কৌতুকের সাথে তাঁকে তাদের সম্রাট হিসেবে মেনে নিয়েছিল!

ভাবছেন, এও আবার সম্ভব নাকি? হ্যাঁ, সান ফ্রান্সিসকোর মানুষের কাছে এটাই ছিল সত্যি। নর্টন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করার পর একটি পুরনো নীল মিলিটারি ইউনিফর্ম জোগাড় করেন, যার কাঁধে ছিল সোনালি এপোলেট। মাথায় ময়ূরের পালক গোঁজা একটি টুপি পরে তিনি শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। তিনি রোজ নিয়ম করে শহর পরিদর্শন করতেন, রাস্তাঘাট, সরকারি ভবন এবং শহরের নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক আছে কিনা, তা দেখতেন। তাঁর হাবভাব ছিল পুরোদস্তুর একজন সম্রাটের মতোই।

শহরের মানুষও তাঁকে নিরাশ করেনি। বরং, তারা এই খেলাটাকে উপভোগ করতে শুরু করে। পুলিশ অফিসাররা রাস্তায় তাঁকে দেখলে স্যালুট করত। শহরের সেরা রেস্তোরাঁগুলো তাঁকে বিনামূল্যে খাবার দিত। থিয়েটারে তাঁর জন্য আলাদা করে চেয়ার সংরক্ষিত থাকত। এমনকি কিছু দোকানদার তাঁর জারি করা নিজস্ব নোট বা মুদ্রা গ্রহণ করত! তিনি নিজের নামে ৫০ সেন্ট থেকে শুরু করে ১০ ডলারের নোট ছাপিয়েছিলেন, যা সান ফ্রান্সিসকোর কিছু কিছু জায়গায় দিব্যি চলত।

একবার এক নতুন পুলিশ অফিসার, যে সম্রাট নর্টনের ব্যাপারে জানত না, তাঁকে মানসিক বিকারগ্রস্ত ভেবে গ্রেপ্তার করে ফেলে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা শহরে হইচই পড়ে যায়। সংবাদপত্রে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় এবং সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের পুলিশ প্রধান নিজে এগিয়ে আসেন, নর্টনকে মুক্ত করেন এবং তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান। এরপর থেকে শহরের পুলিশদের জন্য নিয়ম করে দেওয়া হয় যে, সম্রাটকে দেখলেই স্যালুট করতে হবে।

সম্রাট নর্টন শুধু ঘুরে বেড়াতেন না, তিনি নিয়মিত ‘রাজকীয় ফরমান’ বা ডিক্রি জারি করতেন। তাঁর কিছু ফরমান ছিল বেশ মজাদার, যেমন - তিনি আমেরিকার কংগ্রেসকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন কারণ তাঁর মতে সেখানে বড্ড বেশি দুর্নীতি হচ্ছিল। আবার কিছু ফরমান ছিল আশ্চর্যজনকভাবে দূরদর্শী। যেমন, তিনি সান ফ্রান্সিসকো এবং ওকল্যান্ডকে যুক্ত করার জন্য একটি সাসপেনশন ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর বাস্তবে রূপ নেয় ‘বে ব্রিজ’ হিসেবে।

১৮৮০ সালের ৮ই জানুয়ারি, এক বৃষ্টির রাতে শহরের রাস্তায় হঠাৎই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন সম্রাট নর্টন এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর জানা যায়, এই ‘সম্রাট’-এর সম্বল ছিল মাত্র কয়েক ডলার। তিনি একেবারেই নিঃস্ব অবস্থায় মারা যান। কিন্তু সান ফ্রান্সিসকো তাঁকে ভোলেনি। শহরের ব্যবসায়ীরা চাঁদা তুলে তাঁর শেষকৃত্যের আয়োজন করে। সেদিন প্রায় ১০,০০০-এর বেশি মানুষ তাদের প্রিয় সম্রাটকে বিদায় জানাতে রাস্তায় নেমেছিল। তাঁর সমাধির পাথরে লেখা হয়: "নর্টন I, আমেরিকার সম্রাট এবং মেক্সিকোর রক্ষাকর্তা"।

আসলে, জোশুয়া নর্টনের এই গল্পটা কোনো রাজারানীর গল্প নয়। এ হলো এক অদ্ভুত ভালোবাসার গল্প, যেখানে একটা গোটা শহর তার এক eccentric বাসিন্দাকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিল। তাঁর পাগলামিকে সম্মান জানিয়েছিল, তাঁর خیالی দুনিয়াটাকে সত্যি করে তুলেছিল। হয়তো সান ফ্রান্সিসকোর মানুষ বুঝতে পেরেছিল, জীবনে মাঝে মাঝে এমন একটু পাগলামি, এমন একটু রূপকথার প্রয়োজন হয়। সম্রাট নর্টনের গল্প তাই শুধু এক অদ্ভুত মজার তথ্য নয়, এ হলো মানুষের সহনশীলতা, দয়া আর ভালোবাসার এক অসাধারণ উদাহরণ।